৯ অক্টোবর চে গুয়েভারার মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছর এই দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ছবি, বিপ্লবী স্লোগান আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আবেগের ঢেউ ওঠে। তারাভরা টুপি পরা চে যেন শোষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু যে বিপ্লব তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল, তার পর কিউবার মানুষ কেমন জীবন পেয়েছেন? রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে? নাগরিকের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত হয়েছে? অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
এসব প্রশ্ন তুললেই অনেকে অস্বস্তিতে পড়েন। কারও কাছে চে-র সমালোচনা মানেই সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ নেওয়া; কারও কাছে সমাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যই তার সাফল্যের প্রমাণ। অথচ ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক মতবাদের প্রচারপত্র নয়। মার্কস-এঙ্গেলসের দর্শন উদ্ধৃত করলেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না, বিপ্লবী সরকার ক্ষমতায় বসলেই মানুষের স্বাধীনতা ও সচ্ছলতা নিশ্চিত হয় না। আদর্শের বিচার করতে হয় তার বাস্তব পরিণতি দিয়ে। চে-কে বুঝতে হলে তাই তাঁর কিংবদন্তির পাশাপাশি কিউবার রাজনৈতিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক নীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিণতিও দেখতে হবে।
১৯৫৯ সালে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব স্বৈরশাসক ফুলহেনসিও বাতিস্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ এই বিপ্লবের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। বিপ্লব শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু স্বৈরশাসকের পতন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়।
বিপ্লবের পর কিউবায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়। স্বাধীন রাজনৈতিক বিরোধিতা, সংবাদমাধ্যম ও সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের মুক্তির নামে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রে নাগরিকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হতে থাকে। এখানেই কিউবার অভিজ্ঞতার মৌলিক প্রশ্ন: জনগণের নামে পরিচালিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণ স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারলে, সেই রাষ্ট্রকে কতটা মুক্তিকামী বলা যায়?
কিউবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং চাপের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সব ব্যর্থতার ব্যাখ্যা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে খুঁজলে রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক দমনের দায় আড়ালে থেকে যায়। আবার কিউবার অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার কথা বলতে গিয়ে মার্কিন নীতির প্রভাব অস্বীকার করাও ইতিহাসের বিকৃতি। কিউবার অভিজ্ঞতা বুঝতে হলে দুই বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে হবে।
জাতীয় মুক্তির বিপ্লব থেকে সোভিয়েত মডেলের সমাজতন্ত্র
কিউবার বিপ্লবকে শুরু থেকেই সুপরিকল্পিত কমিউনিস্ট বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করা ইতিহাসের সরলীকরণ। ১৯৫৯ সালের আগে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন ২৬ জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচি ছিল মূলত স্বৈরশাসনের অবসান, জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার। বিপ্লবের সূচনালগ্নে ক্যাস্ত্রো প্রকাশ্যে নিজেকে কমিউনিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তাঁর আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী, সমাজসংস্কারক ও কমিউনিস্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মানুষ যুক্ত হয়েছিলেন।
বাতিস্তার পতনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ভূমি সংস্কার, বিদেশি সম্পত্তি জাতীয়করণ এবং মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত কিউবার সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ১৯৬১ সালের বে অব পিগস আক্রমণ এই সংঘাতকে আরও তীব্র করে। ওই বছরের এপ্রিলে ক্যাস্ত্রো বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক ঘোষণা করেন এবং ডিসেম্বরে নিজেকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হিসেবে পরিচয় দেন। অর্থাৎ জাতীয় মুক্তি ও সামাজিক সংস্কারের কর্মসূচি থেকে সোভিয়েত ঘরানার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে; এই পরিণতি বিপ্লবের শুরু থেকেই অবধারিত ছিল, এমন দাবি করা যায় না।
এই রূপান্তরে কিউবার পুরোনো কমিউনিস্ট সংগঠন Popular Socialist Party গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যাস্ত্রোর ২৬ জুলাই আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বিপ্লবী শক্তিকে একত্র করে প্রথমে Integrated Revolutionary Organizations গঠন করা হয়। পরে ১৯৬২ সালে তা United Party of the Cuban Socialist Revolution নামে পুনর্গঠিত হয়; ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি। এটি শুধু কয়েকটি সংগঠনের একীভূত হওয়ার ঘটনা ছিল না। বিপ্লবের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারাকে একটি কেন্দ্রীভূত কাঠামোর অধীনে আনা হয়, আর ক্রমে সেই দলই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত রাজনৈতিক চিন্তায় একটি ধারণা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে: বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু দেশ পশ্চিম ইউরোপের মতো পূর্ণাঙ্গ পুঁজিবাদী বিকাশের পথ অতিক্রম না করেও সমাজতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। পরে এই ধারণা ‘অ-পুঁজিবাদী বিকাশের পথ’ নামে পরিচিতি পায় এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বিতর্কে প্রভাব ফেলে। কিউবার অভিজ্ঞতা এই তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়; বরং জাতীয় মুক্তির আন্দোলন কীভাবে সোভিয়েত-ঘনিষ্ঠ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে, তার একটি বিশেষ ঐতিহাসিক উদাহরণ।
