খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নয়; এটি আমাদের সামাজিক অসহিষ্ণুতার একটি ভয়াবহ চিত্র। ২২ বছর বয়সী আজমুল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি মেসে থাকতেন। গত শুক্রবার রাতে মেসের নিয়ম অনুযায়ী খাবারের জন্য আগাম নাম না দিয়েই তিনি অন্য একজনের জন্য রাখা ভাত খেয়ে ফেলেন—এমন তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে তাঁকে পাঁচতলা ভবনের ছাদে নিয়ে মারধর করা হয় এবং তাঁর মাথার চুল কেটে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
আজমুলের বাবার ভাষ্য আরও ভয়াবহ। তাঁর দাবি, ঘটনার রাতে কয়েকজন তাঁকে ফোন করে ছেলের বিরুদ্ধে ভাত ও অন্যান্য জিনিস চুরির অভিযোগ তোলে এবং এক লাখ টাকা দাবি করে। তিনি বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে জীবিত পাননি। এ ঘটনায় তাঁর বাবা হত্যা মামলা করেছেন। চারজনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে; তবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হয়তো ভাতের দাম নয়, ভাত নিয়ে আমাদের সামাজিক আচরণের পরিবর্তন। মেসে, ছাত্রাবাসে কিংবা একসঙ্গে থাকা বন্ধুদের মধ্যে খাবারের হিসাব নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারও একবেলার মিল বাদ পড়তে পারে। কারও হাতে সেদিন টাকা নাও থাকতে পারে। কেউ বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করে খেতে পারে। কখনো একজনের খাবার আরেকজন খেয়ে ফেলতে পারে এবং পরে তার দাম পরিশোধ করতে পারে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রায় এই ধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাময়িক ধার-বাকি নতুন কোনো বিষয় নয়। এসব পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা যায়, হিসাব চাওয়া যায়, টাকা আদায় করা যায়, প্রয়োজনে মেসের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু একটি প্লেট ভাতের হিসাব কীভাবে একজন তরুণের জীবন কেড়ে নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়?
এখানেই আজমলের মৃত্যুকে শুধু ‘মেসের ঝামেলা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অভিযোগ সত্য হলে এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার লক্ষণ—ছোটখাটো অপরাধ, অর্থনৈতিক বিরোধ কিংবা নিয়ম ভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও চরম সহিংসতা। কেউ ভাত না জানিয়ে খেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। কেউ টাকা বা অন্য কোনো জিনিস চুরি করেছে—এমন অভিযোগও থাকতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি, মেসের দল বা ছাত্রগোষ্ঠীর নয়। কাউকে ধরে নিয়ে মারধর করা, অপমান করা, চুল কেটে দেওয়া কিংবা শাস্তি দেওয়ার নামে নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সামাজিক আচরণ হতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার করার জন্য আইন ও আদালত আছে।
আজমলের ঘটনা আরও একটি সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তোফাজ্জল হোসেনকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই মামলায় পিবিআইয়ের সম্পূরক অভিযোগপত্রে ২৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে ২২ পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও মামলার বিচার শুরু হয়নি।
দুই ঘটনার মধ্যে একটি ভয়াবহ মিল আছে। একজনকে চোর সন্দেহে, আরেকজনকে চুরির অভিযোগে শাস্তি দেওয়ার নামে মানুষই বিচারকের ভূমিকা নিয়েছে। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তি কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে। এই প্রবণতা শুধু আইনভঙ্গ নয়; এটি আইনের প্রতি সামাজিক আস্থারও বিপজ্জনক অবক্ষয়।
আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক চাপ নতুন নয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের জীবনে অর্থাভাব, পরিবারের কাছ থেকে টাকা আসতে দেরি হওয়া, মেসের বকেয়া, বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া কিংবা একবেলা কম খেয়ে থাকা—এসব বাস্তবতা বহু পরিবারের পরিচিত অভিজ্ঞতা। দরিদ্র বা সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে অনেক সময় নিজের দৈনন্দিন খরচ সামলাতে হিমশিম খায়। তাই কারও একবেলার খাবারের হিসাব নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে সেটিকে সামাজিক সহমর্মিতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সক্ষমতা থাকা দরকার। সেই জায়গায় যদি অপমান, দলবদ্ধ নির্যাতন ও শারীরিক আক্রমণ জায়গা করে নেয়, তাহলে বিপদ শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়; পুরো সমাজের জন্য।
বাংলাদেশে ‘ভাত’ শুধু একটি খাবারের নাম নয়। এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবন, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে ভাতের সম্পর্ক গভীর। বহু প্রজন্মের মানুষ অন্নের নিশ্চয়তার জন্য লড়াই করেছে। সেই সমাজে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী একটি প্লেট ভাত খাওয়ার অভিযোগে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেলেন—এই বৈপরীত্য আমাদের থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। অর্থনৈতিক সংকট মানুষকে কঠিন করে তুলতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়া যদি মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দেয়, তাহলে সেটি আর শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না; সেটি সামাজিক নৈতিকতার সংকটে পরিণত হয়।
এই কারণেই আজমল হোসেনের মৃত্যুর বিচার শুধু কয়েকজন ব্যক্তির অপরাধের বিচার নয়। ঘটনার আগে কী হয়েছিল, কারা তাঁকে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল, কারা মারধর করেছিল, তাঁর পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি কী ছিল, এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল কি না—সবকিছু নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রভাবশালী বা দলবদ্ধ আসামিদের কারণে তদন্ত থেমে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি রাষ্ট্রে আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন ছোট অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রেও মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নেয় না এবং ভুক্তভোগী বা অভিযুক্ত—উভয় পক্ষই আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে পারে। এক প্লেট ভাতের দাম কখনো একটি তরুণের জীবন হতে পারে না। আজমলের মৃত্যু তাই শুধু একটি মেসের ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজ কতটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা কতটা কমছে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে—তার একটি কঠিন সতর্কবার্তা।