মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন

গোপন চুক্তির ছায়ায় সার্বভৌমত্ব—বাংলাদেশ কি নীতিগত ফাঁদে আটকে যাচ্ছে?

সমসমাজ ডেস্ক
সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নীরবতা বিরাজ করছে, তার বিপরীতে জনমনে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে গভীর সংশয় ও অবিশ্বাস। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—যেখানে United States বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করছে—সে বাস্তবতায় এই চুক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

অভিযোগ উঠছে, আন্তর্জাতিক সংকটময় সময়—বিশেষত Iran-কে ঘিরে উত্তেজনা ও জ্বালানি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে—বাংলাদেশকে এমন এক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তাকে তার জ্বালানি নীতি নির্ধারণেও পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। Russia-এর কাছ থেকে তেল আমদানির মতো একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তেও যদি বাইরের শক্তির অনুমোদন প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি নিছক বাণিজ্যচুক্তির বিষয় থাকে না; তা সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রূপ নেয়।

এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক সামনে আনা হচ্ছে—শূকরের মাংস আমদানির প্রসঙ্গ। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের ক্ষেত্রে, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, সেখানে এই ইস্যুটিকে হঠাৎ করে সামনে আনা অনেকের কাছে পরিকল্পিত ‘ডিসট্রাকশন’ বা দৃষ্টি ভিন্নখাতে সরানোর কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, মূল চুক্তির কাঠামোগত বৈষম্য, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কৌশলগত ঝুঁকির প্রশ্ন থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে এনে একটি আবেগনির্ভর বিতর্ককে সামনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, শ্রম খাত এবং জাতীয় নিরাপত্তার কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে United States-এর হাতে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে।

এই চুক্তির ফলে, বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। এসব পণ্যের মধ্যে আছে—প্রতিবছর (পাঁচ বছরের জন্য) অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, এক বছরে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলারের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য ও তুলা। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।

বাস্তবতা হলো, এই চুক্তির মাধ্যমে যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি পণ্যের আমদানি-নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমাধানযোগ্য নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত নির্ভরতার সূচনা করতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি, কৃষি, জ্বালানি, এমনকি প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতিও বহুলাংশে প্রভাবিত হবে। ফলে শুধুমাত্র শূকরের মাংস আমদানি বন্ধের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সমস্যার গভীরতাকে আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করে।

চুক্তির শর্তাবলিতে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যের ওপর কোনো ধরনের কোটা আরোপ না করা, অশুল্ক বাধা অপসারণ, এবং মার্কিন পণ্যের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রম অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রম আইন প্রয়োগে বড় ধরনের সংস্কারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা অনেকের মতে “অত্যন্ত সামান্য এবং অসম সুবিধা”। চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত দিক হলো প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নির্ভরতা বৃদ্ধি। নির্দিষ্ট দেশ—বিশেষ করে China—থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে নিরুৎসাহিত করা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্য, বিশেষ করে India ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, বিএনপি , জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্যান্য ইসলামপন্থী দলের দৃশ্যমান প্রতিবাদের অনুপস্থিতি। এই নীরবতা অনেকের কাছে কৌশলগত, আবার অনেকের কাছে উদ্বেগজনক। কারণ একটি এত বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চুক্তি—যা ভবিষ্যৎ সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রকে সীমিত করে দিতে পারে—তা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব যেমন সমস্যা, তেমনি প্রকাশ্য বিরোধিতার অভাবও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তি একবার কার্যকর হলে তা বাতিল বা পুনঃআলোচনা করা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির বাস্তবতা হলো—ক্ষমতার ভারসাম্য যেখানে অসম, সেখানে চুক্তির ভাষা যতই “পারস্পরিক” বলা হোক না কেন, বাস্তব প্রয়োগে তা প্রায়শই একতরফা হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে একটি দ্বৈত দাবি—একদিকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান রেখে শূকরের মাংস আমদানির মতো বিষয়গুলো প্রত্যাখ্যান, অন্যদিকে পুরো চুক্তির সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দুই দাবিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দাবি, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই মুখ্য হওয়া উচিত। সবশেষে প্রশ্নটি সোজা কিন্তু গভীর—বাংলাদেশ কি তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে নিজস্ব স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে, নাকি একটি অসম চুক্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বহির্ভরশীল কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে? বর্তমান বিতর্ক সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!