শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতন নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের গভীর সংকটকে সামনে এনেছে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার এবং ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনা দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অবকাঠামোর বড় উন্নয়ন ঘটেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সূচকে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ। দুর্নীতির বিস্তার। বিরোধী মত দমন এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নও বেড়েছে। অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি ঘুষ ও দুর্নীতির বিস্তার ছিল এই সময়ের আরেকটি বড় বাস্তবতা। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবি অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে নিয়মিত খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই শেখ হাসিনা সরকারের শেষ পর্যায়ের মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। একদিকে ছিল উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার দাবি। অন্যদিকে গভীর হচ্ছিল রাজনৈতিক বৈধতার সংকট। একটি রাষ্ট্র শুধু বড় প্রকল্প নির্মাণ করে টিকে থাকতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জনগণের আস্থার ওপর। যখন নির্বাচন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বদলে ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যবস্থায় পরিণত হয় এবং বিরোধী দলকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় তখন সরকারের প্রশাসনিক শক্তি থাকলেও তার রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেটিই সবকিছু নয়। জনগণ রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের কতটা অংশীদার মনে করে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন যদি মানুষের মত প্রকাশের প্রধান পথ হিসেবে আস্থা হারায় তাহলে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য দিয়ে সেই আস্থার ঘাটতি পূরণ করা যায় না। রাষ্ট্র বাইরে থেকে শক্তিশালী দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। বাংলাদেশে এই বৈধতার সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। ২০১৪। ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল প্রশ্ন তুলেছে। বিতর্ক শুধু ভোটের দিন কী ঘটেছে তা নিয়ে ছিল না। বড় প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটা অংশগ্রহণমূলক এবং জনগণের আস্থা কতটা অবশিষ্ট রয়েছে। এই জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন প্রথমে ছিল একটি নির্দিষ্ট নীতিগত দাবি। কিন্তু দ্রুত তা বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। রাজনৈতিক হতাশা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ এতে যুক্ত হয়ে যায়।
কোনো বড় রাজনৈতিক বিস্ফোরণ হঠাৎ ঘটে না। তার পেছনে জমতে থাকে মানুষের অভিজ্ঞতা। ক্ষোভ ও হতাশা। তাই জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরক প্রকাশ। সরকারের কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। আন্দোলন যখন ব্যাপক জনসমর্থন পেতে শুরু করে তখন বিষয়টি আর শুধু আইনশৃঙ্খলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্রের সামনে সরাসরি এসে দাঁড়ায় রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাপ্তি ঘটেনি। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শেখ হাসিনার পতন কি শুধু একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল? নাকি এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে কোনো পুনর্বিন্যাসও যুক্ত ছিল? আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কী ছিল? সেনাবাহিনীর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকার দিকে তাকাতে হয়।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫: রাষ্ট্রের ওপর সামরিক আঘাত
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। একদল সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি কোনো স্বাভাবিক সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের ওপর সামরিক শক্তির সরাসরি আঘাত। মোশতাক বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হলেও তাঁর ক্ষমতার পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থন। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৫ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সব সময় সামরিক পোশাক পরা সরকার প্রয়োজন হয় না। একজন বেসামরিক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মুখ হিসেবে সামনে রেখেও সামরিক শক্তি রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রকে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ বেসামরিক কাঠামো বাইরে থেকে অক্ষুণ্ণ থাকলেও ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে।
জিয়াউর রহমান: বেসামরিক কাঠামোর ভেতর সামরিক ক্ষমতার উত্থান
১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ পর্যায়ে। আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই সঙ্গে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি ছিলেন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই সামরিক নেতৃত্বের হাতে চলে যায়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য আরও পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল কেন্দ্র তাঁর হাতে আরও দৃঢ়ভাবে চলে আসে। ১৯৭৭ সালে আবু সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায় যে সামরিক শক্তি সব সময় সরাসরি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয় না। বেসামরিক রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন। সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামোও বহাল থাকতে পারে। কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য সরে যেতে পারে সামরিক নেতৃত্বের দিকে।
১/১১: গণতন্ত্রের সংকটে সামরিক প্রভাব
২০০৭ সালের ১/১১ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নির্বাচন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। আইনগতভাবে এটি ছিল একটি বেসামরিক সরকার। কিন্তু বাস্তবে সেনাবাহিনীর প্রভাব ছিল অত্যন্ত দৃশ্যমান। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে সামরিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে ১/১১-এর ব্যবস্থা ধীরে ধীরে একটি সেনাসমর্থিত শাসনের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। ১/১১ দেখিয়ে দেয় যে সামরিক শক্তি সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না করেও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সামরিক বাহিনী নিজে সরকার গঠন না করেও যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সীমা নির্ধারণ করতে পারে তাহলে রাষ্ট্রের বেসামরিক কাঠামো থাকলেও ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক হস্তক্ষেপকে শুধু প্রকাশ্য সামরিক অভ্যুত্থান দিয়ে সংজ্ঞায়িত করলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। সামরিক প্রভাব কখনো সরাসরি ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে আসে। কখনো আসে বেসামরিক কাঠামোর আড়ালে। আবার কখনো আসে গভীর রাজনৈতিক সংকটে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের মাধ্যমে। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কারণেই ২০২৪ সালের ঘটনাকে বাংলাদেশের অতীতের সামরিক হস্তক্ষেপগুলোর সঙ্গে তুলনা করে দেখা প্রয়োজন।
২০২৪: নতুন ধরনের ক্ষমতার পরিবর্তন?
