ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে তারা প্রথমে খোঁজে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে ছিল বিএনপির ‘কালো হাত’। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকারের ভাষ্যে, কিছু মহল গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত করতে শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে। সরকার বদলেছে, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় বদলেছে; কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখার রাজনৈতিক প্রবণতা বদলায়নি।
১০ নভেম্বর ২০২৩—আওয়ামী লীগ সরকারের আমল। সমকালের শিরোনাম ছিল: “পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে বিএনপির হাত আছে: ওবায়দুল কাদের।” আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেছিলেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের পেছনে বিএনপি ও তার সহযোগীদের ‘কালো হাত’ রয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, তারা শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে এবং গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
৩ নভেম্বর ২০২৬—বিএনপি সরকারের আমল। সমকালের শিরোনাম: “কোনো কোনো মহল গার্মেন্টস উৎপাদন ব্যাহত করতে উসকানি দিচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও পোশাকশিল্পে অস্থিরতার পেছনে কিছু মহলের উসকানির অভিযোগ তুলেছেন।
দুই বক্তব্যের ভাষা এক নয়। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরাসরি বিএনপিকে দায়ী করেছিল; ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার দায়ী করছে ‘কোনো কোনো মহলকে’। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের দাবির চেয়ে আন্দোলনের পেছনে কারা আছে, সেটিই সামনে এসেছে। অথচ মূল প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে: শ্রমিকেরা কেন রাস্তায় নামছেন? তাঁদের মজুরি, জীবনযাপন ও কর্মপরিবেশের সংকটের সমাধান হচ্ছে না কেন?
শ্রমিকদের আন্দোলনে রাস্তা বন্ধ হয়, যানজট বাড়ে, কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কর্মজীবী মধ্যবিত্তের ভোগান্তি তৈরি হয়। এই অসুবিধা বাস্তব এবং তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য ও সংবাদ প্রচারে অনেক সময় এই নাগরিক ভোগান্তিই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের ক্ষুধা, ঋণ, বাসাভাড়া কিংবা পরিবারের চিকিৎসা ও শিক্ষার সংকট আড়ালে পড়ে যায়।
মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন অসুবিধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শ্রমিকের বেঁচে থাকার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মধ্যবিত্ত মানুষ যানজটে কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকতে পারেন; কিন্তু একজন শ্রমিকের এক দিনের কাজ বন্ধ থাকা মানে অনেক সময় এক দিনের আয় হারানো। সেই আয় দিয়ে তাঁর পরিবারের খাবার কেনার কথা। দুই পক্ষের সমস্যাকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেখলে সংকটের প্রকৃত কারণ আড়াল হয়।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের শ্রমে তৈরি পোশাক আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হয়, দেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। কিন্তু শিল্পের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে শ্রমিকের জীবনমানের উন্নতি সব সময় তাল মিলিয়ে চলে না। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও দেখা যাচ্ছে, অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকের মজুরি কেবল উৎপাদন খরচের একটি হিসাব নয়; এটি তাঁর জীবনধারণের ভিত্তি। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও মজুরি যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শিল্পের সাফল্য পরিমাপ করতে হলে রপ্তানি আয় ও মুনাফার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানও বিবেচনায় নিতে হবে।
পোশাকশিল্পের সংকটের দায় শুধু শ্রমিক বা মালিক—কোনো এক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মালিকদের উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং সরকারের নীতি—সবকিছুর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও কর্মপরিবেশ জড়িত। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চাইলে তার চাপ শেষ পর্যন্ত উৎপাদনব্যবস্থার ওপর পড়ে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাদের দায়িত্ব রয়েছে।
একই সঙ্গে মালিকদের শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব শ্রম আইন কার্যকর করা, শ্রমিকের সংগঠন ও যৌথ দর-কষাকষির অধিকার রক্ষা করা এবং বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান নিশ্চিত করা। শুধু নতুন মজুরি ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; সেই মজুরি বাস্তবে জীবনযাপনের উপযোগী কি না, সেটিও দেখতে হবে।
শ্রমিকদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ। কিন্তু তাতে তাঁদের সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অভিযোগ, ভয় দেখানো কিংবা দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করলে অসন্তোষ আরও জমতে থাকে। শ্রমিকদের দাবি শোনা, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানো এবং তাঁদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই সরকারের বক্তব্যের মধ্যে যে মিল দেখা যাচ্ছে, তা কেবল রাজনৈতিক ভাষার মিল নয়; এটি শ্রমিকের অধিকারকে রাজনৈতিক সন্দেহের চোখে দেখার একটি ধারাবাহিক প্রবণতা। সরকার বদলালেও এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি।
কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে অর্থনীতির ক্ষতি হয়। কিন্তু শ্রমিকের জীবন যখন প্রতিদিন অভাব, ঋণ ও ক্ষুধার মধ্যে আটকে থাকে, তখন সেই ক্ষতিকে অর্থনীতির হিসাবের বাইরে রাখা হয় কেন? শ্রমিকের ন্যায্য দাবি পূরণ হলে শিল্পও স্থিতিশীল হয়, উৎপাদনও সচল থাকে। সরকারের দায়িত্ব শ্রমিকের কণ্ঠ বন্ধ করা নয়; এমন মজুরি ও জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া, যাতে মানুষকে বেঁচে থাকার দাবিতে বারবার রাস্তায় নামতে না হয়।
সূত্র: সমকাল, ১০ নভেম্বর ২০২৩ ও ৩ নভেম্বর ২০২৬।