শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো গরু ভোজের বিতর্ক: অধিকারের মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নেহা বোরা বাংলাদেশের আন্দোলনের পাঠ : ফিরে ফিরে আসে দুষ্ট ক্ষত রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’: যৌন কৌতূহলের আড়ালে দুর্বল কূটনীতি মসজিদের পবিত্রতা এবং নারী শ্রমিকের জীবনের মর্যাদা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : খাদ্যের স্বাধীনতা, নাকি ধর্মীয় দাপট? সাতক্ষীরায় মব সন্ত্রাস: উসকানিদাতা প্রকাশ্যে, রাষ্ট্র নীরব কেন? যে ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না: চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ভূরাজনৈতিক পরিণতি চে গুয়েভারা: কিংবদন্তি, ও বাস্তবতা  চট্টগ্রাম বন্দর: বিদেশি পুঁজির স্বার্থ, অস্বচ্ছ চুক্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন

নেহা বোরা বাংলাদেশের আন্দোলনের পাঠ : ফিরে ফিরে আসে দুষ্ট ক্ষত

অপু সারোয়ার
Update : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

নেহা বোরা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ভারতের তরুণদের জেন-জি আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের আন্দোলন ভারতের তরুণদের পথ দেখিয়েছে। নেহা বোরা ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডি গবেষক এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি।

এআইএসএ সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন। সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ঐতিহাসিক শিকড় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনে। তবে পরবর্তী সময়ে দলটি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে গণআন্দোলন ও সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। নেহা তাঁর বক্তব্যে ভারত ও বাংলাদেশের তরুণদের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রামের ওপরও জোর দেন।

বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার মধ্যে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো, সেই আন্দোলন থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সেই শিক্ষাকে কীভাবে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে? শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সংগ্রামকে সমর্থন করা এক বিষয়; আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মূল্যায়ন করা আরেক বিষয়। কোনো সরকারের পতনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক অধিকার, ভোটাধিকার, জবাবদিহি এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা, জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা নিয়ে বিরোধও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এসব বিষয় আলাদাভাবে বিচার করা দরকার। একই সঙ্গে আন্দোলনের প্রাথমিক গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পরবর্তী ক্ষমতার বিন্যাসের সম্পর্কও উপেক্ষা করা যায় না। নেহা বোরার বক্তব্যে এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন আছে কি না, তা তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে; নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তাঁর ওপর কোনো রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার দাবি করলে এই জটিলতাগুলোর মুখোমুখি হওয়াও জরুরি।

এই প্রশ্নের সঙ্গে ভারতের নকশাল আন্দোলনের ইতিহাসেরও যোগসূত্র রয়েছে। ১৯৭১ সালে ভারতের নকশালপন্থী রাজনীতির একটি অংশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে দেখার বদলে ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ক এবং বৃহৎ শক্তির ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে ব্যাখ্যা করেছিল। ফলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি—এমন সমালোচনা ইতিহাসে রয়েছে।

চীনপন্থী বামপন্থীদের একটি অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। এই ধারার একটি দলের নাম ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ছিল পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)। পরে দলটি নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) নাম গ্রহণ করে। চীনপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকটি গোষ্ঠী এখনো নিজেদের দলের নামে ‘পূর্ব বাংলা’ পরিচয়টি ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও পুরোনো রাজনৈতিক ধারণা ও পরিচয়ের এই ধারাবাহিকতা তাদের রাজনীতিতে লক্ষ করা যায়। তবে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, সামগ্রিকভাবে তারা বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।

এই ইতিহাস ফিরে দেখা জরুরি। কারণ, বিপ্লবী পরিচয় কিংবা নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বোঝার নিশ্চয়তা দেয় না। মতাদর্শ যখন বাস্তবতা বিশ্লেষণের হাতিয়ার না হয়ে সব ঘটনাকে একটি পূর্বনির্ধারিত ছকে ফেলার মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন রাজনৈতিক বিচারবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভারতের নকশালপন্থী ও চীনপন্থী রাজনীতির অবস্থান পর্যালোচনা করলে সেই ভুলপাঠের ধরন ও পরিণতি বোঝা যায়। অতীতের এই অভিজ্ঞতা আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: কোনো আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করাই কি যথেষ্ট, নাকি তার সামাজিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তী ক্ষমতার গতিপথও বুঝতে হবে?


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!