বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর ক্লাস চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাস্তবতার নিরিখে সরকারি সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি রাখে। দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ কম্পিউটার নেই। মোবাইল ফোন থাকলেও তার ছোট পর্দায় দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা কার্যকর হয় না। অনেক পরিবারের বাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নেই, আর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইনে যুক্ত হলে নেটের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিদ্যমান অবকাঠামো স্বল্পসময়ে উন্নত করার সুযোগও সীমিত। ফলে এই সিদ্ধান্ত কার্যত অনেক শিক্ষার্থীকে পিছিয়ে দিতে পারে এবং শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী অনলাইন ক্লাসের পক্ষে ৫৫ শতাংশ মানুষের সমর্থনের যে তথ্য দিয়েছেন। এই তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জরিপটি কীভাবে করা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের ভৌগোলিক ও সামাজিক অবস্থান কী—বিশেষ করে শহর ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব কতটা ছিল—এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই হিসাব মেনেও দেখা যায়, ৪৫ শতাংশ মানুষ অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। এত বড় একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভক্ত জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ইতোমধ্যে অফিস সময় কমিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের আয় ও জীবিকায়। কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের আয় কমছে, ফলে পরিবারের আর্থিক চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস চালু হলে বাড়িতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট খরচ যুক্ত হবে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নতুন বোঝা তৈরি করবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্য থাকলেও এর অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই বর্তাবে।
করোনা কালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারে না। শহরের কিছু শিক্ষার্থী সুবিধা পেলেও গ্রাম ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট, ডিভাইস ও বিদ্যুতের অভাবে পিছিয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করে। একই সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে—অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় না, মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয় এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও দুর্বল থাকে।
এই ধরনের অনিশ্চিত ও বারবার পরিবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পড়াশোনায় বিঘ্ন, অনিশ্চয়তা ও চাপ তাদের মধ্যে হতাশা ও অনুপ্রেরণার অভাব তৈরি করে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস প্রায় অকার্যকর, কারণ এই স্তরের শিক্ষা সরাসরি তত্ত্বাবধান ও অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে শেখা ছোট শিশুদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
এ ছাড়া অনলাইন ক্লাস চালু হলে পরিবারের ব্যয় আরও বাড়ে—ইন্টারনেট খরচ, ডিভাইস কেনা বা মেরামতের চাপ অনেকের জন্য সামলানো কঠিন। বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কতটুকু জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তারও কোনো সুস্পষ্ট হিসাব সামনে আসেনি। বরং ঝুঁকি রয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী আবারও শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়বে।
সবকিছু বিবেচনায় দেখা যায়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা খাতে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর সমাধান নয়। শিক্ষাই একটি জাতির ভিত্তি, তাই এই খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে সংকট মোকাবিলা করা যুক্তিযুক্ত নয়। বরং অন্যান্য খাতে অপচয় কমানো, বিকল্প নীতি গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষাবান্ধব, সমতাভিত্তিক এবং সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সবচেয়ে জরুরি।