শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! সিপিবি কার্যালয়ে হামলা: সারাদেশে বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতির নিরাপত্তা কোথায়? মানিক পশারী: মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে বাধা পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো গরু ভোজের বিতর্ক: অধিকারের মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নেহা বোরা বাংলাদেশের আন্দোলনের পাঠ : ফিরে ফিরে আসে দুষ্ট ক্ষত রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’: যৌন কৌতূহলের আড়ালে দুর্বল কূটনীতি মসজিদের পবিত্রতা এবং নারী শ্রমিকের জীবনের মর্যাদা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : খাদ্যের স্বাধীনতা, নাকি ধর্মীয় দাপট? সাতক্ষীরায় মব সন্ত্রাস: উসকানিদাতা প্রকাশ্যে, রাষ্ট্র নীরব কেন? যে ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না: চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ভূরাজনৈতিক পরিণতি
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

মানিক পশারী: মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে বাধা

সমসমাজ প্রতিবেদক।
Update : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধ: আদর্শ, নাকি ক্ষমতার রাজনীতির স্লোগান?

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই দলই মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করে। অথচ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে তাদের অবস্থান সেই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন ঘিরে যে পরিস্থিতির খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, মুক্তিযুদ্ধ কি রাজনৈতিক আদর্শ, নাকি ক্ষমতার রাজনীতির স্লোগান?

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজের বাড়িতে থাকতে পারেননি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে তাঁর বসতভিটা ও ছোট দোকান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। দুই মাস অসুস্থ থাকার পর ২০২৬ সালের ২৪ অক্টোবর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের  প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে আনা হলে গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় কিছু মানুষ তাঁর দাফনের বিরোধিতা করেন। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল এবং দাফনে বাধা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কবর খোঁড়ার পর একদল লোক সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। এ সময় স্লোগান ও মিছিলকে কেন্দ্র করে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় জানাজার জন্য অপেক্ষমাণ অনেকেই সরে যান।

পরিস্থিতির কারণে পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তাঁর জামাতার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে জানাজায় পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি একাই উপস্থিত ছিলেন। পরে গভীর রাতে পুলিশি উপস্থিতিতে চিতলিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দাফনে বাধা দেওয়া ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। তবে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হক প্রথম আলোকে বলেছেন, দাফনে তাঁদের কোনো বাধা ছিল না, যদিও তাঁরা সহযোগিতাও করেননি। অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে ঘটনার পূর্ণ চিত্র নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

তবে একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার অভিযোগই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। যে রাষ্ট্রের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফন কি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সম্মতির ওপর নির্ভর করবে? কোনো মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁকে বা তাঁর পরিবারকে ভয়ভীতির মুখে পড়তে হলে তা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; নাগরিকের অধিকার, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বেরও প্রশ্ন।

বিএনপি, জামায়াত ও মুক্তিযুদ্ধের দায়

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিএনপিও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা বর্তমান দলের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধতা দেয় না। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করলে সেই ইতিহাসের মূল্যবোধ বর্তমান রাজনীতিতে কতটা রক্ষা করা হচ্ছে, তার জবাবও দিতে হয়।

এখানেই বিএনপির সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে দলটির অবস্থান কী?

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের তৎকালীন নেতৃত্ব পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। দলটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও হয়েছে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির কাছে জানতে চাওয়া স্বাভাবিক: জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা সমঝোতার ভিত্তি কী?

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক জোট অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে দল মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করে, তার কাছে অতীতের গুরুতর ঐতিহাসিক দায় এবং বর্তমানের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করা সংগত। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিংবা নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আপস করা হয়, তাহলে তার দায় সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বকে নিতে হবে।

বিএনপির সব নেতা বা সমর্থক জামায়াতের আদর্শে বিশ্বাস করেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। কিন্তু দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক চাপ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করার প্রবণতার বিরোধিতা করা তাদেরও রাজনৈতিক দায়িত্ব।

মানিক পশারীর দাফন ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা বিএনপিরও দায়িত্ব। একই সঙ্গে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার কেবল অতীতের পরিচয় নয়; বর্তমানের রাজনৈতিক আচরণের মধ্য দিয়েও তার সত্যতা প্রমাণ করতে হয়।

আওয়ামী লীগ: যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জবাবদিহি

শেখ হাসিনার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা করা এবং সেই বিচারের সঙ্গে যুক্ত সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।

