সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন

যমুনা রহমান
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের অডিও বাজানোর অভিযোগে এক সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক করার ঘটনাকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ৭ মার্চ ,শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শাহবাগ থানা পুলিশ আসিফ নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগেই তাকে থানায় আনা হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় চানখাঁরপুল মোড়ে রিকশায় মাইক লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের একটি কর্মসূচি থেকে। এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে শাহবাগ থানার সামনে হামলার শিকার হন ইমি ও মামুন। পরে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—৭ মার্চের ভাষণ কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? বাস্তবতা হলো, ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অংশ। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক দলিল। ইউনেস্কো এই ভাষণকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” কর্মসূচির আওতায় বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারকে সরাসরি কোনো দলীয় কার্যক্রম হিসেবে দেখার যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছে, যখন সামাজিক মাধ্যমে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে আরেকটি বিতর্ক চলছিল। ভাষণের শেষে শেখ মুজিব ‘জয় পাকিস্তান’ না ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছিলেন—এই বিষয়টি নিয়ে দিনভর আলোচনা চলছিল। সেই বিতর্কের মধ্যেই ভাষণ বাজানোর অভিযোগে একজনকে আটক করার ঘটনাটি অনেকের কাছে রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অদ্ভুত চিত্র তুলে ধরেছে।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মুক্তির দাবিতে ১৫৬ জন নাগরিক একটি বিবৃতি দিয়েছেন। লেখক, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা এই বিবৃতিতে তাদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। নাগরিকদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকার জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং মব সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ইউনেস্কো স্বীকৃত ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ মব তৈরি করে হামলা চালিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পুলিশের সামনেই।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু শুধু মুক্তির দাবি জানিয়ে যদি ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তা হবে ‘মাছ না ছুঁই পানি না ছুঁই’ ধরনের অবস্থান। কারণ ৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি বক্তৃতা নয়। এটি ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষণ। সেই ভাষণের মধ্য দিয়েই বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক অস্তিত্বের ইতিহাস এই ভাষণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী স্থাপনাগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। জাতীয় জীবনের কিছু মৌলিক প্রতীক নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় প্রথাগত সম্মান প্রদর্শন না করার ঘটনাও আলোচিত হয়েছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিতর্কিত ব্যক্তিদের জন্য সংসদে শোক প্রস্তাব আনার ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো জাতীয় ইতিহাস ও স্মৃতির প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্য হলো—ইতিহাসের চরিত্রদের প্রশাসনিক নির্দেশে মুছে ফেলা যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্র, ক্ষমতা বা প্রচার—কোনোটাই ইতিহাসের স্থায়ী সত্যকে বদলে দিতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস নিজেই তার অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়। শেখ মুজিব দেবতা নন, তিনি পূজার বিষয়ও নন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মহানায়ক। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলার ইতিহাস লেখা মানে হবে ইতিহাসের এক বড় বিকৃতি।


একই ঘরনার সংবাদ

error: Content is protected !!
error: Content is protected !!