কিউবার বিশেষত্ব ছিল, এই রূপান্তর ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পশ্চিম গোলার্ধের একটি দেশে। জাতীয়করণ, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা, সোভিয়েত সহায়তা এবং কমিউনিস্ট পার্টির একক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফলে কিউবার বিপ্লবকে শুধু বাতিস্তার পতন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের সাফল্য দিয়ে বিচার করলে তার পরবর্তী ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দেখতে হয়, জাতীয় মুক্তির নামে শুরু হওয়া আন্দোলন কীভাবে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মডেল গ্রহণ করল এবং সেই মডেলে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্রমে একদলীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীভূত হলো।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: বিপ্লবের প্রাথমিক লক্ষ্য, বিপ্লব-পরবর্তী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র এক বিষয় নয়। এগুলোকে এক করে দেখলে কিউবার অর্জন যেমন অস্পষ্ট হয়, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও আড়ালে থেকে যায়।
চে গুয়েভারা শুধু গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন না। বিপ্লবের পর তিনি কিউবার জাতীয় ব্যাংকের সভাপতি এবং শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
চে দ্রুত শিল্পায়ন, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা এবং সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন। অর্থনৈতিক প্রণোদনার চেয়ে নৈতিক প্রেরণা ও বিপ্লবী চেতনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তাঁর চিন্তায় স্পষ্ট ছিল। কিন্তু অর্থনীতি পরিচালনা কেবল আদর্শ, সদিচ্ছা বা আত্মত্যাগের বিষয় নয়। উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, শ্রমের প্রণোদনা এবং মানুষের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের সমন্বয়ও জরুরি।
চে-র অর্থনৈতিক নীতি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ন্যায্য। তবে কিউবার অর্থনৈতিক সমস্যার সম্পূর্ণ দায় তাঁর ওপর চাপানোও ইতিহাসের সরলীকরণ। বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা—সবকিছুরই বিচার প্রয়োজন।
তবু একটি শিক্ষা স্পষ্ট: বিপ্লবী নিষ্ঠা দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প নয়। কোনো নেতা ব্যক্তিগত সাহস ও আত্মত্যাগের জন্য সম্মান পেতে পারেন; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর সাফল্য নির্ধারিত হবে নীতি ও ফলাফলের ভিত্তিতে। চে-র জনপ্রিয়তা তাঁর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের হিসাব মিটিয়ে দেয় না।
১৯৬৫ সালে চে কিউবার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ নিতে যান। আফ্রিকায় কর্মকাণ্ডের পর তিনি বলিভিয়ায় যান। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার পর তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যু তাঁকে বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী প্রতীকে পরিণত করে। কিন্তু মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া কিংবদন্তি তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনামূলক মূল্যায়নের বিকল্প নয়।
চে গুয়েভারাকে ট্রটস্কিবাদী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা কিছু স্তালিনবাদী মহলে দেখা যায়। কিন্তু তাঁর আন্তর্জাতিক বিপ্লবের ধারণা কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা তাঁকে ট্রটস্কিবাদী প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ট্রটস্কিবাদ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক ঐতিহ্য। কারও রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে তাঁর বক্তব্য, তাত্ত্বিক অবস্থান ও সংগঠনগত সম্পর্কের প্রমাণ প্রয়োজন।
চে ছিলেন মার্কসবাদী বিপ্লবী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী। কিন্তু সোভিয়েত নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেই কাউকে ট্রটস্কিবাদী বলা যায় না। রাজনৈতিক বিতর্কে এ ধরনের তকমা অনেক সময় যুক্তির বদলে প্রতিপক্ষকে শ্রেণিবদ্ধ করার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, কিউবার বিপ্লব-পরবর্তী ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীন ট্রটস্কিবাদী সংগঠন ও কর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিউবার ট্রটস্কিবাদী সংগঠন Partido Obrero Revolucionario-র ওপর ১৯৬৫ সালের দমন-পীড়ন এই ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। অর্থাৎ বিপ্লবী রাষ্ট্রের সংঘাত শুধু পুঁজিবাদী বিরোধীদের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না; স্বাধীন মার্কসবাদী ধারার সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তার সংঘাত হয়েছিল।
এখানে প্রশ্নটি আরও গভীর। শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র অন্য সমাজতন্ত্রীদের স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সহ্য করতে পারেনি কেন? সমাজতন্ত্রের ভেতরে মতপার্থক্য থাকলে তার জবাব হবে বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাধীনতার মাধ্যমে, নাকি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মাধ্যমে?