সাঈদীর মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া মাহবুবুল আলম হাওলাদারের নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের সমস্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতা যুদ্ধাপরাধের বিচারে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে আনে। সাক্ষী সুরক্ষা শুধু পুলিশ মোতায়েনের বিষয় নয়; নিরাপদে চলাফেরা, জীবিকা নির্বাহ এবং পরিবার নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগও এর অন্তর্ভুক্ত।

বিচারে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে কেউ যদি পরবর্তী জীবনে নিরাপত্তাহীনতা বা দুর্ভোগের মুখে পড়েন, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা জরুরি। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কার কী দায়, তা নির্ধারণ করতে প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগের শাসনামল মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে একমাত্র মানদণ্ড করা যায় না। গণতান্ত্রিক অধিকার, বিরোধী মতের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি ক্ষেত্রে অর্জন থাকলে অন্য ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় না।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দেওয়া আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া এক বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার কোনো দলের সমালোচনা এড়ানোর ঢাল হতে পারে না।

ধর্মীয় মৌলবাদের বিপদ

ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। কেউ ধর্ম পালন করবেন, ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করবেন, আবার কেউ ধর্ম পালন করবেন না—এসব ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু ধর্মের নামে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন অন্যের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ভিন্নমত দমন করে কিংবা রাষ্ট্রের ওপর নিজস্ব মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন তা আর নিছক ধর্মবিশ্বাসের বিষয় থাকে না; হয়ে ওঠে ক্ষমতা ও আধিপত্যের রাজনীতি।

ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সামাজিক চাপের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার সংকুচিত করা গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই প্রশ্নের বাইরে নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। একইভাবে, বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে কাউকে সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হলে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

মানিক পশারীর দাফন ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তবে প্রমাণিত হলে যে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা হবে নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতিও গুরুতর অবমাননা।

ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা কোনো ধর্মের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এটি ধর্মের নামে অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক আধিপত্য এবং অন্যের অধিকার খর্ব করার চেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান। এই বিরোধিতা হতে হবে নীতিগত ও সর্বজনীন—শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার কৌশল নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জবাবদিহি

মানিক পশারীর দাফন ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলে। পরিবারের বক্তব্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগকারীরা যাতে নির্বিঘ্নে অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দাফন ঘিরে উত্তেজনার সময় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কবর ভরাট ও হুমকির অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি না এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা উচিত। প্রমাণ ছাড়া প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলা যায় না। তবে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের মতো একটি বিষয় ঘিরে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব প্রশাসনের রয়েছে।

যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপের কারণে নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রকে প্রতিকার করতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হুমকি বা হয়রানির অভিযোগ তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কোনো রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় সংগঠনের হাতে ন্যস্ত নয়। এর ভিত্তি হওয়া উচিত আইন, ন্যায়বিচার ও নাগরিকের সমান অধিকার।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার কার?

মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর দাফন ঘিরে প্রকাশিত ঘটনা বিএনপির কাছে যেমন রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি তোলে, তেমনি আওয়ামী লীগের শাসনামলের অর্জন ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। জামায়াতে ইসলামীর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বর্তমান অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা জরুরি। তবে এই আলোচনা হতে হবে প্রমাণভিত্তিক। অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না; আবার তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে নাগরিকের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

বিএনপিকে স্পষ্ট করতে হবে, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী। আওয়ামী লীগের শাসনামলকে মূল্যায়ন করতে হবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার, সাক্ষী সুরক্ষা ও নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীসহ সব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিকেও স্পষ্ট করতে হবে, তারা অন্য নাগরিকের সমান অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে কতটা সম্মান করে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে হয় এমন রাষ্ট্র গড়ে তোলার মাধ্যমে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় মতাদর্শ কিংবা সামাজিক প্রভাবের কারণে কোনো নাগরিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না; যেখানে অপরাধের বিচার দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কোনো গোষ্ঠীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে সেই চেতনার মূল প্রতিশ্রুতি—নাগরিকের মর্যাদা, সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র—বাস্তবে রক্ষা করতে প্রস্তুত? মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার দাবি করার অধিকার রাজনৈতিক স্লোগান থেকে আসে না; আসে সেই আদর্শের পক্ষে বাস্তবে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!