রাজনীতিতে একটি পুরোনো কথা আছে—সরকার যখন সমস্যার সমাধান করতে পারে না, তখন সে প্রথমে সমস্যাটিকেই অস্বীকার করে। তারপর আন্দোলনকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করে, এরপর ভয় দেখায়, তারপর দমন-পীড়ন চালায়। সবশেষে যখন আর কোনো পথ খোলা থাকে না, তখন সেই দাবিই মেনে নেয়, যেটিকে কয়েকদিন আগেও “রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র” বলে প্রচার করা হয়েছিল। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ যেন সেই পুরোনো রাজনৈতিক নাটকেরই সর্বশেষ দৃশ্য।
প্রায় এক মাস ধরে দিল্লির যন্তর-মন্তরে শিক্ষার্থীরা বসে ছিল। তাদের দাবি ছিল খুব সাধারণ—প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হোক, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার হোক এবং রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করুন। কিন্তু সরকারের চোখে এই দাবিগুলো এতটাই “বিপজ্জনক” হয়ে উঠল যে, রাস্তা বন্ধ হলো, মেট্রো স্টেশন বন্ধ হলো, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা হলো, ব্যারিকেড উঠল, পুলিশ নামল, লাঠি উঠল। যেন শিক্ষার্থীরা কোনো প্রশ্নপত্র নয়, রাষ্ট্রক্ষমতাই ছিনিয়ে নিতে এসেছে।
সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ছাত্রদের কেবল নিরাপত্তা সমস্যার চোখে দেখা। ইতিহাস বলে, ছাত্রদের হাতে বই থাকলে সরকার নিশ্চিন্ত থাকে; কিন্তু সেই বইয়ের পাতায় যদি প্রশ্নের বদলে অন্যায়ের হিসাব লেখা শুরু হয়, তখন রাষ্ট্রের অস্বস্তি বাড়ে। আর সেই অস্বস্তি থেকেই জন্ম নেয় দমন-পীড়ন। কিন্তু দমন-পীড়নেরও একটি সীমা আছে। কারণ ভয় কখনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান নয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ককরোচ জনতা পার্টির নাম নিয়েও কম হাসাহাসি হয়নি। অনেকেই ব্যঙ্গ করেছিলেন—রাজনীতিতে আবার ককরোচের কী কাজ? কিন্তু আন্দোলনকারীরা প্রতীকটি বেছে নিয়েছিল ভেবেচিন্তেই। ককরোচকে যতবার পিষে ফেলার চেষ্টা করা হয়, সে ততবার ফিরে আসে। রাষ্ট্র হয়তো সেই প্রতীকটির গভীরতা বুঝতে পারেনি। ফলে আন্দোলনকারীদের সরাতে গিয়ে আন্দোলনকেই আরও বড় করে তুলেছে।
সোনাম ওয়াংচুকের অনশন, তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও—প্রতিটি ঘটনাই সরকারের বিরুদ্ধে জনমতকে আরও সংগঠিত করেছে। রাষ্ট্র বারবার ভেবেছে শক্তি দেখালে আন্দোলন ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো। যত বেশি চাপ বেড়েছে, তত বেশি মানুষ যন্তর-মন্তরের পথে নেমেছে। অবশেষে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি বলেছেন, দেশের ঐক্য রক্ষা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিকে সুযোগ না দেওয়ার কথা ভেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কথাগুলো রাজনৈতিকভাবে শোভন শোনায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতেই হয়, তবে এতদিন ধরে সংঘাত, দমন-পীড়ন এবং অস্বীকারের প্রয়োজন কী ছিল?
এই ঘটনাটি আরও একটি রাজনৈতিক সত্য সামনে এনে দিয়েছে। সরকার অনেক সময় মনে করে ক্ষমতা মানেই নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু গণতন্ত্রে নিয়ন্ত্রণেরও সীমা আছে। সংসদ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তদন্ত সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু মানুষের ক্ষোভকে অনির্দিষ্টকাল নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বিশেষ করে সেই ক্ষোভ যদি তরুণ সমাজের হয়। ভারতের বিরোধী দলগুলো এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে—এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হলো সরকারের ব্যর্থতাকে রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করা। কিন্তু এটাও সত্য, এই আন্দোলন কেবল বিরোধী দলের ডাকে তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এই ক্ষোভ কোনো রাজনৈতিক দলের সৃষ্টি নয়; বরং রাজনীতির ব্যর্থতার ফল।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য। কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত বিজয় ভাবারও কারণ নেই। একজন মন্ত্রী চলে গেলে যদি সেই একই প্রশাসনিক কাঠামো, একই প্রশ্নপত্র মাফিয়া, একই দুর্নীতি, একই স্বজনপ্রীতি এবং একই জবাবদিহিহীনতা বহাল থাকে, তাহলে কয়েক মাস পর আবারও নতুন কোনো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে একই দাবির মুখোমুখি হতে হবে। আর সরকার যদি মনে করে একজন মন্ত্রীকে সরিয়েই জনরোষ থেমে যাবে, সেটিও হবে আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ আন্দোলনের লক্ষ্য ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তিকে অতিক্রম করে একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন শুধু জানতে চায় না প্রশ্নপত্র কে ফাঁস করল; তারা জানতে চায় কেন বারবার একই ঘটনা ঘটে এবং কেন তার দায় কেউ নেয় না।
আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং পরিচয়ের রাজনীতি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রধান স্থান দখল করে ছিল। কিন্তু এই আন্দোলন দেখিয়ে দিল, যখন চাকরি নেই, পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই, তখন ধর্ম নয়—রুটি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পরিচয়ের রাজনীতি হয়তো ভোট জিততে সাহায্য করে, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারে না।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ভারতের স্বাধীনতার পর কেবলমাত্র গণবিক্ষোভের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের পতনের নজির নেই। এই আন্দোলন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতে পারে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, এমনকি নীতিগত পরিবর্তন আনতেও বাধ্য করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভাগ্য নির্ধারণ করবে ভোটাররাই। গণতন্ত্রে আন্দোলন জনমত তৈরি করে, আর জনমত শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে তার রায় দেয়। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ তাই কোনো গল্পের শেষ নয়; বরং একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। কারণ প্রশ্নটি একজন মন্ত্রীকে নিয়ে নয়, রাষ্ট্র কীভাবে তার তরুণ নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ করে—সেটি নিয়ে। সরকার যদি এই বার্তাটি বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে ককরোচের প্রতীকটি হয়তো আবারও ফিরে আসবে। আর ইতিহাসের একটি নির্মম শিক্ষা হলো—যে রাষ্ট্র প্রতিবাদের ভাষা শুনতে চায় না, তাকে একদিন আরও বড় প্রতিবাদের ভাষা শুনতেই হয়।