যে রাজনীতি শ্রমিকের মুক্তির কথা বলে, তার একটি মৌলিক পরীক্ষা হলো—শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার স্বাধীনতা পাচ্ছেন কি না। ক্ষমতাসীন দলের মতকেই সমাজতন্ত্রের একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে মুক্তির প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
কিউবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে। শিক্ষা বিস্তার, সাক্ষরতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসক প্রশিক্ষণে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। এসব অর্জন অস্বীকার করা তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা নয়। কিন্তু সামাজিক খাতে সাফল্য থাকলেই একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সফল হয়ে যায় না।
দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি, নিম্ন মজুরি, উৎপাদনের দুর্বলতা এবং ব্যাপক অভিবাসন কিউবার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে; পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক নীতির দুর্বলতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা জরুরি।
সমাজতন্ত্রের সাফল্য কি শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা কিংবা পুঁজিবাদের বিরোধিতা দিয়ে মাপা হবে? মানুষের পর্যাপ্ত খাবার আছে কি না, চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, কাজের সুযোগ রয়েছে কি না, নিজের মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না—এসব কি সাফল্যের হিসাবের বাইরে থাকবে? সরকারের বিরোধিতা করার অধিকারও কি মানুষের মুক্তির অংশ নয়?
যে সমাজতন্ত্র মানুষের মুক্তির কথা বলে, সেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পরস্পরের শত্রু বানানো যায় না। রাষ্ট্র যদি জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার দাবি করে, অথচ জনগণের স্বাধীন রাজনৈতিক সংগঠন ও বিরোধিতাকে ভয় পায়, তবে সেই ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
চে গুয়েভারার সাহস, ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু শ্রদ্ধা আর অন্ধ আনুগত্য এক নয়। তাঁর ছবি ধারণ করা সহজ; তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের হিসাব নেওয়া কঠিন। বিপ্লবের স্লোগান দেওয়া সহজ; বিপ্লবের পর মানুষের স্বাধীনতা ও জীবনমানের বিচার করা কঠিন।
মার্কসবাদ যদি বাস্তব সমাজ, উৎপাদনব্যবস্থা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণের পদ্ধতি হয়, তবে মার্কসবাদীদের দায়িত্ব নিজেদের পছন্দের বিপ্লবের ব্যর্থতাও পরীক্ষা করা। অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে সরব অথচ নিজেদের আদর্শের নামে সংঘটিত দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে নীরব থাকা কোনো বৈপ্লবিক সততা নয়।
চে-র মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিপ্লব কাদের মুক্তি দিয়েছিল, কাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করেছিল, আর তার প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল? কিউবার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অর্জন যেমন ইতিহাসের অংশ, তেমনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচন ও অর্থনৈতিক সংকটও তার অংশ।
বিপ্লবের সাফল্য নেতার ছবিতে নয়, মানুষের জীবনে; স্লোগানে নয়, স্বাধীনতায়; আদর্শের ঘোষণায় নয়, তার বাস্তব পরিণতিতে। চে-কে বুঝতে হলে তাঁকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন তাঁর জীবন, তাঁর সীমাবদ্ধতা এবং কিউবার ইতিহাসকে নির্ভয়ে বিচার করার সাহস। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে কোনো বিপ্লবের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়—সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।