সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন

ইউনূসদের রাজপথে দেখতে চান নাহিদ

সমসমাজ ডেস্ক
রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

সংস্কার প্রশ্নে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের সরাসরি রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল

ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের রক্তের বিনিময়ে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, “যতটুকু অর্জন হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলেও সাবেক উপদেষ্টাদের দায়িত্ব নিতে হবে এবং রাজপথে নামতে হবে।” তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে এবং এখন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ার মুখে থাকলেও সংশ্লিষ্টরা নীরব।

জাতীয় সংসদের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, সংসদে কার্যকর আলোচনা সম্ভব হচ্ছে না এবং সরকারি দলের আচরণ সংসদকে অকার্যকর করে তুলছে। যদিও জাতীয় নির্বাচনভিত্তিক সংসদ চালু রয়েছে, তবে গণভোটের মাধ্যমে প্রত্যাশিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর না হওয়ায় সংসদ আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক এই দ্বৈত বাস্তবতা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে জটিল করে তুলেছে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সাংবিধানিক প্রশ্ন। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৮ মাসে মোট ১১৫টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জারি হয় ১৭টি অধ্যাদেশ, যেখানে প্রতিটির জন্য গড়ে সময় লেগেছিল প্রায় ৯ দিন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০-এ, যেখানে গড়ে প্রতি ৪ দিনেই একটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। আর ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৪৫ দিনে জারি হয়েছে ৩৬টি অধ্যাদেশ—অর্থাৎ গড়ে প্রতি দেড় দিনেরও কম সময়ে একটি করে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধ্যাদেশ জারির গতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন উঠছে—একটি অস্থায়ী ও অনির্বাচিত সরকারের জন্য এত বিপুল সংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করা কতটা যৌক্তিক ছিল?

সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা ভেঙে গেলে রাষ্ট্রপতি জরুরি প্রয়োজনে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সংসদ কার্যকর না থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজনীয়তা ছিল—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। তবে সমালোচকদের মতে, “জরুরি প্রয়োজন” কতটা ছিল এবং কতগুলো অধ্যাদেশ সেই মানদণ্ডে পড়ে—তা নিয়েই এখন বিতর্ক। অন্যদিকে, সংবিধান নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলন মূলত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিল—সংবিধান পরিবর্তনের দাবিতে নয়। কিন্তু সেই জনআকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ১৯৭২ সালের সংবিধানে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সমালোচকদের দাবি, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সংবিধান একটি সংবেদনশীল দলিল। এ অবস্থায় ধর্মভিত্তিক বা সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায়ই সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্ন তোলে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—একদিকে তারা সংবিধান মানেনি বলে অভিযোগ, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী একই সংবিধানের অধীনেই শপথ গ্রহণ এবং অধ্যাদেশ জারি করেছে। প্রতিটি অধ্যাদেশের প্রারম্ভেই উল্লেখ রয়েছে যে, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এগুলো জারি করেছেন। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন, তবে তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন।

অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে নতুন সংসদের ওপর। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারাবে। ফলে সংসদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—কোনগুলো রাখা হবে, আর কোনগুলো বাতিল হবে। বিশ্লেষকদের মতে, অধ্যাদেশ কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের স্থায়ী সমাধান নয়। এগুলো মূলত অস্থায়ী ব্যবস্থা। ফলে এসব অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া সিদ্ধান্ত, নিয়োগ বা সংস্কার কার্যক্রম ভবিষ্যতে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং জনঅগ্রহণযোগ্যতার অভিযোগও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। পাশাপাশি “মব ভায়োলেন্স” বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথাও সমালোচনায় উঠে এসেছে। এসব ঘটনার কারণে অনেক বিশ্লেষকের মতে, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

নাহিদ ইসলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বানকে অনেকেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। সব মিলিয়ে, সংস্কার বনাম ক্ষমতার রাজনীতি—এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ আবারও এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই জটিলতা কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারে এবং বহুল আলোচিত সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব রূপ পায়।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!