২০২৪ সালের ঘটনাকে পুরোনো ধাঁচের সামরিক অভ্যুত্থান বলা যাবে না। কোনো সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামরিক আইনও জারি হয়নি। এই অর্থে এটি ১৯৮২ সালের মতো সরাসরি সামরিক ক্ষমতা দখল ছিল না। কিন্তু এটিকে শুধুমাত্র একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন হিসেবেও দেখলে রাষ্ট্রের বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্কগুলো পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ৫ আগস্টের আগে ও পরে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে।
প্রথম আলোতে সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছিল—“আপনার হাতে আর সময় নেই”। এই তথ্য সঠিক হলে বিষয়টি নিছক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে একটি নির্বাচিত সরকারকে সেনাবাহিনী কি ক্ষমতা ছাড়ার সময়সীমা সম্পর্কে সরাসরি বার্তা দিয়েছিল? এখানেই বেসামরিক সরকারের ওপর সামরিক চাপের প্রশ্ন সামনে আসে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব আলাদা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করা হলে সেটি আর শুধু নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার বিষয় থাকে না। তখন তা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ৫ আগস্টের ক্ষমতা পরিবর্তনের ঘোষণা। ওই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেন এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা জানান। ফলে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠতে পারে—একটি গণআন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতি ঘোষণা করার ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান কেন রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠলেন? একই সময়ে রাজপথে ছিল বিপুল জনসমাবেশ এবং শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ব্যাপক গণসমর্থন লাভ করেছিল। জনগণের সেই আন্দোলন ছাড়া ক্ষমতার এই পরিবর্তন সম্ভব হতো কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে ২০২৪ সালের ঘটনাকে শুধু সেনাবাহিনীর ভূমিকা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেমন অসম্পূর্ণ হবে তেমনি শুধু গণআন্দোলনের ফল হিসেবেও দেখলে পুরো ঘটনাটি ধরা যাবে না।
৫ আগস্টের আগে ক্যান্টনমেন্টের ভূমিকা
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ৫ আগস্টের আগে সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগাযোগের কিছু বক্তব্যের কারণে। প্রথম আলোর ৭ আগস্টের এক সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের বক্তব্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী সংকটের আগে সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। সেনাপ্রধান তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি আর কোনো রক্তপাত চান না। তিনি নিজে ক্ষমতা নিতে চান না। এবং তিনি চলমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান চান। ফজলে এলাহী আকবরের বক্তব্য অনুযায়ী সেনাপ্রধান দেশের প্রধান রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। প্রয়োজনে রাজনৈতিক নেতারা যেখানে বসতে চান সেখানেই গিয়ে কথা বলার প্রস্তুতির কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। পরে রাজনৈতিক নেতাদের সেনা সদরে আলোচনার জন্য নেওয়ার উদ্যোগের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
তিনি আরও জানান যে রাওয়া ক্লাবে যাওয়ার সময় নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজের মোবাইল ফোন গাড়িতে রেখে গিয়েছিলেন। সেখানে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমাবেশ ও মিছিল চলছিল এবং তিনিও সরকার পতনের দাবিতে সেই মিছিলে যোগ দেন। এই বক্তব্যগুলো থেকে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়। রাজপথের আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল তখন সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব কি শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল নাকি রাজনৈতিক সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বাড়ে বিএনপির সাবেক নেতা রাশেদ খানের একটি বক্তব্যে। ১৭ জুলাই ২০২৬-এ যুগান্তরে প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেন যে ক্যান্টনমেন্টের “স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স” পাওয়ার পর নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর আরও দাবি ছিল যে কার্যত ১ আগস্টেই শেখ হাসিনার পতনের সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সংকেত শেখ হাসিনাসহ অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁর ভাষায় এর পর থেকেই অনেকে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি আরও বলেন গণঅভ্যুত্থানে ক্যান্টনমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এটিও একটি রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। একে এককভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কিন্তু আগের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানের মধ্যে কি কোনো সমন্বয় তৈরি হয়েছিল?
গণঅভ্যুত্থান নাকি সামরিক প্রভাবাধীন ক্ষমতা পরিবর্তন?
