শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! “অপ্রতিমের হাতে আইফোন, অপরাধীর হাতে আইন কোথায়?” একবেলা ভাতের জন্য খুন: অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে  সমাজ ! হত্যার পর বিচার কোথায়: শিশু থেকে সংখ্যালঘু—আইনের শাসনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: এখনই সময় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর মেধা না বিশেষ সুবিধা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে? রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার? মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি রংপুরের চার খুন: গ্রেপ্তারের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায় সার্জিও গোরের কাশ্মীর মন্তব্য: মার্কিন নীতির পরিবর্তন, নাকি কৌশলী বার্তা? গোলাপি বাস, হিজাব ও নারীর স্বাধীনতার চেকপোস্ট
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন

হত্যার পর বিচার কোথায়: শিশু থেকে সংখ্যালঘু—আইনের শাসনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ

Reporter Name
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, রাষ্ট্রের জন্যও এটি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে সবচেয়ে অসহায় মানুষটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড সেই পরীক্ষার সামনে আবারও বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তিনজনকে আটক করেছে। পরে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনও এক কিশোরের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হত্যার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার মোটিভ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

অপ্রতিমের পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তারা শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হবে কি না। এই প্রশ্নটি নতুন নয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক হত্যাকাণ্ড, বিশেষ করে শিশু হত্যার ঘটনা, একই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

রংপুরের গণপতি চক্রবর্তী পরিবারের হত্যাকাণ্ডের কথাও মনে পড়ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং ১১ বছর বয়সী ছেলে আয়ুষকে নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রথম দিকে পুলিশ হত্যার একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আনে। পরে সেই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং বাংলাদেশ আইনজীবী ঐক্য পরিষদ ঘটনাটির বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, তদন্ত যেন কোনোভাবেই ‘জজ মিয়া নাটকে’ পরিণত না হয়। তবে এই মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। ফলে মামলাটি এখনো তদন্তপর্যায়ে রয়েছে এবং আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। কিন্তু তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গণপতি পরিবারের হত্যার সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু দুটি ঘটনাই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে: হত্যার তদন্ত কি সত্যিই নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্তভাবে হচ্ছে?

এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা যায় আরও কিছু শিশু হত্যার ঘটনা। সিলেটের কানাইঘাটের পাঁচ বছর বয়সী মুনতাহা আক্তারের হত্যাকাণ্ড দেশকে নাড়া দিয়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, তাকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ গুম করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কুমিল্লার সাত বছর বয়সী শিশু সায়মন হত্যার মামলায় অবশ্য বিচারিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও আছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আদালত বিল্লাল পাঠানকে মৃত্যুদণ্ড এবং সায়মনের চাচি শেফালী বেগমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর আদালত এই রায় দেয়। অর্থাৎ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না—এমন সরল সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। কোথাও বিচার হচ্ছে, কোথাও আবার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে কিংবা তদন্ত ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আরও একটি ঘটনা দেখায়, বিচার হলেও তার জন্য কত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সেটিও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০১২ সালে অপহরণের পর প্রায় দেড় মাস আটকে রেখে আট বছর বয়সী মাহফুজকে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় ১৪ বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আদালত তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন তখনও পলাতক ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। অর্থাৎ শুধু আদালতের রায় হওয়াই যথেষ্ট নয়; তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার, সাক্ষ্য, আপিল এবং শেষ পর্যন্ত সাজা কার্যকর—ন্যায়বিচারের পুরো প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটিও সেই প্রশ্নকে আরও কঠিন করে তোলে। ঘটনার দুই বছর পরও মামলার বিচার শুরু হয়নি। অভিযোগপত্রে ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন কারাগারে, নয়জন জামিনে এবং ১৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও তাঁরা এখনো গ্রেপ্তার হননি বলে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এখানে ‘জামিন’কে নিজেই অপরাধ বা বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জামিন ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার একটি স্বীকৃত আইনি ব্যবস্থা। প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। একটি হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পরও যদি বিচার শুরু না হয় এবং অধিকাংশ আসামি যদি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে, তাহলে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডও একই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তাঁর মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। মামলায় একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পরও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এর মধ্যে মামলার অন্যতম আসামি মো. মাসুম হাইকোর্ট থেকে এক বছরের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন। আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় এই জামিন দেন।

এখানেও প্রশ্নটি জামিনের আইনগত বৈধতা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—একজন মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করার মতো ঘটনায় তদন্ত ও বিচার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এগোয়? একটি মামলায় আসামি গ্রেপ্তার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্রেপ্তারই বিচার নয়। বিচার মানে নিরপেক্ষ তদন্ত, আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে রায় কার্যকর হওয়া।

