শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার? মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি রংপুরের চার খুন: গ্রেপ্তারের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায় সার্জিও গোরের কাশ্মীর মন্তব্য: মার্কিন নীতির পরিবর্তন, নাকি কৌশলী বার্তা? গোলাপি বাস, হিজাব ও নারীর স্বাধীনতার চেকপোস্ট জাতিসংঘের রিপোর্ট: বাংলাদেশের উগ্রবাদ সংকট ১৫ আগস্ট: শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ড বিজ্ঞানের নামে দাবি, ধর্মের নামে ঢাল: গণমাধ্যমের দায়িত্ব কোথায়? সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে?
সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার?

সমসমাজ প্রতিবেদন।
Update : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নৃশংস। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ভয়াবহতার প্রতিক্রিয়ায় এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যা নিজেই আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।

রংপুর আইনজীবী সমিতি ঘোষণা করেছে, তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের পক্ষে তারা আইনজীবী হিসেবে লড়বেন না। সমিতির নেতারা বলেছেন, সিদ্ধান্তটি সাময়িক এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও তারা চান।

কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করার আগে তার পক্ষে আইনজীবী দাঁড়ানোর সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া কি ন্যায়বিচারের পথ? আদালতে একজন মানুষ আসামি হতে পারেন, কিন্তু আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনগত অর্থে অপরাধী নন। পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে, তদন্ত করতে পারে, তার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু পুলিশের বক্তব্য নিজেই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তদন্তের উদ্দেশ্যই হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। আদালতের দায়িত্ব হলো সেই প্রমাণ পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া।

রংপুরের ক্ষেত্রেও পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। আইনজীবী সমিতির নেতারাই বলেছেন, তদন্ত এখনো চলমান এবং এই মুহূর্তে তদন্ত সঠিক হচ্ছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। একই সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা আবার বলেছেন, প্রাথমিকভাবে দুজনের সম্পৃক্ততা বোঝা যাচ্ছে এবং তাঁরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অর্থাৎ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আসামিদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও পেশাগতভাবে এমন অবস্থান নেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত? একজন আসামির পক্ষে আইনজীবী দাঁড়ানো মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয়। বরং উল্টোটা সত্য। আইনজীবী আসামির অপরাধ প্রমাণ করেন না; তিনি নিশ্চিত করেন যে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে, তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করতে হবে। এই কারণেই সভ্য বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকে।

আইনজীবী না থাকলে বিচার সহজ হয়ে যায়—এমন ধারণা বিপজ্জনক। বরং এতে পুলিশের তদন্তই কম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন করেন—গ্রেপ্তারের ভিত্তি কী, জব্দ করা আলামত কীভাবে পাওয়া গেল, সাক্ষ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, জবানবন্দি স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছিল কি না, তদন্তে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি মামলার বিচারিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মামলার সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের পর যদি এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে পুলিশের বর্ণিত ব্যক্তিকেই অপরাধী ধরে নেওয়া হবে এবং তাঁর পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াবেন না, তাহলে সেটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তার বদলে নতুন ধরনের ভীতি সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া এবং পরে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা—যদি ঘটনাটি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে—তাহলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। তদন্তের প্রয়োজনে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক বিষয়; কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে কী আইনি ভিত্তিতে নেওয়া হলো, তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করা হলো এবং কেন মুচলেকা নেওয়া হলো—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিটি পদক্ষেপকে আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হয়।

এখানে বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের নয়। সংখ্যালঘু নাগরিকদের কাছে রাষ্ট্রের আচরণের একটি প্রতীকী গুরুত্ব আছে। কোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্তের নামে যদি নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, তাহলে মূল অপরাধের বিচার পাওয়ার বদলে আরেকটি অন্যায় তৈরি হবে।

রংপুরের আইনজীবীদের উচিত ছিল বরং অন্য একটি অবস্থান নেওয়া। তাঁরা বলতে পারতেন—আমরা প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই, কিন্তু একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামির ন্যায়সংগত বিচারের অধিকার রক্ষা করব। তাঁরা চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষেও আইনগত সহায়তা দিতে পারেন, আবার আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবেও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেন। দুটো পরস্পরবিরোধী নয়। কারণ ন্যায়বিচারের অর্থ শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়। ন্যায়বিচারের অর্থ হলো—অপরাধী যেন শাস্তি পায় এবং নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায়।

এই দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় শর্তটি বাদ দিলে প্রথমটিও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার থাকে না।

আজ পুলিশের বক্তব্য সত্য হতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সত্যিই অপরাধী হতে পারেন। আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটি আদালতের বিচারেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আগে থেকেই তাঁদের অপরাধী ধরে নিয়ে আইনজীবী না দেওয়ার সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা হলে আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

একটি হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা আমাদের আবেগকে নাড়া দেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আইন আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণ দিয়ে চলে। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণের চেষ্টা করবে, আসামিপক্ষ তা যাচাই ও চ্যালেঞ্জ করবে এবং শেষ পর্যন্ত আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। এটাই স্বাভাবিক বিচারপ্রক্রিয়া। গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাক—এ দাবি আরও জোরালো হওয়া উচিত। কিন্তু সেই দাবির সঙ্গে আরেকটি দাবি সমানভাবে উচ্চারিত হওয়া দরকার:

পুলিশের বক্তব্য নয়, আদালতের রায়ই ঠিক করবে কে অপরাধী।আর সেই রায় পর্যন্ত প্রত্যেক আসামির আইনগত অধিকার রক্ষা করাই রাষ্ট্র, আদালত এবং আইনজীবী সমাজের দায়িত্ব। অপরাধীর শাস্তি চাই—কিন্তু বিচারের পথ বন্ধ করে নয়।

 


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!