শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! বিজ্ঞানের নামে দাবি, ধর্মের নামে ঢাল: গণমাধ্যমের দায়িত্ব কোথায়? সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে? ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ? শেখ হাসিনার শাসনের অবসান: গণঅভ্যুত্থান নাকি সামরিক হস্তক্ষেপ? দিল্লির মঞ্চে হাসিনা, ঢাকার ক্রোধ জুলাই ২৪ অভ্যুত্থান : শেখ হাসিনার পতন ও কালার রেভল্যুশনের প্রশ্ন চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি — ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ তসলিমার নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির দুই প্রান্তে একই ভোটের সমীকরণ
শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪০ অপরাহ্ন

ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে?

সমসমাজ ডেস্ক।
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

[ সূত্র ও প্রসঙ্গ: ‘মার্কিন সেফ হাউজে সমন্বয়কদের মগজধোলাই হয়েছে’, কী বলতে চেয়েছেন ফরহাদ মজহার। বাংলা ট্রিবিউন, ০৮ আগস্ট ২০২৬। একই বক্তব্য নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ান তৈরি হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে বিস্তৃত হয়; ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়; আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এই বয়ানের মূল সত্য নিয়ে বিতর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। ছাত্রদের আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ছিল বাস্তব। কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধু রাস্তায় দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে শেষ হয় না। বিশেষ করে যখন একটি আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় এবং তার পরপরই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়, তখন জানতে হয়—আন্দোলনের ভেতরের শক্তিগুলো কীভাবে কাজ করেছে এবং বাইরে থাকা দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো কীভাবে পরিস্থিতিকে দেখেছে বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এখানেই ফরহাদ মজহারের সাম্প্রতিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। ]

জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ান তৈরি হয়েছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে বিস্তৃত হয়; ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ যুক্ত হয়; আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এই বয়ানের মূল সত্য নিয়ে বিতর্কের খুব বেশি অবকাশ নেই। ছাত্রদের আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ছিল বাস্তব। কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধু রাস্তায় দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে শেষ হয় না। বিশেষ করে যখন একটি আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায় এবং তার পরপরই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়, তখন জানতে হয়—আন্দোলনের ভেতরের শক্তিগুলো কীভাবে কাজ করেছে এবং বাইরে থাকা দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো কীভাবে পরিস্থিতিকে দেখেছে বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এখানেই ফরহাদ মজহারের সাম্প্রতিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফরহাদ মজহার জুলাইয়ের বাইরের কোনো পর্যবেক্ষক নন। আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং প্রকাশ্যে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে তিনি যখন দাবি করেন, আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক বিদেশি দূতাবাস-সংশ্লিষ্ট নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন এবং সেখানে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছিলেন, তখন তাঁর বক্তব্যকে নিছক আরেকটি রাজনৈতিক মন্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার তাঁর দাবি সত্য—এমন সিদ্ধান্তেও এখনই পৌঁছানো যায় না। তাঁর বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি এমন একটি অন্ধকার জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন, যার উত্তর প্রমাণ দিয়ে দিতে হবে।

সেফ হাউজ থেকে রেজিম পরিবর্তন?

ফরহাদ মজহারের সবচেয়ে আলোচিত দাবি বিদেশি ‘সেফ হাউজ’ নিয়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বিদেশি দূতাবাস আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল এবং সেখানে তাঁদের ওপর শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তোলার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি। বিপদের সময় কোনো আন্দোলনকারীকে আশ্রয় দেওয়া মানবিক বা কূটনৈতিক সহায়তা হতে পারে। কিন্তু সেই আশ্রয়ের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক নির্দেশনা, চাপ, দর-কষাকষি কিংবা আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণের সম্পর্ক থাকে, তাহলে বিষয়টি আর মানবিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই প্রশ্ন শুধু—সেফ হাউজ ছিল কি না। প্রশ্ন হলো, সেখানে কারা ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কী আলোচনা হয়েছিল এবং কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সেখানে প্রভাবিত হয়েছিল কি না। এসবের প্রমাণ ছাড়া ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলা যেমন দায়িত্বজ্ঞানহীন, তেমনি বিদেশি কোনো ভূমিকা ছিল না—এমন নিশ্চয়তাও অকালপক্ব।

কালার রেভল্যুশন?

