[ ৫ আগস্ট ২০২৬-এ দিল্লির দ্য ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া-এর আয়োজনে ভার্চুয়ালভাবে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্লাবের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাকিব আল হাসান, সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীসহ আরও অনেকে।
এটি ছিল চলতি বছরে ক্লাবটির আয়োজনে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় অংশগ্রহণ। এর আগে জানুয়ারি মাসে একই ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে তাঁর একটি অডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছিল। প্রায় এক ঘণ্টার সেই বক্তব্যে তিনি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর সেটিই ছিল ভারতে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে তাঁর প্রথম প্রকাশ্য বার্তা। তখন বিষয়টি নিয়ে ঢাকা আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায় এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতাশা প্রকাশ করে। ছয় মাস পর একই ক্লাবের মঞ্চে শেখ হাসিনার নতুন ভার্চুয়াল বক্তব্য আবারও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ]
দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪ এখনও বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। সেটি কি একটি গণঅভ্যুত্থান ছিল, নাকি সুপরিকল্পিত ক্ষমতার রদবদল—যাকে কেউ কেউ কালার রেভল্যুশন বলে অভিহিত করেন? নাকি সেটি ছিল সামরিক ও বেসামরিক শক্তির সমন্বয়ে সংঘটিত এক ভিন্নধর্মী ক্ষমতার পরিবর্তন? এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর ইতিহাস একদিন দেবে। কিন্তু রাজনীতি ইতিহাসের বিচারের জন্য অপেক্ষা করে না।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ৫ আগস্ট ২০২৬-এ দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের মঞ্চে ভার্চুয়ালভাবে হাজির হন শেখ হাসিনা। ভারত সরকার দ্রুত জানিয়ে দেয়, এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অন্যদিকে ঢাকা তাঁর বক্তব্যকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। দুই রাজধানী তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে, সেগুলো এখনও অনুত্তরিত।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বাধীন সাংবাদিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপ্রধান, বিরোধী নেতা, নির্বাসিত রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিতর্কিত বহু ব্যক্তিকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার উপস্থিতি ব্যতিক্রমী নয়। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতায় এই আয়োজন যে কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি দেশে ফিরবেন। কিন্তু কী পরিচয়ে? আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, নাকি আবার ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে? তিনি বলেছেন, ক্ষমতার জন্য নয়, দেশকে “সঠিক পথে” ফিরিয়ে আনতেই তাঁর প্রত্যাবর্তন। কিন্তু গণতন্ত্রে “সঠিক পথ” নির্ধারণ করেন জনগণ—নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই রাজনৈতিক রূপরেখা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর বক্তব্যে আত্মসমালোচনার অভাব। তিনি ২০২৪ সালের ঘটনাকে কার্যত ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, বিরোধী রাজনীতির সংকোচন, ডিজিটাল দমননীতি কিংবা নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি। যেন রাষ্ট্রক্ষমতায় টানা দেড় দশকের সব দায় কেবল অন্যদের। এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী পরবর্তীকালে প্রকাশ্যে ছাত্রশিবির বা সমমনা ইসলামপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দাবি, শেখ হাসিনার সরকার ও প্রশাসনের ভেতরেও জামায়াতপন্থী বা ইসলামপন্থী ব্যক্তিরা প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তাঁর বক্তব্যে ছিল না। নীরবতা অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যেরও অংশ হয়ে ওঠে। ধর্মের প্রশ্নেও শেখ হাসিনার অবস্থান আগের মতো স্পষ্ট নয়। যিনি একসময় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রধান মুখ ছিলেন, তাঁর ভাষণেও ধর্মীয় আবেগের রাজনৈতিক ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশে কি এখন ধর্ম কেবল সব রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনী ভাষায় পরিণত হয়েছে?
তবে সমালোচনার আয়না শুধু শেখ হাসিনার দিকে তাক করে রাখলে চলবে না। বর্তমান সরকারের প্রতিক্রিয়াও একটি আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি নয়। একজন নির্বাসিত নেতার ভার্চুয়াল বক্তব্যকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের নয়, বরং অনিশ্চয়তার লক্ষণ। আরও একটি বাস্তবতা স্মরণযোগ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। বিচারিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু নীতির প্রশ্নে রাষ্ট্র যদি এক ধরনের আচরণ এক ব্যক্তির জন্য এবং ভিন্ন আচরণ আরেক ব্যক্তির জন্য গ্রহণ করে, তবে আইনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
ভারতের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। দিল্লির মাটিতে এমন একটি আয়োজন কূটনৈতিক বার্তা বহন করবেই। আবার এটাও সত্য, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব অনুষ্ঠানের অনুমোদন সরকার দেয় না। ভারত সরকার নিজেও জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ভিডিও বক্তব্যে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। ফলে বাস্তবতা সাদা-কালো নয়; বরং ধূসর।
কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট ভারত নয়। শেখ হাসিনাও নন। তারেক রহমানও নন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনীতি। আমরা এখনও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে পারিনি। আমরা এখনও একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় থাকি। কখনও শেখ মুজিব, কখনও জিয়াউর রহমান, কখনও শেখ হাসিনা, কখনও খালেদা জিয়া, কখনও তারেক রহমান। ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির সংস্কৃতি বদলায় না।
জুলাই ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। নতুন রাজনৈতিক সূচনার প্রত্যাশা তৈরি হলেও সেই প্রত্যাশার সঙ্গে নানা বিতর্কও জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবনসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কার্যকর অবস্থান না নেওয়ায় সরকার মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর ফলে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকগুলোর ওপর আক্রমণকারীরা কার্যত প্রশ্রয় পেয়েছে। এই ধারণা জুলাই আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর।
একইভাবে দেশের বিভিন্ন মাজারে হামলা, সুফি ঐতিহ্যের ওপর আক্রমণ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলোও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দৃঢ় ছিল না। ফলে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যে সামাজিকভাবে আরও দৃশ্যমান হয়েছে, সেই ধারণাও শক্তিশালী হয়েছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রকে প্রতীকীভাবেও স্পষ্টভাবে জানাতে হয় যে, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বহুত্ববাদের ওপর আক্রমণের কোনো বৈধতা নেই।
যদি জুলাই অভ্যুত্থান সত্যিই নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়ে থাকে, তবে সেই বাংলাদেশ অতীতের কর্তৃত্ববাদে ফিরতে পারে না। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার কিংবা ধর্মীয় বহুত্ববাদ থেকেও সরে যেতে পারে না। কারণ এই দুটি প্রশ্ন কেবল অতীতের নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত। দিল্লির সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়েছে। ঢাকার প্রতিবাদও একদিন ইতিহাসের ফুটনোট হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না দিল্লির কোনো মঞ্চ কিংবা ঢাকার কোনো বিবৃতি। ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের নাগরিকেরা—যদি তারা ব্যক্তি-উপাসনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, অবাধ নির্বাচন এবং সমান নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের নয়। প্রশ্নটি তারেক রহমানের উত্থানেরও নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর—বাংলাদেশ কি এমন একটি আধুনিক নাগরিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে ধর্ম ব্যক্তির বিশ্বাস, রাষ্ট্রের পরিচয় নয়; যেখানে মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের সম্পত্তি নয়, বরং জাতির অভিন্ন ঐতিহ্য; যেখানে ক্ষমতা ব্যক্তির হাতে নয়, প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ ভবিষ্যতের দিকে এগোবে, নাকি ব্যক্তি-উপাসনা, ইতিহাসের দ্বন্দ্ব এবং ধর্মীয় মেরুকরণের পুরোনো বৃত্তেই ঘুরপাক খেতে থাকবে।