শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন

সেনা বিদ্রোহ মামলার পলাতক মেজর মোজাফফর : পুরোনো মামলা, নতুন মামলা—বিতর্ক কোথায়?

অপু সারোয়ার
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাশাসক জিয়াউর রহমান হত্যা এবং ১৯৮১ সালের সেনা বিদ্রোহ মামলার পলাতক অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে ১৬ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁকে জুলাই ২০২৪ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়। এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একজন পলাতক আসামির গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আইনের ধারাবাহিকতা নিয়ে একাধিক মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। উল্লেখ্য, মোজাফফর হোসেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

প্রথম প্রশ্নটি ১৯৮১ সালের বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে। যদি সামরিক আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বৈধ দণ্ডাদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বিচারিক আদেশ এখনো কার্যকর থাকে, তাহলে গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিকভাবেই সেই মামলার আইনগত প্রক্রিয়াই আগে অনুসরণ হওয়ার কথা। রাষ্ট্র অবশ্যই একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগে তদন্ত বা মামলা করতে পারে। কিন্তু পুরোনো মামলার আইনগত অবস্থান স্পষ্ট না করেই নতুন মামলাকে সামনে আনা হলে তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।

আরেকটি প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ডিবি তাঁকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করল, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের হেফাজতে গেলেন। এই হেফাজত পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি কী ? জুলাই ২০২৪ সালের মামলায় তাঁকে যুক্ত করার মতো কী তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে? রাষ্ট্র এখনো সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী তিনি ১৯৮১ সালের পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন। যদি সেটিই সত্য হয়, তাহলে ২০২৪ সালের ঘটনাবলির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তি কী—এই প্রশ্নের উত্তর তদন্তকারী সংস্থাকেই দিতে হবে। অন্যথায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বহু বছরের অমীমাংসিত একটি মামলার আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে অন্য একটি মামলাকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হলো।

২০২৬ সালের ২১ জুলাই প্রকাশিত **দৈনিক যুগান্তর**-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য এ বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। তিনি বলেন, *একই অপরাধে একজন ব্যক্তির দুই আইনে বিচার হতে পারে না। তাই মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাঁর বিচার জেনারেল কোর্ট মার্শালে হবে। ” কিন্তু একই বক্তব্যে তিনি আবার বলেন, *মোজাফফর হোসেন দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় তার বিচার হয়নি।” এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি তৈরি হয়। যদি তাঁর বিচারই না হয়ে থাকে, তাহলে গত ৪৫ বছর ধরে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি অবস্থান কী ছিল? কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বহাল ছিল? যদি ছিল, তাহলে এত দীর্ঘ সময় তা কার্যকর করা গেল না কেন? আর যদি বিচার শুরুই না হয়ে থাকে, তাহলে আজ যে সামরিক বিচারের কথা বলা হচ্ছে, তার আইনগত ভিত্তি কী—রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

এর আগে ২০ জুলাই **প্রথম আলো**-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, *মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর অন্য সহযোগীদের বিচার তখন সামরিক আদালতে হয়েছে। সেখানে কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। তিনি দীর্ঘদিন ভিন্ন পরিচয়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে পলাতক ছিলেন।” এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। কোনো মামলার রায়ে আদালত বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিতে পারেন। কিন্তু সেই *পর্যবেক্ষণ” কি একাই কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা বিচারের আওতায় আনার আইনগত ভিত্তি হতে পারে? নাকি তার জন্য পৃথক অভিযোগ, গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং স্বাধীন তদন্ত অপরিহার্য? বিষয়টি স্পষ্ট না করে কেবল *পর্যবেক্ষণ”-এর কথা উল্লেখ করলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে।

একইভাবে, যদি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী মোজাফফর দীর্ঘদিন পার্শ্ববর্তী একটি দেশে পলাতক থেকে থাকেন, তাহলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাবলির সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করার অভিযোগের ভিত্তিও স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কারণ, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর, অনুমান বা জনমতের ওপর নয়। মোজাফফরের বিরুদ্ধে বিচার অবশ্যই আইনের বিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিচারের আইনগত ভিত্তি, ১৯৮১ সালের মামলার বর্তমান অবস্থান, নতুন মামলার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য এবং হেফাজত পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না এলে প্রশ্ন থেকেই যাবে। ন্যায়বিচারের জন্য শুধু বিচার করাই যথেষ্ট নয়; বিচারটি আইনগতভাবে সুসংগত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য বলেও প্রতীয়মান হতে হবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!