শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! চে গুয়েভারা: কিংবদন্তি, ও বাস্তবতা  চট্টগ্রাম বন্দর: বিদেশি পুঁজির স্বার্থ, অস্বচ্ছ চুক্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির প্রতিবাদ ও বিবৃতি: এই চুক্তি দেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি চট্টগ্রাম বন্দর : গোপনীয়তা, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবাদ দমনের রাজনীতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী : বই নিষিদ্ধের অধিকার কার? বঙ্গোপসাগর থেকে হিমালয়: ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রমূলে বাংলাদেশ সংবিধান: বিতর্কের তিন শিকড় জাসদ অফিসে হামলা ও গ্রেফতার : ২৮৯ জন আটক টাকায় আপস, গরুতে সহায়তা—বিচার কোথায়? বারিধারায় মেহেদীর মৃত্যু: টাকার জোরে কি এবারও পার পেয়ে যাবে কেউ?
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রাম বন্দর : গোপনীয়তা, বিদেশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিবাদ দমনের রাজনীতি

সমসমাজ প্রতিবেদন।
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদের পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিছক বাণিজ্যিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, রাজস্ব, শ্রমিকের অধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দুই পক্ষের সম্মতিতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। টার্মিনালটির মাধ্যমে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়। ফলে এই চুক্তির গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনগণের জানার অধিকার, সংসদের ভূমিকা এবং জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?

বন্দর সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জনগণের সম্পদ নিয়ে সরকার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। নির্বাচিত বা অনির্বাচিত—কোনো সরকারই জনগণের সম্পদের স্থায়ী মালিক নয়; সরকার কেবল তার পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত স্বচ্ছতা, দ্বিতীয় শর্ত জবাবদিহি এবং তৃতীয় শর্ত জনস্বার্থের সুরক্ষা।

বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা করলেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয় না, আবার বিদেশি বিনিয়োগ এলেই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নতুন বিনিয়োগ বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাব্য সুবিধার বিনিময়ে রাষ্ট্র কী দায়িত্ব নিচ্ছে, কী অধিকার ছাড়ছে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের আর্থিক বা আইনি দায়ের মুখে পড়তে পারে—তার নিরপেক্ষ হিসাব থাকা চাই। বিনিয়োগের প্রচার শুনিয়ে চুক্তির ঝুঁকি আড়াল করা যায় না।

সরকারের দাবি, বিদেশি অপারেটর বন্দরের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করবে। কিন্তু এই দাবি যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, বিনিয়োগের প্রকৃত পরিমাণ, রাজস্ব ও মাশুলের হিসাব, কর্মদক্ষতার বাধ্যবাধকতা, চুক্তি ভঙ্গের পরিণতি এবং রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য। চুক্তির কিছু তথ্য প্রকাশিত হওয়া আর জনগণের সামনে চুক্তির সব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উন্মুক্ত করা এক কথা নয়।

কোন প্রক্রিয়ায় কোম্পানি নির্বাচন করা হয়েছে? দেশীয় ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিকল্প কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে? বিদেশি অপারেটরকে কী ধরনের পরিচালনাগত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে? শ্রমিকদের চাকরি ও সংগঠনের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? চুক্তি বাংলাদেশের প্রত্যাশিত স্বার্থ পূরণ না করলে রাষ্ট্রের হাতে কী প্রতিকার থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া জনগণকে শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট থাকতে বলা যায় না।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকারের কাছে অন্ধ আস্থা দাবি করার কোনো অধিকার নেই। বরং যত বড় সিদ্ধান্ত, তত বেশি জবাবদিহি প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করতে পারে এমন চুক্তি নিয়ে স্বাধীন অর্থনৈতিক ও আইনি পর্যালোচনা, সংসদে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা উচিত। সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি থাকলে তা প্রকাশ্যে তুলে ধরতে হবে। আর যদি কোনো শর্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে তা সংশোধনের পথও খোলা রাখতে হবে।

এই বিতর্কে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটার অভিযোগ। ৮ অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ের সামনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ লাঠিপেটা করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে এবং কয়েকজনকে আহত করে। পুলিশ অবশ্য লাঠিপেটার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ঘটনার বিবরণ নিয়ে বিরোধ থাকলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই: জাতীয় সম্পদ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো কি নাগরিকের অপরাধ? শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মিছিল গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই কাউকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য ভুল হলে তার জবাব তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দিতে হবে, পুলিশি শক্তি দিয়ে নয়।

সরকার যদি মনে করে চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক, তাহলে বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে এত অনীহা কেন? জনস্বার্থের সিদ্ধান্তকে জনসমালোচনা থেকে রক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। বরং সমালোচনা ও স্বাধীন পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদের জবাব যদি লাঠি হয়, তাহলে সন্দেহ আরও বাড়ে এবং সরকারের স্বচ্ছতার দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বদলালে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, মজুরি, কাজের পরিবেশ, শ্রমিক সংগঠনের অধিকার এবং বিদ্যমান কর্মীদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকা দরকার। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তন আমদানি-রপ্তানির মাশুলে কী প্রভাব ফেলবে, তার হিসাবও প্রকাশ করা উচিত। চুক্তির সুবিধা কেবল বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না; দেখতে হবে সেই সুবিধা রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে এবং সম্ভাব্য ক্ষতির দায় কে বহন করবে।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের অর্থ শুধু ভূখণ্ডের ওপর পতাকা ওড়ানো নয়। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষমতাও এর অংশ। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানেই সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু চুক্তির শর্তে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে, জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হলে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হলে তার পরিণতি গভীরভাবে যাচাই করা জরুরি। এই মূল্যায়ন আবেগ দিয়ে নয়, চুক্তির প্রকৃত শর্ত ও বাস্তব তথ্য দিয়ে করতে হবে।

সরকারকে তাই কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে হবে: চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে কি না; স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে কি না; শ্রমিকদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে; এবং চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের আয়, ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতায় কী পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে বিক্ষোভে পুলিশের আচরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা সরকারের অনুগ্রহ নয়, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।

জাতীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্তের দায় সরকার এড়াতে পারে না। চুক্তি স্বাক্ষর করলেই প্রশ্নের অবসান ঘটে না; বরং তখনই শুরু হয় তার শর্ত, যৌক্তিকতা ও পরিণতি যাচাইয়ের প্রয়োজন। জনগণের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ জড়িত থাকলে গোপনীয়তা কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে না।

বন্দর জনগণের সম্পদ, সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। চুক্তি কোনো পবিত্র দলিল নয় যে তার সমালোচনা করা যাবে না। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের কণ্ঠরোধের লাইসেন্স নয়। জাতীয় স্বার্থের নামে নেওয়া সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সেই পরীক্ষা হবে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন পর্যালোচনা, শ্রমিকের অধিকার, সংসদীয় জবাবদিহি এবং প্রতিবাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে—লাঠিপেটা বা নীরবতা চাপিয়ে দিয়ে নয়।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!