এই জায়গায় ‘কালার রেভল্যুশন’-এর ধারণাটি সামনে আসে। তবে জুলাইকে সরাসরি কালার রেভল্যুশন বলে ঘোষণা করার মতো প্রমাণ এখনো নেই। কোনো আন্দোলনে বিদেশি দূতাবাসের যোগাযোগ থাকলেই তা কালার রেভল্যুশন হয় না। আবার আন্দোলনের দেশীয় ভিত্তি শক্তিশালী ছিল বলেই বিদেশি শক্তির আগ্রহ বা ভূমিকা ছিল না—এমন সিদ্ধান্তও সরলীকরণ।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত: জুলাইয়ের দেশীয় গণআন্দোলন যখন সরকার পতনের পর্যায়ে পৌঁছাল, তখন বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কী করছিল? বিদেশি প্রভাব আর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ এক নয়। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি কোনো রাষ্ট্র আন্দোলনের দাবি, নেতৃত্ব, কৌশল কিংবা ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জুলাইয়ের ক্ষেত্রে এই সীমারেখাটিই এখনো অন্ধকারে।

মজহারের বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ফরহাদ মজহারের গুরুত্ব শুধু তাঁর পরিচয়ে নয়; তাঁর অবস্থানেও। তিনি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিসরের একজন অংশগ্রহণকারী। তাই তাঁর বক্তব্যকে খণ্ডন করতে হলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আক্রমণ না করে তথ্য দিয়ে জবাব দিতে হবে। তাঁকে সম্ভাব্য whistleblower হিসেবেও দেখা যেতে পারে—চূড়ান্ত সত্যের বাহক হিসেবে নয়, বরং এমন একজন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি হিসেবে, যিনি প্রচলিত বয়ানের বাইরে একটি গুরুতর দাবি সামনে এনেছেন। এই দাবির বড় সমস্যা হলো, এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রীয় গোপন নথি বহু দশক অপ্রকাশিত থাকতে পারে। ৫০ বা ৬০ বছর পর কোনো বিদেশি সরকারের ডিক্লাসিফায়েড নথি হয়তো জানাবে—কোন রাষ্ট্র কী জানত, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কীভাবে দেখেছিল। কিন্তু ততদিনে একটি প্রতিষ্ঠিত বয়ান সমাজে গভীরভাবে গেঁথে যেতে পারে। ইতিহাসের প্রথম খসড়া তখন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যায়। পরে সেই বয়ান বদলানো কঠিন। এই কারণেই মজহারের বক্তব্য এখন গুরুত্বপূর্ণ—বিশ্বাস করার জন্য নয়, অনুসন্ধান শুরু করার জন্য।

মজহারের নিজের ইতিহাসও প্রশ্নের বাইরে নয়

অবশ্য ফরহাদ মজহারের নিজের রাজনৈতিক ইতিহাসও আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। ২০১৭ সালে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। তাঁর পরিবার অপহরণের অভিযোগ করেছিল; পরে তাঁকে যশোরে পাওয়া যায়। ঘটনাটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, তাঁর নিজের বয়ান এবং পরবর্তী তদন্ত—সব মিলিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিনি সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি—এমন কথাও রয়েছে। এই অস্বীকৃতি তাঁর ২০১৭ সালের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে না; তবে তাঁর বর্তমান বক্তব্য মূল্যায়নে এটি একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। একইভাবে তাঁর স্ত্রী ফরিদা আখতার ইউনূস-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন—এই রাজনৈতিক সম্পর্কও আলোচনায় আসতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পর্কই কোনো বক্তব্যকে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে না। প্রমাণের বিকল্প রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে না।

জুলাইয়ের ইতিহাস কি বদলে যাচ্ছে?

এখনই বলা যাবে না যে জুলাইয়ের ইতিহাস বদলে গেছে। কিন্তু মজহারের বক্তব্য সেই ইতিহাসের সামনে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়েছে। জুলাইকে হয় সম্পূর্ণ বিদেশি পরিকল্পনা, নয়তো সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিমুক্ত একটি স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা—এই দুই চরম ব্যাখ্যার কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ শেখ হাসিনার পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল জনগণের অনাস্থা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। আমেরিকা থেকে লোক এসে বা মার্কিন দূতাবাস লক্ষ মানুষকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল—বিষয়টি এমন নয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক অধিকার সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বহুদিন ধরেই জমা হচ্ছিল। জুলাই সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। বিদেশি শক্তি কোনো ভূমিকা রেখে থাকলেও তা এই দেশীয় বাস্তবতার বিকল্প নয়। বরং জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে অন্তত তিনটি স্তর দেখতে হবে: জনগণের বাস্তব ক্ষোভ ও প্রতিরোধ; আন্দোলনের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর; এবং রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর দেশি-বিদেশি শক্তির তৎপরতা। প্রথম স্তরটি ছিল আন্দোলনের ভিত্তি। দ্বিতীয় স্তর আন্দোলনকে ক্ষমতার প্রশ্নে নিয়ে যায়। তৃতীয় স্তরটি এখনো সবচেয়ে কম আলোচিত।