কুমিল্লার বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও তথ্যটি সঠিকভাবে দেখা জরুরি। বলা হয়েছিল, এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। কিন্তু পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলের ওই হত্যাকাণ্ডে র‍্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য হিসেবে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। পরে পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। ফলে এখন প্রশ্নটি শুধু ‘গ্রেপ্তার হয়নি কেন’—এটি নয়; বরং তদন্তের পর মামলাটি কত দ্রুত বিচারপর্বে যায় এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয় কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

এই পার্থক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইনের শাসন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগের কারণে তথ্যের সামান্য ভুলও পুরো যুক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করতে হলে তথ্য আরও নির্ভুল হতে হয়।

তবে শিশু হত্যা, প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্যাতন করে হত্যা কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হামলার অভিযোগ—সব ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন প্রশ্ন থেকে যায়: রাষ্ট্র কি অপরাধের পর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে পারছে?

২০২৪ সালের আগস্টের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগগুলো যাচাই করে একটি হিসাব প্রকাশ করেছে। পুলিশের হিসাবে, ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৭৬৯টি সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৪৫৭টি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৬২টি ঘটনায় মামলা এবং ৯৫১টি ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এসব মামলায় মোট ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিশ্চিত হওয়া ঘটনাগুলোর বড় অংশ রাজনৈতিক বিরোধ-সংক্রান্ত ছিল।

এই সরকারি হিসাবের অর্থ এই নয় যে সব ঘটনা সাম্প্রদায়িক ছিল না। আবার বিভিন্ন নাগরিক ও সংখ্যালঘু সংগঠনের দেওয়া সব সংখ্যাকেও সরকারি তদন্তের সমতুল্য ধরে নেওয়া যায় না। ফলে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করা এবং অপরাধের প্রকৃতি নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে মামলা ও গ্রেপ্তারের পর বিচার কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

এখানেই রাষ্ট্রের জবাবদিহির বড় প্রশ্নটি আসে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর সংঘটিত প্রতিটি সংখ্যালঘু-নির্যাতনের ঘটনায় কোনো সাজা হয়নি—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। আবার বিপুল সংখ্যক ঘটনার দ্রুত বিচার ও দণ্ড নিশ্চিত হয়েছে—এমন প্রমাণও নেই। ফলে সমস্যাটি শুধু ‘বিচার হয়নি’ বলার নয়। সমস্যা হলো বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত চিত্র সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

আর বিচারহীনতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই। কোনো হত্যার তদন্তে দীর্ঘ বিলম্ব হলে ভুক্তভোগী পরিবার রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়। আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পরও যদি বিচার শুরু হতে বছরের পর বছর চলে যায়, তাহলে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজ মামলার ফলাফল নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। আর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারের অগ্রগতির মধ্যে বড় ফাঁক থাকলে রাষ্ট্রের সমান সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

তবে এর বিপরীত উদাহরণও আছে। কুমিল্লার শিশু সায়মন হত্যায় আদালতের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেখায় যে বিচারব্যবস্থা কাজ করতে পারে। ২০১২ সালের মাহফুজ হত্যা মামলার ২০২৬ সালের রায়ও দেখায়, দীর্ঘ বিলম্বের পর হলেও আদালতে বিচারিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের আইনের শাসন কেবল কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রশ্ন হলো, একই ধরনের অপরাধে বিচার কি নিয়মিতভাবে হচ্ছে, তদন্ত কি রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত, ভুক্তভোগী দরিদ্র হলে তার মামলা কি একই গুরুত্ব পাচ্ছে, আসামি প্রভাবশালী হলে তদন্তের গতি কি বদলে যাচ্ছে, পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বাধীনভাবে তা যাচাই করার ব্যবস্থা আছে কি না, সাক্ষীরা নিরাপদ কি না, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হচ্ছে কি না এবং বিচার শুরু হওয়ার পর তা অযথা দীর্ঘ হচ্ছে কি না।

এগুলোই আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা।

একজন মা তাঁর ১৩ বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়েছেন। তাঁর কাছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কোনো সংবাদ সম্মেলনও নয়। তাঁর কাছে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি একটাই—যে মানুষটি তাঁর সন্তানকে হত্যা করেছে, তাকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে, আদালতে বিচার হবে এবং প্রমাণিত অপরাধের জন্য আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে।

এই প্রতিশ্রুতিই রাষ্ট্রকে রাখতে হবে।

অপ্রতিমের হত্যার বিচার তাই শুধু একটি পরিবারের বিচার নয়। এটি বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তদন্তব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থারও পরীক্ষা। আজ প্রশ্নটি শুধু ‘অপরাধী কে?’ নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—অপরাধী যে-ই হোক, রাষ্ট্র কি তাকে আইনের সামনে দাঁড় করাতে পারবে?

কারণ আইনের শাসনের আসল অর্থ হলো—অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি। আর এই নীতি যদি বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে কোনো নাগরিকের জন্যই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নিরাপদ থাকে না।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!