শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! বিজ্ঞানের নামে দাবি, ধর্মের নামে ঢাল: গণমাধ্যমের দায়িত্ব কোথায়? সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে? ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ? শেখ হাসিনার শাসনের অবসান: গণঅভ্যুত্থান নাকি সামরিক হস্তক্ষেপ? দিল্লির মঞ্চে হাসিনা, ঢাকার ক্রোধ জুলাই ২৪ অভ্যুত্থান : শেখ হাসিনার পতন ও কালার রেভল্যুশনের প্রশ্ন চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি — ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ তসলিমার নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির দুই প্রান্তে একই ভোটের সমীকরণ
শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা

সমসমাজ ডেস্ক
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে আট শ্রমিকের মৃত্যু বাংলাদেশের শিল্পব্যবস্থার এক পুরোনো ও গভীর সংকটকে আবার সামনে এনেছে। যে শিল্পকে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা ও শিল্পায়নের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই শিল্পেই শ্রমিকের জীবন এত সস্তা কেন—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এলএনজি বহনকারী একটি পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল দুর্বল। একটি জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করা, বিপজ্জনক গ্যাস শনাক্ত করা এবং অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা করা মৌলিক নিরাপত্তা শর্ত। এসব না করেই শ্রমিককে জাহাজের ভেতরে পাঠানো নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করা।

সংখ্যাগুলোই আসল চিত্র

সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যুর ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনায় অন্তত ১২৯ শ্রমিক নিহত এবং ২০৫ জন আহত হয়েছেন। ২০১৯ সালেই নিহত হন ২৩ জন। আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাবে ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই শিল্পে দুর্ঘটনায় ২৫৭ শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা চারজনে নেমে এলেও ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ শ্রমিক আহত হয়েছেন। অর্থাৎ মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে, কিন্তু শিল্পটি নিরাপদ হয়ে গেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার বোঝা এখনও শ্রমিকের শরীর ও পরিবারের ওপরই পড়ে।

জাহাজভাঙা শিল্প কেন বাংলাদেশে?

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পকে সাধারণত কর্মসংস্থানের যুক্তিতে সমর্থন করা হয়। এতে বহু মানুষের জীবিকা জড়িত—এ কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই কর্মসংস্থানের মূল্য কত? জাহাজভাঙা শ্রমঘন, দূষণকারী ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প। উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বীমা ও ক্ষতিপূরণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে এই শিল্পের ব্যয়ও বেশি। বিশ্ব অর্থনীতির শ্রমবিভাজনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ধীরে ধীরে এমন দেশগুলোর দিকে সরে এসেছে, যেখানে শ্রম সস্তা এবং নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক দুর্বল। বাংলাদেশ সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। ফলে জাহাজভাঙা শিল্পের সাফল্যকে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো কেন সবচেয়ে কম সুরক্ষিত শ্রমিকদের ঘাড়ে এসে পড়ে?

‘সস্তা শ্রম’ আসলে কত সস্তা?

শ্রমিকের মৃত্যুর পর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়; কিন্তু উপার্জনক্ষম মানুষটিকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। একজন শ্রমিক মারা গেলে শুধু একটি জীবন শেষ হয় না—একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে। অথচ শিল্পের হিসাব করা হয় উৎপাদন, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা ও কর্মসংস্থানের সংখ্যায়। শ্রমিকের মৃত্যু সেখানে প্রায়ই একটি পরিসংখ্যান মাত্র। এটাই বাংলাদেশের শ্রমনীতির বড় বৈপরীত্য: শ্রমিক উৎপাদনের কেন্দ্রে, কিন্তু শ্রমিকের নিরাপত্তা উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রে নয়।

পোশাকশিল্প: রানা প্লাজা কি আমাদের কিছু শেখায়নি?

