সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৪ অপরাহ্ন

ধর্মীয় মৌলবাদের ছায়ায় বৈশাখের সূর্য ………..

অপু সারোয়ার
সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ অঞ্চলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নানাভাবে চাপ ও আক্রমণ চলছে । এই ধারাবাহিকতায় বাংলা নববর্ষও প্রায় প্রতি বছরই বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়ে। নানা জাতিগোষ্ঠীর মিশ্রণ ও দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়েই এ অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা ও বিচ্ছিন্নতা নিয়েই মানুষ এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী সহাবস্থান করেছে। প্রাচীনকালে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম, মধ্যযুগে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম এবং আধুনিক যুগে ব্রাহ্মধর্ম—সবই এই ভূখণ্ডের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের অংশ। ইসলামের আগমন ও বিকাশও বহু শতাব্দী ধরে, এবং সেই প্রভাবেই আরবি-ফার্সি শব্দ স্থানীয় ভাষায় প্রবেশ করেছে, যা আজ ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভাষা ও সংস্কৃতি এই দীর্ঘ সহাবস্থান ও পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে। কোনো ভাষা বা শব্দ কোনো একক ধর্মের সম্পত্তি নয়। যেমন, আরবি ভাষা ইসলামের আগেও ছিল, এবং এখনও আরবি ভাষাভাষী খ্রিস্টানরা ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করেন। অর্থাৎ শব্দের ব্যবহার ধর্ম নির্ভর নয়, বরং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের অর্থ বদলায়—এটাই ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন। এই কারণে একটি জাতির পরিচয় গঠনে ভাষা ও সংস্কৃতিই মুখ্য, ধর্ম নয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পহেলা বৈশাখ বাঙালির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব, যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে গেছে। পহেলা বৈশাখ কোনো ধর্মীয় আচারনির্ভর উৎসব নয়—এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদযাপন।

১লা বৈশাখকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান আমল থেকেই বাংলা ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয় । বাংলা ক্যালেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সংস্কারের প্রচেষ্টা হয়েছে, যার ফলে ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামলে [ ১৯৮২-১৯৯০ ] ।   এই পরিবর্তনের পেছনে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিভক্ত করার রাজনীতি কাজ করেছে। তবে এটিও সত্য যে কৃষিভিত্তিক সমাজে বাংলা মাসের ব্যবহার বরাবরই ছিল সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রয়োজনের জন্য; কৃষিকাজ কখনো ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট তারিখ মেনে চলে না—প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই পরিচালিত হয়।

প্রতি বছর বৈশাখ এলেই একটি অংশ থেকে এটিকে ‘হারাম’ বা ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কেউ কেউ আবার মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে ধর্মীয় যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে—কোনো উৎসব যদি মানুষের মিলন, আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যম হয়, তবে সেটিকে ধর্মীয় মানদণ্ডে বিচার করার ভিত্তি কী? যে উৎসবে কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আচার নেই, যেখানে কেউ তার নিজস্ব ধর্ম পালন করতে স্বাধীন, সেটিকে ‘হারাম’ বলা আসলে ধর্মের মূল চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ধর্ম ব্যক্তির বিশ্বাসের বিষয়, আর সংস্কৃতি একটি সমাজের সম্মিলিত চর্চা—এই দুইকে জোর করে একাকার করার চেষ্টা থেকেই মৌলবাদ জন্ম নেয়।

যারা পহেলা বৈশাখকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলেন, তারা প্রায়ই সংস্কৃতিকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় ধরে নেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সংস্কৃতি সবসময় পরিবর্তনশীল। এক সময় হালখাতা ছিল এই দিনের প্রধান অনুষঙ্গ, আজ তা রূপ বদলে সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতেও এর রূপান্তর ঘটবে। এই পরিবর্তনই সংস্কৃতির প্রাণশক্তি। সুতরাং পরিবর্তনকে অস্বীকার করা মানে সংস্কৃতিকেই অস্বীকার করা। বৈশাখকে ঘিরে ভয় ও সহিংসতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, যার ফলে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়েছে রাষ্ট্রকে। কোথাও কোথাও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই সময়ে ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে উৎসবটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতাও বেড়েছে। এই প্রবণতা কেবল একটি উৎসবের বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়।

তবু বাস্তবতা ভিন্ন। পহেলা বৈশাখ মানে মানুষের মিলনমেলা। ঢাকার রমনা পার্কে হাজার হাজার মানুষ ভোরবেলা জড়ো হয়, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, গান শোনে, আড্ডা দেয়। এখানে কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় আচার নেই—আছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ করার মধ্যেই এই উৎসবের আসল শক্তি।

বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত থাকলেও, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এর সংস্কার সবচেয়ে বেশি আলোচিত। চন্দ্রনির্ভর হিজরি সনের পরিবর্তে সৌরনির্ভর একটি সন কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা জনপ্রিয় হয়। তবে আজকের বাস্তবতায় বাংলা সন মূলত একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক। বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন শুধু বাঙালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নেপাল, ভারত, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপে নতুন বছর উদযাপিত হয়। অর্থাৎ, বৈশাখ – নববর্ষ একটি সার্বজনীন মানবিক ঐতিহ্য।

পহেলা বৈশাখে মেলা বসে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, মানুষ পান্তা-ইলিশ খায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। ভোরবেলায় খোলা প্রাঙ্গণে মানুষের মিলন, গান, হাসি আর রঙিন পোশাকে ভরে ওঠে চারপাশ। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ। যারা এই উৎসবকে “অপসংস্কৃতি” বলে আখ্যা দেন, তাদের বক্তব্যের বিপরীতে বাস্তবতা স্পষ্ট—এটি একটি সুস্থ, পারিবারিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদযাপন। এখানে অশালীনতার কিছু নেই; বরং রয়েছে ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও সামষ্টিক আনন্দ। ধর্মীয় মৌলবাদ যখন সংস্কৃতিকে সংকুচিত করতে চায়, তখন পহেলা বৈশাখ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যুক্তি দেয়—সংস্কৃতি কোনো একক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি সবার।

বাংলা নববর্ষ তাই কেবল একটি দিন নয়—এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, ঐতিহ্য এবং সম্মিলিত চেতনার প্রতীক। এই দিনে মানুষ সব বিভাজন ভুলে একসঙ্গে দাঁড়ায়, নতুন বছরের জন্য আশা করে, এবং স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—সংস্কৃতির আলোকে দমিয়ে রাখা যায় না।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!