রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবন ঘিরে ২৬ অক্টোবর রাতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা তাঁদের মিছিলের পর হামলা চালান এবং কার্যালয়ের সামনে তাঁদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। দুই যুব ইউনিয়নকর্মী আহত হয়েছেন বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। পুলিশ অবশ্য হামলা ও আহত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত বিবরণ নিরপেক্ষ তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
সিপিবির কার্যালয়ের এই ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাম, প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মসূচিতে বাধা, কর্মীদের ওপর হামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তবে প্রতিটি ঘটনার স্থান, সময়, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করেই সারাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাঁদের আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে হামলার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের এমন অভিযোগ সত্য হলেও তা কোনো সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা বা কর্মীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করার বৈধতা দেয় না। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ থাকলে তার জবাব রাজনৈতিক বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই দিতে হবে।
বাম ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তাদের বক্তব্য বা রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু সেই দ্বিমতকে ভয়ভীতি, হামলা কিংবা কার্যালয় ঘেরাওয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করা হলে রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয় এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও স্পষ্ট। সিপিবি কার্যালয়ের ঘটনায় কী ঘটেছে, কারা জড়িত এবং পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। একইভাবে, দেশের অন্যত্র বাম ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর ওপর হামলার যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোরও পৃথকভাবে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
গণতন্ত্রে কোনো দল এককভাবে জাতীয় ইতিহাস, দেশপ্রেম কিংবা রাজনৈতিক স্লোগামের মালিক হতে পারে না। আওয়ামী লীগ-সমর্থক হওয়ার অভিযোগ তুলে কাউকে আক্রমণ করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধের দায় এড়ানোর সুযোগও থাকা উচিত নয়।
প্রশ্নটি শুধু সিপিবির কার্যালয়ে কী ঘটেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে ভিন্নমত পোষণকারী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিরাপদে কাজ করতে পারবে কি না। গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয় শুধু নির্বাচনে নয়; বিরোধী মত, সংখ্যালঘু রাজনৈতিক ধারা এবং জনপ্রিয় নয় এমন মতামত প্রকাশের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তার মধ্য দিয়েও।