২০২৪ সালের ঘটনাকে বোঝার জন্য একটি পার্থক্য জরুরি। **গণআন্দোলন ছিল বাস্তব। কিন্তু সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফল কে এবং কীভাবে নির্ধারণ করেছে সেটি আলাদা প্রশ্ন। রাজপথে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনঅসন্তোষের প্রমাণ। ছাত্র আন্দোলন দ্রুত জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। সরকারের দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। ফলে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পেছনে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু যদি প্রমাণিত হয় যে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। রাজনৈতিক সমাধানের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছে এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় ও পদ্ধতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে তাহলে ২০২৪ সালের ঘটনাকে শুধু একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট হবে না। এখানেই ১/১১-এর সঙ্গে তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী সরাসরি সরকার গঠন করেনি। কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে একটি বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে সামরিক প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ২০২৪ সালেও যদি দেখা যায় যে গণআন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত ক্ষমতা পরিবর্তনের সীমা ও গতি নির্ধারণ করেছে তাহলে এটি ১/১১-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য বহন করবে। পার্থক্যও রয়েছে। ২০২৪ সালে ১/১১-এর মতো দীর্ঘস্থায়ী জরুরি শাসন বা সরাসরি সেনাসমর্থিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপকে শুধু সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর সামরিক প্রভাবের আধুনিক রূপগুলো অদৃশ্য থেকে যায়। এই অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে **গণঅভ্যুত্থানের ভেতরে সামরিক প্রভাবযুক্ত একটি ক্ষমতা পরিবর্তন** হিসেবে দেখা যেতে পারে। আরও কঠোর বিশ্লেষণে এটিকে **১/১১-ধাঁচের একটি পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ** বলার যুক্তিও তৈরি হয়। তবে এই সিদ্ধান্তকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ৫ আগস্টের আগে সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
ইতিহাসের বৃহত্তর প্রশ্ন
এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। একটি গণঅভ্যুত্থান যদি শেষ পর্যন্ত এমন একটি ক্ষমতা কাঠামোর হাতে গিয়ে দাঁড়ায় যার রাজনৈতিক জবাবদিহি জনগণের কাছে সরাসরি নেই তাহলে সেই অভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালের সামরিক হস্তক্ষেপ ছিল প্রকাশ্য। ২০০৭ সালের ১/১১ ছিল অপেক্ষাকৃত পরোক্ষ। ২০২৪ সালের ঘটনাকে যদি একই ধারাবাহিকতার পরবর্তী রূপ হিসেবে দেখা হয় তাহলে এর বৈশিষ্ট্য আরও ভিন্ন। এখানে প্রথমে রাজপথে একটি ব্যাপক গণআন্দোলন তৈরি হয়েছে। এরপর রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান পরিবর্তনের মুহূর্তকে প্রভাবিত করেছে। ফলে গণআন্দোলন ও সামরিক প্রভাব একই রাজনৈতিক পরিবর্তনের দুটি স্তরে পরিণত হতে পারে।
এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ২০২৪ সালের ঘটনাকে শুধু শেখ হাসিনার পতন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হবে—**জনগণ কি একটি সরকারকে সরিয়েছে নাকি জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পুরোনো ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানো হয়েছে?** এখানেই ২০২৪ সালের ঘটনাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল জনগণের রাজনৈতিক অধিকার। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির ওপর। সেই ইতিহাসের বিপরীতে যদি কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে একটি অনির্বাচিত সামরিক প্রতিষ্ঠান তাহলে তার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি মৌলিক টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এই কারণে ২০২৪ সালের ঘটনাকে শুধু একটি গণঅভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। **এটি ছিল একটি ব্যাপক গণআন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে একে একই সঙ্গে সামরিক প্রভাবাধীন ক্ষমতা পরিবর্তন হিসেবেও বিচার করতে হবে।** আর যদি সেই সামরিক প্রভাব রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়ে থাকে তাহলে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে ১/১১-এর একটি নতুন সংস্করণ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখার প্রশ্নও সামনে আসে।
সুতরাং ৫ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু **শেখ হাসিনা কেন পতিত হলেন** তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—**তাঁকে সরানোর পর রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে গেল? সেই ক্ষমতা কি জনগণের হাতে ফিরল নাকি রাষ্ট্রের পুরোনো শক্তি কেন্দ্র গুলোর মধ্যেই নতুনভাবে বণ্টিত হলো?** এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে কী নামে পরিচিত হবে—**গণঅভ্যুত্থান হিসেবে। সামরিক প্রভাবাধীন ক্ষমতা পরিবর্তন হিসেবে। নাকি এই দুইয়ের জটিল সমন্বয় হিসেবে।**
উপসংহার
শেখ হাসিনার পতনকে শুধু একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য হিসেবে দেখলে ২০২৪ সালের ক্ষমতা পরিবর্তনের পূর্ণ চরিত্র ধরা পড়ে না। রাজপথের ব্যাপক গণআন্দোলন ছিল এই পরিবর্তনের প্রধান সামাজিক শক্তি। কিন্তু সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সামরিক প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান ভূমিকা দেখায় যে এর ভেতরে একটি নতুন ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপও কাজ করেছে। এটি ১৯৭৫ বা ১৯৮২ সালের মতো প্রকাশ্য সামরিক অভ্যুত্থান নয়। বরং ১/১১-এর অভিজ্ঞতার আরও পরোক্ষ ও আধুনিক রূপ—যেখানে সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখল না করেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সীমা ও গতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। সেই অর্থে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে গণআন্দোলনের ওপর ভর করে সংঘটিত নয়া ধারার সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা যায়। এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো শেখ হাসিনার পতন শুধু একটি সরকারের অবসান ঘটায়নি। এটি প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতে গেছে নাকি সামরিক ও অন্যান্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে নতুনভাবে পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে।