অপ্রতিমের বয়স ১৩। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তার সঙ্গে যাদের ওঠাবসা, তাদের বয়স ১৫, ১৬ ও ১৯ বছর। পুলিশের ভাষায়, অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের ছিল ‘অসম বয়সী বন্ধুত্ব’। তারা কেউ তার সহপাঠীও নয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার ফোনটি নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। ফোনটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। তদন্ত চলছে।
প্রথম সত্যটি পরিষ্কার করা দরকার। অপ্রতিমের কোনো আচরণই তার হত্যার জাস্টিফিকেশন হতে পারে না। তার হাতে আইফোন ছিল, সে বড় বয়সীদের সঙ্গে মিশত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও দিত কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কিছু করত—কোনোটিই হত্যার দায় তার ওপর চাপায় না। একটি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার দায় হত্যাকারীর। একই কথা অপ্রতিমের মায়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাঁর কপালে বড় টিপ ছিল কি না, তিনি কোন রাজনৈতিক মতের সমর্থক কি না—এসবের সঙ্গে তাঁর সন্তানের হত্যার কোনো সম্পর্ক নেই। ভুক্তভোগীর পরিবারকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো মূল প্রশ্ন থেকে আমাদের সরিয়ে দেয়।
আইফোন নিয়েও একই সতর্কতা দরকার। দামি ফোন বা গহনা ব্যবহার করলে নাগরিকের নিরাপত্তার অধিকার কমে যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। তাই ‘আইফোনের জন্য অপ্রতিম হত্যা’ শিরোনামটি পাঠকের মনোযোগকে সহজেই ভুক্তভোগীর সম্পদের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। আইফোন হত্যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে, কিন্তু আইফোন কাউকে হত্যা করেনি। যদি তদন্তে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ‘কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অপ্রতিম খুন’ ঘটনাটির অপরাধ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে আরও স্পষ্ট করবে।
এখানেই রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন আসে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হত্যার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়। অপরাধ প্রতিরোধ, অভিযোগের তদন্ত, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অপ্রতিম হত্যার সম্ভাব্য আসামি তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং পুলিশকে জানালে সাধারণ ডায়েরি করার কথা বলা হয়েছে। পরে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। তবে অভিযোগ সত্য হলে আগের ঘটনায় আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ আগের অপরাধে কার্যকর ব্যবস্থা না হলে অপরাধীর মধ্যে আইনের ভয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অপ্রতিম হত্যার তদন্ত তাই শুধু হত্যার রাত পর্যন্ত সীমিত থাকা উচিত নয়; অভিযুক্তদের আগের কর্মকাণ্ড ও তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ইতিহাসও দেখা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি অভিভাবকত্বের প্রশ্নও আছে। একজন ১৩ বছরের শিশুর হাতে কীভাবে আইফোন এল? সে কেন তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী কিশোর-তরুণদের সঙ্গে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল? পরিবার তার চলাফেরা, বন্ধু, অনলাইন যোগাযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাইক চালানোর বিষয়গুলো কতটা জানত?
এসব প্রশ্ন করা ভিক্টিম ব্লেমিং নয়। শিশুকে হত্যার জন্য দায়ী করা এক জিনিস, আর শিশুকে নিরাপদ রাখার জন্য অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা আরেক জিনিস। ১৩ বছরের একটি শিশুর সব ঝুঁকি বিচার করার মতো পরিপক্বতা নাও থাকতে পারে। তাই বয়স অনুযায়ী তত্ত্বাবধান, সীমা নির্ধারণ ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
তবে প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের বাবা-মাকে ‘নির্দয়’ বলা বা হত্যার জন্য দায়ী করা অনুচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণও তার চরিত্রের বিচার করার উপাদান নয়। এগুলো সর্বোচ্চ পরিবার ও সমাজের জন্য সতর্কসংকেত হতে পারে।
আজকের শিশুর ঝুঁকি শুধু রাস্তায় নয়, ডিজিটাল জগতেও। একটি স্মার্টফোন তাকে এমন মানুষের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, যাদের পরিচয় পরিবার জানে না। তাই সন্তানকে ফোন দেওয়া যেমন একটি সিদ্ধান্ত, তার ব্যবহার ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করাও সেই সিদ্ধান্তের অংশ।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই তিনটি আলাদা প্রশ্ন সামনে আনে। হত্যার দায়ীদের বিচার হবে কি না। কিশোর অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না। এবং অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না।
একটি প্রশ্নকে আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে চাপা দেওয়া যাবে না। আইফোনের প্রশ্ন থাকবে। প্যারেন্টিংয়ের প্রশ্ন থাকবে। শিশুর অনলাইন জীবন নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। কিন্তু কোনোটিই হত্যার দায় হত্যাকারীর কাছ থেকে সরিয়ে নিতে পারে না।
অপ্রতিমকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন শুধু একটি আইফোনের গল্প হয়ে না থাকে। প্রশ্ন হওয়া উচিত—একটি ১৩ বছরের শিশু কীভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পৌঁছাল? তার আগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল? সেসব অভিযোগে আইন কী করেছিল? এবং ভবিষ্যতে এমন হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে রাষ্ট্র কী করবে?
অপ্রতিমের হাতে আইফোন ছিল। তার মায়ের কপালে বড় টিপ ছিল। এগুলো তথ্য হতে পারে। অপরাধের কারণ নয়।
অপ্রতিমের অধিকার ছিল বেঁচে থাকার। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার। এখন প্রশ্ন, কে কোথায় সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে?