রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন

ফাহমিদুল হকের জুলাই বিশ্লেষণে স্ববিরোধিতার প্রশ্ন

অপু সারোয়ার
বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

ফাহমিদুল হক চলচ্চিত্র সমালোচক, গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও গল্পকার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি সদস্য। জুলাইয়ে ক্ষমতার পালাবদলের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার কারণ নিয়ে তিনি সম্প্রতি দৈনিক আজকের পত্রিকা-কে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। জুলাইজুড়ে বিভিন্ন পত্রিকায় এ ধরনের বহু লেখা ও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এসব আলোচনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মহিমান্বিত করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ছিল ব্যাপক। সেই বিক্ষোভের কারণে তাঁর সরকারের পতন অনেকের কাছে সময়ের অপেক্ষা ছিল। জুলাই আন্দোলনের একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে যুক্ত হন এবং সরকারের পতনের দাবি জানান। ফাহমিদুল হক কিংবা তাঁর মতো বুদ্ধিজীবীদের সাক্ষাৎকার যারা নেন, তাঁদের অনেকেই অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসম্পন্ন সাংবাদিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা এমন পাল্টা প্রশ্ন এড়িয়ে যান, যা একজন সাংবাদিকের পক্ষ থেকে করা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। ফলে সাক্ষাৎকারে উত্থাপিত বক্তব্যের স্ববিরোধিতা বা দুর্বলতা যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে আজকের পত্রিকা-য় প্রকাশিত মাসুদ রানা নেওয়া ফাহমিদুল হকের সাক্ষাৎকারটিও এ ধরনের একটি উদাহরণ।

সাক্ষাৎকারে ফাহমিদুল হক সাবলীলভাবে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তিনি জুলাইকে “ব্যর্থ” বললেও সেই ব্যর্থতার দায় জনগণের নয়, বরং অতিলোভী কিছু রাজনৈতিক দলের বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি “মেটিকুলাস ডিজাইন” ধারণাটিকে আওয়ামী লীগের প্রচারণা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আজকের পত্রিকা-র প্রশ্ন ছিল, “জুলাই আন্দোলন নিয়ে সম্প্রতি কেউ কেউ বলছেন, পুরোটাই মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?” জবাবে তিনি বলেন, “এটা তো আওয়ামী লীগের বক্তব্য। কিন্তু আমি এটাকে কোনোভাবেই একটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বা ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বলতে চাই না।”

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত ও ধারণাগত প্রশ্ন রয়েছে। ফাহমিদুল হক Meticulous Design–এর অর্থ হিসেবে “পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” ব্যবহার করেছেন। অথচ শব্দগুচ্ছটির আক্ষরিক অর্থ হলো অত্যন্ত যত্নসহকারে, সূক্ষ্মভাবে এবং খুঁটিনাটি বিবেচনায় তৈরি করা পরিকল্পনা বা নকশা। শব্দটির মধ্যে নিজস্বভাবে ষড়যন্ত্রের অর্থ নেই। “মেটিকুলাস ডিজাইন” শব্দবন্ধটি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের সূত্রে ব্যাপক আলোচনায় আসে। তিনি এবং সরকারের অন্যান্য নীতিনির্ধারক বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন, রূপরেখা প্রণয়ন এবং জুলাই আন্দোলনের পটভূমি ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সতর্ক পরিকল্পনার ফল।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার পতন আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে যুক্তরাষ্ট্রের এক অনুষ্ঠানে পরিচয় করিয়ে দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে মাহফুজ আলমও বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রথম অংশ ‘অবশ্যই মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ ছিল (ভোরের কাগজ, ৪ জুলাই ২০২৫)। জনপরিসরে “মেটিকুলাস ডিজাইন” শব্দবন্ধটি প্রশ্নের মুখে পড়ার পর এবং জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক বাড়ার প্রেক্ষাপটে ফাহমিদুল হক শব্দটির ভিন্ন অর্থ উপস্থাপন করে পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। “Meticulous” শব্দটি সাধারণভাবে ইতিবাচক অর্থ বহন করে। বাংলাতেও এমন বহু শব্দ রয়েছে, যেগুলো ইংরেজিতে বললে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য বা মর্যাদাপূর্ণ শোনায় এবং বিতর্কিত অবস্থান ব্যাখ্যায় সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ফাহমিদুল হক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “জুলাই আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে একটি ভালো পরিকল্পনা ছিল।” এই বক্তব্যের সঙ্গে Meticulous Design–এর অর্থগত মিল রয়েছে। Meticulous Design–এর অর্থ “ভালো”, “নিখুঁত” বা “অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রণীত পরিকল্পনা”—”পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” নয়। কিন্তু তিনি এই শব্দবন্ধের ভিন্ন অর্থ দাঁড় করিয়ে Meticulous Design–কে “পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা মাসুদ রানা Meticulous Design–এর প্রচলিত অর্থ সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি ফাহমিদুল হকের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী প্রশ্ন তোলেননি। এই নীরবতা একদিকে সাক্ষাৎকারদাতার বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জহীন রেখে দেয়, অন্যদিকে জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে প্রশ্নহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতেও ভূমিকা রাখে। ফলে ফাহমিদুল হকেরা ইতিহাসের একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, আর সাংবাদিকেরা তা পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন।

ফাহমিদুল হকের সাক্ষাৎকারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি রয়েছে। তিনি বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে “জামায়াতের গাইডেন্স” অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতে ইসলামীর একক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে, তাদের উগ্রতাকে নীরবে বা প্রত্যক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়েছে এবং সরকারের ওপর আমেরিকান লবির প্রভাবও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু এরপর তাঁর উপসংহার আগের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে না। তিনি বলেন, এই ব্যর্থতার জন্য সাধারণ মানুষ দায়ী নয়; দায় রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের, যারা অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু যদি স্বীকার করা হয় যে আন্দোলনে “জামায়াতের গাইডেন্স” ছিল, তাহলে আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সে ক্ষেত্রে আন্দোলনের ফল ডানপন্থী শক্তির অনুকূলে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। অথচ ফাহমিদুল হক এই প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে পুরো দায় পরবর্তী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়েছেন।

তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণও একই ধারার। ২৭ মে ২০২৫ তারিখে যুগান্তর-এ যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারের খালাস প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “ভারত মুক্তিদের ড্রাগ খাইয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল! জামায়াতে ইসলামীর কেউ যুদ্ধাপরাধ করেনি।” এই মন্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আজকের পত্রিকা-য় প্রকাশিত পুরো সাক্ষাৎকারটিও একই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, “জুলাই সনদ” গৃহীত হলে বর্তমান সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!