রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

ফকল্যান্ডের ব্যানার ঘিরে বিতর্ক, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার দ্বারস্থ ব্রিটেন

ক্রীড়া ডেস্ক
শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর আর্জেন্টিনা দলের উদযাপনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের হাতে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি রাজনৈতিক বার্তা-সংবলিত ব্যানার দেখা যাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের জন্য ফিফার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচ শেষে উদযাপনের সময় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা সমর্থকদের দেওয়া একটি ব্যানার তুলে ধরেন। ব্যানারে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল, “Las Malvinas son Argentinas”, অর্থাৎ **”মালভিনাস আর্জেন্টিনার”**। আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে **ইসলাস মালভিনাস** নামে অভিহিত করে এবং দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপপুঞ্জটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে।

ঘটনার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেন, *”বিশ্বকাপ আমাদের না-ও হতে পারে, কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবশ্যই আমাদের।”* তিনি আরও বলেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেখানকার জনগণের এবং ফকল্যান্ডের প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি কখনো নড়বড়ে হবে না। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই খেলোয়াড়দের কর্মকাণ্ডকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বড় জয়ের পর খেলোয়াড়রা আবেগে ভেসে এমন কাজ করে ফেলতে পারেন। তবে এ ঘটনায় জরিমানা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়াররুয়েল খেলোয়াড়দের প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যানার হাতে খেলোয়াড়দের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, “মালভিনাস আর্জেন্টিনার। স্টেডিয়ামে ব্যানার নিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল—আমরা এটিকে আমাদের রক্তে ও হৃদয়ে বহন করি।” ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস, যিনি গত চার বছর ধরে ইংল্যান্ডে খেলছেন, বলেন, *”আমরা আর্জেন্টিনার মানুষকে হতাশ করতে পারতাম না।”* আর মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস বলেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধ আর্জেন্টিনার ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেই স্মৃতি তাদের মনে ছিল এবং তারা সেই ইতিহাসের মানুষদের জন্যও খেলেছেন।

ফকল্যান্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ একটি ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি। প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বসবাস এই দ্বীপপুঞ্জে। এটি যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার এবং আর্জেন্টিনা থেকে মাত্র ৪৮০ কিলোমিটার দূরে। আর্জেন্টিনার দাবি, ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন অবৈধভাবে দ্বীপপুঞ্জটি দখল করে। অন্যদিকে ব্রিটেনের দাবি, ১৭৬৫ সাল থেকেই তারা এই ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ফকল্যান্ড দখল করলে দুই দেশের মধ্যে ১০ সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে বিজয়ী হয় ব্রিটেন।

ফিফার সামনে শাস্তির প্রশ্ন

ফিফার বিধিমালায় ফুটবলে রাজনৈতিক বার্তা বা প্রতীক প্রদর্শন নিরুৎসাহিত করা হয়। তাই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের এই কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি অবশ্য এমন প্রথম ঘটনা নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে একই ধরনের **”Las Malvinas son Argentinas”** বার্তা প্রদর্শনের কারণে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ৩৭ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করেছিল ফিফা।

এ ছাড়া ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলার পার্ক জং-উ **”Dokdo is our territory”** লেখা ব্যানার প্রদর্শন করায় দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পান। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কসোভোকে সার্বিয়ার অংশ হিসেবে দেখানো একটি রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানোর দায়ে সার্বিয়া ফুটবল ফেডারেশনকেও জরিমানা করেছিল ফিফা।

ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মতে, ফুটবলকে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে দূরে রাখা উচিত এবং এখন বিষয়টি ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে লাল কার্ড পাওয়ার পরও পরবর্তী ম্যাচে খেলার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংস্থাটি সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের দাবি, এ ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে আর্জেন্টিনার এই ঘটনাতেও ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকে এখন ফুটবল বিশ্বের নজর।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!