রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন

মহিউদ্দিন আহমদ : এজেন্ডার রাজনীতি, মুসলিম লীগবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে শোক, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক মাতম আগের তুলনায় কমেছে, কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। বরং এর ভাষা ও কৌশল বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে কেবল সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক ধারা, যার শিকড় মুসলিম লীগবাদী রাজনীতিতে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগ একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যত পরাজিত ও বিলুপ্ত হয়। কিন্তু মুসলিম লীগবাদ একটি রাজনৈতিক চিন্তাধারা হিসেবে বিলীন হয়নি। সময়ের সঙ্গে এটি নতুন রূপ ধারণ করেছে—কখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কখনও ধর্মকে রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করে, আবার কখনও অন্ধ ভারতবিরোধিতাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এসব প্রবণতা মিলেই এমন একটি রাজনৈতিক বয়ান গড়ে তোলে, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ঐতিহাসিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।

এই ধারার প্রধান বাহক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি হলেও, অনেক সময় ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কিছু বামপন্থী বা কথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যও অনিচ্ছাকৃতভাবে একই বয়ানকে শক্তিশালী করে। উদ্দেশ্য এক না হলেও ফলাফল এক হতে পারে। কারণ রাজনীতিতে শুধু কী বলা হচ্ছে তা নয়, কোন বক্তব্য বারবার জনপরিসরে পুনরুৎপাদিত হচ্ছে এবং কোন এজেন্ডা আলোচনার কেন্দ্রে আসছে—সেটিই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। কিন্তু অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিকভাবে মতাদর্শিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানপন্থী চিন্তা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক সংগ্রাম গড়ে তোলা যায়নি। ফলে পরাজিত রাজনীতি নতুন ভাষা ও নতুন পরিচয়ে সমাজে পুনরায় জায়গা করে নেয়। এর একটি প্রকাশ হলো, কিছু মুক্তিযোদ্ধার পরবর্তী সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া। সংখ্যাটি বড় না হলেও আরও বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলোতে থেকেও রাজনৈতিক চিন্তায় ক্রমে দক্ষিণপন্থী অবস্থানের দিকে সরে গেছেন।

এই বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের একটি লেখা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। প্রথম আলোয় ৩ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত *”ফিরে দেখা ইতিহাসের দীর্ঘতম জুলাই”* শীর্ষক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন: “১৯৭১ সালের কথা আমরা জানি। পাকিস্তান ভেঙে গেল। জন্ম হলো বাংলাদেশের। মাঝে অনেক রক্ত ঝরল। কেন এমন হলো? এখানেও আছে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। পাকিস্তান তো সোনার দেশ ছিল! দুধ আর মধুর নহর বয়ে চলত! পাকিস্তানের শত্রুদের এটি সহ্য হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ভারতকে দিয়ে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানিয়ে দিয়েছে। দেশের মানুষ এটি চায়নি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানুষের কোনো ক্ষোভ ছিল না।” প্রথম পাঠে মনে হতে পারে, লেখক কি সত্যিই এসব বক্তব্য সমর্থন করছেন। দ্বিতীয় পাঠে বোঝা যায়, তিনি এগুলোকে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু তৃতীয়বার, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে পড়লে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—এ ধরনের বয়ান বারবার উদ্ধৃত করার রাজনৈতিক ফল কী?

এই বক্তব্যগুলো নতুন নয়। পাকিস্তান ভাঙা ছিল বিদেশি ষড়যন্ত্র, বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়নি কিংবা পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের কোনো ক্ষোভ ছিল না—এ ধরনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক ধারার পরিচিত প্রচারণার অংশ। ফলে এসব বক্তব্য বারবার জনপরিসরে ফিরে এলে, লেখকের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও, সেই পুরোনো বয়ানই আবার দৃশ্যমান হয় এবং জন আলোচনার কেন্দ্র দখল করে। এটি এক ধরনের “পোষা বিতর্ক”—যেখানে আলোচনার বিষয় নির্ধারণ করে দেয় প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি, আর অন্যরা সেই নির্ধারিত বিতর্কের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো *মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য* প্রতিষ্ঠা করা। এর লক্ষ্য শুধু মতাদর্শ প্রচার নয়; বরং সমাজ কী নিয়ে ভাববে, কী নিয়ে তর্ক করবে এবং কোন প্রশ্নকে প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করবে, সেটিও নির্ধারণ করা। যদি জনআলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির পুরোনো প্রচারণা, তবে গণতন্ত্র, বৈষম্য, অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন কিংবা ব্যবস্থাবদলের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবেই আড়ালে চলে যায়।

অথচ ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার মূল কারণ ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে সামরিক শাসকদের প্রত্যাখ্যান করা। পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। রাষ্ট্রভাষা, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাঙালিরা বৈষম্যের শিকার ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। বরং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করে। এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধে। পরবর্তীতে ভারতের সামরিক সহায়তা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কিন্তু এগুলো ছিল চলমান যুদ্ধের আন্তর্জাতিক মাত্রা; বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল কারণ নয়। স্বাধীনতার ভিত্তি ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের গণরায়, রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের গণহত্যামূলক দমননীতি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই দুটি বড় রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পাশাপাশি ছিল। একটি ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম; অন্যটি ছিল শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতি এই দুই প্রবণতারই প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে জনপরিসর ক্রমেই এমন বিতর্কে আবদ্ধ হচ্ছে, যার কেন্দ্র নির্ধারণ করছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির পুরোনো বয়ান।

আজ তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণের প্রশ্নকে সামনে আনব, নাকি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির নির্ধারিত এজেন্ডার জবাব দিতেই ব্যস্ত থাকব? কারণ নেতিবাচক প্রচারও শেষ পর্যন্ত প্রচারই। কোনো বয়ানকে বারবার পুনরাবৃত্তি করা হলে, তাকে খণ্ডনের উদ্দেশ্য থাকলেও, তা মানুষের স্মৃতি ও রাজনৈতিক কল্পনায় স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষার সংগ্রাম শুধু তথ্যের লড়াই নয়; এটি জনপরিসরের এজেন্ডা কার হাতে থাকবে, সেই রাজনৈতিক সংগ্রামও।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!