সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ পূর্বাহ্ন

ইতিহাসের বিচার দলিলে, বিতর্কে নয়: মেজর হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্য প্রসঙ্গে

সমসমাজ ডেস্ক।
রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান এবং স্বাধীনতার ঘোষণার প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১১ জুলাই ২০২৬ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান ভাঙতে চাননি, তাই ২৫ মার্চের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ এবং মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

এই বক্তব্যের মূল দুর্বলতা হলো, *পাকিস্তান ভাঙা” এবং “পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম*—এই দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নকে এক করে দেখা। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত সমঅধিকারের দাবি এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এক ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের স্পষ্ট রায় পাওয়ার পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করে রাজনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দেয়। পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাগত অধিকার, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন অস্বীকার করার ফলে সংকট ক্রমেই গভীর হয় এবং ১৯৭১ সালের মার্চে তা স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। একই সময়ে বেলুচিস্তানসহ পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশেও কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধিকারের দাবি বিদ্যমান ছিল, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংকটকেই নির্দেশ করে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনৈতিক ভিত্তি একদিনে গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৮ সালের ভাষা প্রশ্ন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের বরখাস্ত, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন এবং পরবর্তী গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালির জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই আওয়ামী লীগ ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান অখণ্ড পাকিস্তানের সব প্রদেশের জন্য ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একটি প্রকৃত ফেডারেল কাঠামোয় রূপান্তর করা। সে সময় দেশে সামরিক শাসন চলছিল এবং প্রকৃত ক্ষমতা ছিল আইয়ুব খানের হাতে। ফলে ৬ দফা শুধু গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপরেখা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে। এই ফলাফলের ভিত্তিতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাংবিধানিক সংকটকে সংঘাতে রূপ দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, *এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই আহ্বানে পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। প্রশাসনের বহু ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশ কার্যকর হতে থাকে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব পাকিস্তানের বহু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে গণহত্যা শুরু করলে রাজনৈতিক আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও গবেষকদের অসংখ্য স্মৃতিকথা ও গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের দীর্ঘ পূর্বাপর ইতিহাস অনেক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। মেজর হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্যেও সামরিক প্রতিরোধের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল থেকে দেখা যায়, ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর (বর্তমান বিজিবি), ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে একযোগে প্রতিরোধ শুরু হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্রনেতা এবং সাধারণ মানুষও বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে এই সম্মিলিত প্রতিরোধই পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। ফলে প্রতিরোধের ইতিহাসকে শুধু সামরিক বাহিনীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করলে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।

মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এর আগে একই কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের নেতা এম. এ. হান্নানও স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচারক্ষমতা সীমিত ছিল; ফলে দেশের অনেক অঞ্চলে সেই সম্প্রচার পৌঁছায়নি। একই সময়ে সিলেট, উত্তরবঙ্গ, যশোর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ নিজ উদ্যোগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুধু একটি ঘোষণার ওপর নির্ভর করলে ঘটনাপ্রবাহের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। মেজর হাফিজ উদ্দিন বর্তমানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর বক্তব্যে মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। তবে ইতিহাসের মূল্যায়ন রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়; দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সমসাময়িক নথি এবং গবেষণার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।

হাফিজ উদ্দিন আরও দাবি করেছেন যে, ২৫ মার্চের আগে তাজউদ্দীন আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু শেখ মুজিব নাকি তা প্রত্যাখ্যান করেন এই যুক্তিতে যে তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায় নিতে চান না। এই দাবির সমর্থনে ১৯৭১ সালের সমসাময়িক সরকারি দলিল, বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য বা তাজউদ্দীন আহমেদের নিজের বক্তব্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিষয়টি মূলত পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি স্মৃতিকথা ও গ্রন্থে উঠে এসেছে। ফলে এটি একটি বিতর্কিত বর্ণনা; প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে একে উপস্থাপন করা যায় না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না এবং মুক্তিযুদ্ধও কেবল কোনো একক ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সামরিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সংঘটিত হয়নি। দীর্ঘ গণআন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, জনগণের রাজনৈতিক ঐক্য এবং শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে **”পাকিস্তান ভাঙা”** এবং **পাকিস্তানি রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম**—এই দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নকে এক করে দেখলে ইতিহাসের প্রকৃত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়। ইতিহাসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রমাণ, দলিল এবং ঘটনাপ্রবাহের সামগ্রিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে; রাজনৈতিক অবস্থান বা পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নয়।

 


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!