সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আইনের শাসন, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের সামাজিক প্রভাব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁকে দফায় দফায় মারধর করা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলা থামেনি। হাসপাতালেও একদল লোক তাঁর ওপর হামলা চালায়। পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। হামলার আগে ফেসবুক লাইভে লোকজনকে জড়ো করার আহ্বান জানানো হয়েছিল বলেও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সহিংসতা কোনো অজ্ঞাতপরিচয় জনতার আকস্মিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রচার, লোকজন জড়ো করা এবং শাস্তির দাবিতে জনতাকে উত্তেজিত করার ঘটনা প্রকাশ্যেই ঘটেছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, সহিংসতার আশঙ্কা যখন দৃশ্যমান, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিরাপদ রাখা এবং জনতাকে নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেল না কেন?
অভিযোগের বিচার করার অধিকার জনতার নেই। আর কাউকে হত্যার অনুমতি দেওয়ার অধিকার ধর্মীয় পরিচয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা কোনো কথিত ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও নেই।
এখানে ধর্মীয় মৌলবাদের বিপজ্জনক চরিত্রটি স্পষ্ট। ধর্মের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কেউ যখন নিজেকে অভিযোগকারী, বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় বসান, তখন ধর্মীয় অনুভূতি ন্যায়বিচারের দাবি না থেকে জনতাকে সংগঠিত করার অস্ত্রে পরিণত হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বোঝা কিংবা অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই তখন হামলাকারীরা অনুভব করেন না। অভিযোগই হয়ে ওঠে দণ্ডাদেশ, আর জনতার ক্রোধ হয়ে ওঠে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যম।
এটি ধর্মরক্ষা নয়; এটি ধর্মের নামে আইন ও মানবিকতার ওপর আক্রমণ। ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা বা অবমাননাকর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, আইনগত প্রতিকারও চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনো বক্তব্যের কারণে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায় না ধর্মের মর্যাদা; বরং শক্তিশালী হয় ভয়, প্রতিহিংসা ও উগ্রতার সংস্কৃতি।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এ ধরনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জনতা জড়ো করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শামীমের ঘটনায় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে লোকজনকে জড়ো করার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি নিছক অনলাইন বক্তব্যের বিষয় নয়। অনলাইনে উসকানি যখন বাস্তবে হামলা ও হত্যার ঝুঁকি তৈরি করে, তখন তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি উঠেছে হাসপাতালের ঘটনাকে ঘিরে। পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছিল। অথচ সেখানে জনতা ঢুকে তাঁকে আবার মারধর করে এবং টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন একজন মানুষকে হাসপাতালের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো—এটি শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
তবে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু তদন্তের প্রয়োজন দেখিয়ে প্রশাসনের জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই। কখন হামলার খবর পাওয়া গিয়েছিল, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, হাসপাতালে পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল কি না, হামলাকারীরা কীভাবে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির কাছে পৌঁছাল এবং তাঁকে রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কী করেছিলেন—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর দিতে হবে।
প্রকাশ্যে উসকানির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ, হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শনাক্তকরণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। শুধু অজ্ঞাতপরিচয় জনতার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে থেমে গেলে চলবে না। পরিকল্পনাকারী, উসকানিদাতা, প্রত্যক্ষ হামলাকারী এবং সহায়তাকারী—প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে কোনো কর্মকর্তা অবহেলা করেছেন কি না, সেটিও স্বাধীনভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মামলা হয়েছে কিংবা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে—এমন ঘোষণা আর অপরাধীদের সত্যিকার অর্থে আইনের আওতায় আনা এক কথা নয়। তদন্তের অগ্রগতি, গ্রেপ্তার এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণকে স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে।
সাতক্ষীরার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতর সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, গুজব কিংবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দাবি তুলে মানুষকে আক্রমণ করার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। অতীতেও এ ধরনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড, বাড়িঘরে হামলা এবং ধর্মীয় উপাসনালয় ও মাজারে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রশ্ন তোলে—অপরাধের বিচার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং অপরাধীরা শাস্তির ভয় কতটা অনুভব করছে?
মব সন্ত্রাসের শক্তি শুধু জনতার সংখ্যায় নয়; এর পেছনে কাজ করে শাস্তি না পাওয়ার প্রত্যাশা। কেউ যখন মনে করেন, ধর্মীয় আবেগের আশ্রয় নিলে তাঁর সহিংসতা সামাজিক সমর্থন পাবে কিংবা প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে, তখন আইনের ভয় দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানি, দলবদ্ধ চাপ এবং অপরাধের পর উল্লাস—সব মিলিয়ে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এখানে ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা অপরিহার্য। যে চিন্তা নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে অন্যের জীবন ও অধিকারকে তুচ্ছ করে, যে চিন্তা ভিন্নমতকে আলোচনার বদলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং যে চিন্তা ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে আইনকে অকার্যকর করতে চায়, তা বহুত্ববাদী সমাজের জন্য বিপজ্জনক। ধর্মীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলে না। একইভাবে ধর্মের নামে সহিংসতার বিরোধিতা করা মানেই ধর্মের বিরোধিতা করা নয়।
প্রথমত, শামীম হত্যার ঘটনায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রমাণের ভিত্তিতে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ফেসবুক লাইভ, অডিও, ভিডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। আগে থেকে হামলার আশঙ্কা জানা ছিল কি না, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদে রাখার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না—তার জবাব প্রকাশ করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যার হুমকি, ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করে হামলার আহ্বান কিংবা জনতাকে সংঘবদ্ধ করার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় নেতাদেরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে—অভিযোগের বিচার আদালতের কাজ, জনতার নয়।
ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছিল, তার সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনানুগ তদন্তের। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা অভিযোগের সত্য-মিথ্যার চেয়েও মৌলিক: একজন নাগরিককে কি জনতার হাতে তুলে দিয়ে হত্যা করার সুযোগ দেওয়া যায়?
উত্তর অবশ্যই না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হত্যাকাণ্ডের পর মামলা করা নয়; হত্যার আশঙ্কা দেখা দিলে জীবন রক্ষা করা, অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকানোও তার দায়িত্ব। ধর্মীয় আবেগের কাছে নতি স্বীকার করে কিংবা জনতার ক্ষোভকে ভয় পেয়ে রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনের শাসন কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।
সাতক্ষীরার হত্যাকাণ্ডের বিচার তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যুর বিচার নয়। এটি নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশে অভিযোগের ভিত্তিতে জনতা কাউকে শাস্তি দেবে, নাকি নাগরিকের জীবন ও অধিকার রক্ষায় আইনই হবে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব।