শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’: যৌন কৌতূহলের আড়ালে দুর্বল কূটনীতি মসজিদের পবিত্রতা এবং নারী শ্রমিকের জীবনের মর্যাদা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : খাদ্যের স্বাধীনতা, নাকি ধর্মীয় দাপট? সাতক্ষীরায় মব সন্ত্রাস: উসকানিদাতা প্রকাশ্যে, রাষ্ট্র নীরব কেন? যে ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না: চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ভূরাজনৈতিক পরিণতি চে গুয়েভারা: কিংবদন্তি, ও বাস্তবতা  চট্টগ্রাম বন্দর: বিদেশি পুঁজির স্বার্থ, অস্বচ্ছ চুক্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির প্রতিবাদ ও বিবৃতি: এই চুক্তি দেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি চট্টগ্রাম বন্দর : গোপনীয়তা, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবাদ দমনের রাজনীতি
রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : খাদ্যের স্বাধীনতা, নাকি ধর্মীয় দাপট?

সমসমাজ প্রতিবেদক।
Update : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাইয়ের ঘটনাটি খাদ্যের স্বাধীনতার সরল প্রশ্ন নয়; এটি সেই স্বাধীনতার নামে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা উপেক্ষা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট দেখানোর প্রশ্ন। নিজের পছন্দের খাবার খাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে সহপাঠীদের আপত্তিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া বা বিরোধকে শক্তি প্রদর্শনের কর্মসূচিতে পরিণত করা কতটা যুক্তিসংগত? বিশ্ববিদ্যালয় কারও ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়; এটি সবার সমান অধিকার ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠান।

ঘটনার শুরু ১২ অক্টোবর। সেদিন রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একদল শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় মন্দিরের কাছে মুক্তমঞ্চের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। হিন্দু শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানালে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে প্রক্টরের হস্তক্ষেপে রান্নার জায়গা মন্দির থেকে কিছুটা সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে রান্না বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরেই হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়।

১৪ অক্টোবর বিরোধ নতুন দিকে মোড় নেয়। ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার কথা বলা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয় এবং প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে ‘গরুভোজ’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

১৬ অক্টোবর সেই ঘোষণাই বাস্তবায়িত হয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মাঝখানের সড়কে সকালে গরু জবাই করা হয়। আয়োজকেরা এটিকে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ এবং গরুর মাংস খাওয়ার অধিকারের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরেন। অর্থাৎ, ১২ অক্টোবরের রান্নাকে ঘিরে শুরু হওয়া বিরোধ চার দিনের মধ্যে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, খাদ্যের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রশ্নে রূপ নেয়।

এখানেই মূল প্রশ্ন: সহপাঠীদের আপত্তির পর আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর বদলে গরু জবাইকে প্রতিবাদের কর্মসূচিতে পরিণত করার প্রয়োজন হলো কেন? প্রশাসনের নির্দেশ অন্যায্য মনে হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু প্রতিবাদের স্থান, ধরন ও প্রতীক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সামাজিক দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। এমন একটি কাজকে কেন বেছে নিতে হলো, যা বিরোধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে আরও সামনে নিয়ে আসে? এতে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে, নাকি নিজেদের অবস্থান ও শক্তি দেখানোর প্রবণতাই প্রকাশ পায়?

খাদ্যের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কে কী খাবেন, তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতা মানে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি ও সহাবস্থানের বাস্তবতা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার অধিকার নয়। একইভাবে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে—এই যুক্তিতে অন্যের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, যুক্তিসংগত সমঝোতা এবং সবার জন্য সমান অধিকার।

একটি সহজ প্রশ্ন তোলা যায়। মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন করা হলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের একাংশ কি আপত্তি করতেন না? করলে তাঁদের সেই আপত্তিকে বোঝার চেষ্টা করা যেমন জরুরি, তেমনি মন্দিরের কাছে গরুর মাংস রান্না নিয়ে হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যের অনুভূতি বোঝার এই ন্যূনতম সদিচ্ছা ছাড়া সহাবস্থান সম্ভব নয়।

তবে হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তি মানেই তাঁদের হাতে অন্যের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের অধিকার তুলে দেওয়া নয়। আবার খাদ্যের স্বাধীনতার দাবি তুললেই অন্যের উদ্বেগকে তুচ্ছ করার অধিকার জন্মায় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো, কারও ধর্মীয় পরিচয় বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, ন্যায়সংগত ও সবার জন্য সমান নিয়মের ভিত্তিতে বিরোধের সমাধান করা। প্রশাসনিক নির্দেশের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে যুক্তি, আলোচনা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের মাধ্যমে—ধর্মীয় বিরোধকে আরও উসকে দিয়ে নয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উনিশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় দুই হাজার হিন্দু শিক্ষার্থী রয়েছেন। সংখ্যায় তাঁরা কম হতে পারেন, কিন্তু অধিকার ও মর্যাদায় কারও চেয়ে কম নন। তাঁরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কারও অতিথি নন, কারও দয়ার পাত্রও নন। অন্য সবার মতোই এটি তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তাঁদেরও সমান অধিকার ও নিরাপত্তার জায়গা।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়; ভিন্ন মত, বিশ্বাস ও পরিচয়ের মানুষের সঙ্গে গণতান্ত্রিকভাবে বসবাস শেখারও জায়গা। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দই যদি নিয়ম হয়ে ওঠে, আর সংখ্যালঘুর উদ্বেগকে দুর্বলতা মনে করা হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি তখন সহাবস্থানের ভিত্তি না হয়ে আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এখানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে না, হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তিকেও চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। প্রশ্নটি আরও মৌলিক: আমরা কি নিজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অন্যের মর্যাদাকেও স্বীকার করতে প্রস্তুত? নাকি অধিকারকে ব্যবহার করব অন্যকে চাপে রাখার উপায় হিসেবে?

খাদ্যের স্বাধীনতা সবার। ধর্মীয় মর্যাদাও সবার। একটি অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করলে স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কারও ধর্মীয় দাপট দেখানোর জমিদারি নয়। এটি সবার। এখানে কারও বিশ্বাসের কারণে কেউ বাড়তি অধিকার পাবেন না, আবার সংখ্যালঘু বলেও কাউকে নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য বারবার লড়তে হবে না। প্রকৃত স্বাধীনতার পরীক্ষা শুধু নিজের পছন্দ প্রতিষ্ঠায় নয়, অন্যের সমান স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যেও।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!