বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন

ফ্লাইওভারের ঝুলন্ত কাউসারের দেহ , এক নীরব রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি

যমুনা রহমান
বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি ফ্লাইওভারে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে আকবর শাহ থানা ছাত্রলীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহমেদের মরদেহ। ঘটনাটি শুধু একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু নয়; এটি এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী মানুষের মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া কিংবা রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এমন একটি ঘটনার পরও দেশের বড় অংশের গণমাধ্যম প্রায় নীরব থেকেছে।

কিছু সংবাদমাধ্যম সংক্ষিপ্ত দায়সারা সংবাদ প্রকাশ করেছে, আবার কেউ কেউ খুব দ্রুত ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। অথচ সাধারণ মানুষের মনেই প্রথম যে প্রশ্নটি এসেছে, সেটি হলো— এভাবে কি কেউ আত্মহত্যা করে? একটি ব্যস্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইওভারে একজন মানুষকে কীভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেল, সেখানে তিনি কীভাবে পৌঁছালেন, কারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে কী আছে— এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার প্রবণতা মানুষের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফ্লাইওভার কোনো নির্জন পাহাড়ি গুহা নয়। সেখানে যাতায়াতের পথ আছে, যানবাহন আছে, নজরদারি ক্যামেরা আছে। কাজেই ঘটনাটিকে রহস্যমুক্ত করা অসম্ভব নয়। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন উঠছে— আদৌ কি সত্য উদঘাটনের আন্তরিক চেষ্টা আছে? নাকি ঘটনাগুলোকে সময়ের ভিড়ে চাপা দেওয়াই এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে?

আরও হতাশাজনক হলো গণমাধ্যমের ভূমিকা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু সরকারি বক্তব্য প্রচার করা নয়, বরং জনস্বার্থে সত্য অনুসন্ধান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে অনেক গণমাধ্যমই সতর্ক নীরবতা বেছে নিচ্ছে। ফলে মানুষের মনে ধারণা তৈরি হচ্ছে— কিছু মৃত্যু সংবাদযোগ্য, কিছু মৃত্যু নয়; কিছু মানুষের মানবাধিকার আছে, কিছু মানুষের নেই। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি সংগঠনগুলোর ভূমিকাও তাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়ার ভিন্নতা সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায় না। যখন কোনো একটি ঘটনার ক্ষেত্রে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ দেখা যায়, কিন্তু অন্য ঘটনায় রহস্যজনক নীরবতা নেমে আসে, তখন মানবাধিকারের ভাষাও মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতা নতুন নয়। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, ধীরে ধীরে সমাজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে যেখানে ঝুলন্ত লাশ, রহস্যজনক মৃত্যু কিংবা বিচারহীনতা মানুষের অনুভূতিকে আর নাড়া দেয় না। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ একটি সমাজ তখনই গভীর সংকটে পড়ে, যখন অন্যায়ের দৃশ্য তাকে আর বিস্মিত করে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তীব্র বিরোধও থাকতে পারে। কিন্তু কোনো সভ্য রাষ্ট্রে বিরোধী মত, ভিন্ন পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানকে ভয় দেখিয়ে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, দমন-পীড়নের মাধ্যমে কখনো স্থায়ী স্থিতি প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বরং বিচারহীনতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে দেয়।

কাউসার আহমেদের মৃত্যুর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন— শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের জন্য নয়, বরং এই রাষ্ট্রে এখনো সত্য অনুসন্ধানের ন্যূনতম ইচ্ছা বেঁচে আছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যও। কারণ নীরবতা কখনো স্থিতি আনে না; নীরবতা কেবল অন্ধকারকে দীর্ঘস্থায়ী করে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!