সেনাবাহিনী, এনজিও এবং আন্দোলনের ভেতরের তথ্য

এখানে আরও কিছু তথ্য ক্রমশ সামনে আসছে, যেগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। জুলাইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তি ও আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকেই সেনাবাহিনীর ভূমিকা, এনজিওগুলোর তৎপরতা, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও সমন্বয়, এমনকি ব্যবহৃত গুলির ধরন—যেমন ৭.৬২ মিমি গুলি—সম্পর্কে নানা তথ্য উঠে আসছে। এসব তথ্যের সবকিছু সত্য ধরে নেওয়ারও কারণ নেই; আবার কেবল রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের কারণে তা বাতিল করাও ঠিক নয়।

এসব তথ্যের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এগুলো বাইরে থেকে তৈরি কোনো কল্পিত গল্প নয়; ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসছে। ফলে প্রত্যেকটি দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারা কী দেখেছেন, কখন দেখেছেন, কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কোন অস্ত্র বা গুলি ব্যবহৃত হয়েছিল—এসবের সাক্ষ্য, নথি, ভিডিও, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ একত্র করলে জুলাইয়ের প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ আরও পরিষ্কার হতে পারে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি গণআন্দোলন কখন রাষ্ট্রক্ষমতার সংকটে পরিণত হয়, সেখানে সামরিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান প্রায়ই निर्णায়ক হয়ে ওঠে। একইভাবে এনজিও ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়েও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান দরকার। তবে এসব ভূমিকার উল্লেখ করা মানেই কাউকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—কে কী করেছে এবং তার বাস্তব প্রভাব কী ছিল।

ইতিহাসের ময়নাতদন্ত এখনই দরকার

বিদেশি রাষ্ট্র যদি সত্যিই জুলাইয়ের রাজনৈতিক ‘চাবিকাঠি’ নেড়ে থাকে, তার পূর্ণ প্রমাণ হয়তো আজ পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতের ডিক্লাসিফায়েড নথি অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বসে থাকলে ততদিনে একটি একমাত্রিক বয়ান স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। তাই এখনই জানতে হবে—কারা কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কোন দূতাবাসের সঙ্গে কার যোগাযোগ ছিল, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে কারা দেখা করেছিলেন, কী আলোচনা হয়েছিল এবং সরকার পতনের সম্ভাবনা নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব মূল্যায়ন কী ছিল। একই সঙ্গে জানতে হবে—আন্দোলনের ভেতরে কারা কী ভূমিকা পালন করেছেন, সেনাবাহিনীর অবস্থান কী ছিল, এনজিও ও অন্যান্য সংগঠন কীভাবে যুক্ত ছিল এবং মাঠের ঘটনাগুলো কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের দিকে এগিয়েছে।

ফরহাদ মজহারের দায়িত্বও কম নয়। তিনি যদি এমন তথ্য জানেন, তাহলে নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, সময়-তারিখ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য যতটা সম্ভব সামনে আনতে হবে। আর যারা তাঁর বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বা ভিত্তিহীন বলছেন, তাঁদেরও রাজনৈতিক আক্রমণের বদলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তা খণ্ডন করতে হবে। জুলাই কারও রাজনৈতিক সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস। ফরহাদ মজহারের বক্তব্য এখনো ইতিহাসের চূড়ান্ত সত্য নয়। কিন্তু এটি উপেক্ষা করার মতো তুচ্ছ বক্তব্যও নয়। হাসিনা পতনে মার্কিন দূতাবাস বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি যে ভূমিকা রেখেই থাকুক, সেটি জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অনাস্থা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে না। বরং প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে হলে জনগণের অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রীয় দমন, সেনাবাহিনীর অবস্থান, এনজিও ও অন্যান্য দেশীয় শক্তির ভূমিকা এবং বিদেশি কূটনৈতিক তৎপরতা—সবকিছুকে একই বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।

মজহারের বক্তব্য সত্য হলে জুলাইয়ের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে; ভুল হলে একটি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণসহ খণ্ডিত হবে। দুই ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানের মূল্য আছে। কারণ জুলাইয়ের ইতিহাস হয়তো এখনো লেখা শেষ হয়নি।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!