একই সংকট দেখা গেছে পোশাকশিল্পে। ২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের পরও ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে ১,১০০-এর বেশি পোশাকশ্রমিক নিহত হন। রানা প্লাজা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না; ভবনের নিরাপত্তা, মালিকের মুনাফা, উৎপাদনের চাপ, দুর্বল পরিদর্শন এবং শ্রমিকের নিরাপত্তাকে গৌণ করে রাখার সম্মিলিত ফল ছিল এই বিপর্যয়। রানা প্লাজার পর পোশাকশিল্পের বড় অংশে ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ছোট কারখানা, সাব-কন্ট্রাক্টিং ও অনানুষ্ঠানিক উৎপাদনব্যবস্থায় ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ঢাকার একটি পোশাক কারখানা ও পাশের রাসায়নিক গুদামে আগুনে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও দেখিয়েছে যে শিল্প-নিরাপত্তার সংকট শেষ হয়নি। রানা প্লাজা আমাদের শিখিয়েছে ভবন নিরাপদ রাখতে হয়। সীতাকুণ্ড মনে করিয়ে দিচ্ছে, শ্রমিক নিরাপত্তা শুধু ভবনের দেয়াল দিয়ে মাপা যায় না। গ্যাস, আগুন, বিস্ফোরণ, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, বিদ্যুৎ ও উচ্চতা—প্রতিটি কর্মক্ষেত্রের নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে।

দায় কার?

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায়—তদন্ত কমিটি, মালিকের দুঃখপ্রকাশ, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, কয়েক দিনের সংবাদ; তারপর নীরবতা। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে যায়। কাজ শুরুর আগে জাহাজটি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি? গ্যাসমুক্ত করার সনদ কোথায়? শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ হয়েছিল কি? নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি? সর্বশেষ পরিদর্শন কবে হয়েছিল? বিধি ভাঙলে মালিকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শ্রমিকের ‘অসতর্কতা’কে দায়ী করা মূল সমস্যাকে আড়াল করে। একজন শ্রমিক ভুল করতে পারেন; কিন্তু নিরাপদ শিল্পব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সেই ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয় তা নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রের দুর্বলতা, মালিকের মুনাফা

বাংলাদেশে শ্রমিক নিরাপত্তার সমস্যা মূলত আইন না থাকার নয়; আইন প্রয়োগের দুর্বলতার সমস্যা। কারখানা পরিদর্শন নিয়মিত না হলে, নিরাপত্তা সনদ কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে এবং বিধি ভাঙার পরও উৎপাদন বন্ধ না হলে আইন শ্রমিককে রক্ষা করতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত করা নয়; দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে বিপজ্জনক উৎপাদন বন্ধ করা। মালিকের দায়িত্বও শুধু ক্ষতিপূরণ দেওয়া নয়। শ্রমিকের নিরাপত্তাকে উৎপাদন ব্যয়ের অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।

উন্নয়ন কার জন্য?

বাংলাদেশের শিল্পায়নের সাফল্য মাপা হয় কারখানার সংখ্যা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে। কিন্তু আরেকটি হিসাবও জরুরি—কত শ্রমিক মারা গেছে, কতজন স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়েছে, কত পরিবার উপার্জনক্ষম মানুষ হারিয়েছে? এই হিসাব ছাড়া উন্নয়নের পরিসংখ্যান অসম্পূর্ণ।

কর্মসংস্থান প্রয়োজন, শিল্পও প্রয়োজন। কিন্তু যে কর্মসংস্থানে শ্রমিকের জীবন নিরাপদ নয়, তাকে উন্নয়নের সাফল্য বলা যায় না। জাহাজভাঙা শিল্প বা পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কোনো শিল্পই শ্রমিকের জীবনের ঊর্ধ্বে নয়। শ্রমিকের জীবনকে উৎপাদন ব্যয়ের একটি অদৃশ্য অংশ বানিয়ে যে শিল্প দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি আধুনিক শিল্পায়ন নয়; সেটি সস্তা শ্রমের ওপর নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিসঞ্চয়। সীতাকুণ্ডের আট শ্রমিকের মৃত্যু তাই আরেকটি দুর্ঘটনা হিসেবে ভুলে যাওয়ার ঘটনা নয়। বাংলাদেশে শিল্প আছে, উৎপাদন আছে, রপ্তানি আছে, মুনাফা আছে—কিন্তু শ্রমিকের জীবনের সমান মূল্য নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা এখনও দুর্বল। শিল্পের মুনাফা যদি শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়, তবে সেই উন্নয়নের নৈতিক বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!