শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি !  বাংলাদেশের আয়নায় ভারতকে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত? প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: শেষ নয়, শুরু ৪৫ বছর পর মেজর মোজাফফর: সত্য উদ্ঘাটনের সুযোগ, নাকি নতুন বিভ্রান্তি ? ভারতের ছাত্র আন্দোলনের বার্তা: দমন-পীড়ন নয় এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্ন সেনা বিদ্রোহ মামলার পলাতক মেজর মোজাফফর : পুরোনো মামলা, নতুন মামলা—বিতর্ক কোথায়? মহিউদ্দিন আহমদ : এজেন্ডার রাজনীতি, মুসলিম লীগবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাপানে জাতীয় পতাকা অবমাননা নিষিদ্ধ: নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক ফকল্যান্ডের ব্যানার ঘিরে বিতর্ক, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার দ্বারস্থ ব্রিটেন আর্জেন্টিনার জয়, মালভিনাসের দাবি এবং ক্ষমতার সীমারেখা ফাহমিদুল হকের জুলাই বিশ্লেষণে স্ববিরোধিতার প্রশ্ন
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

 বাংলাদেশের আয়নায় ভারতকে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত?

সমসমাজ ডেস্ক। / ৭২ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

ভারতে চলমান সরকারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে বাংলাদেশে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন, ভারতে নাকি “বাংলাদেশের ২০২৪ সালের পুনরাবৃত্তি” ঘটতে চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগনির্ভর এই তুলনা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবতার বিচারে তা ততটাই দুর্বল। একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আরেকটি দেশের অভিজ্ঞতার ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করা সহজ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান এত সরল নয়। প্রতিটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক কাঠামো, দলীয় সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভিন্ন। ফলে এক দেশের সংকটকে আরেক দেশের ভবিষ্যৎ বলে ধরে নেওয়া বিশ্লেষণ নয়, বরং অনুমান।

ভারতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছে, সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, এমনকি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু এখান থেকে সরাসরি রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন বা সাংবিধানিক বিপর্যয়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর দেশটিতে বহুবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কখনও কংগ্রেস ক্ষমতা হারিয়েছে, কখনও জনতা পার্টি এসেছে, কখনও বিজেপি, আবার কখনও জোট সরকার। কিন্তু প্রতিবারই সেই পরিবর্তনের বৈধতা এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমে। ভোটাররাই সরকার গঠন করেছেন, ভোটাররাই সরকার বিদায় করেছেন। ভারতের গণতন্ত্র নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেলেও ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম এখনো নির্বাচন। সে কারণে শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিকে এক করে দেখা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়।

এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতে ছাত্র আন্দোলন যত বড়ই হোক, শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক পরিণতি নির্ধারণ করবে ভোটাররা। আন্দোলন সরকারকে দুর্বল করতে পারে, নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারে, জনমত তৈরি করতে পারে; কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই জনমতের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় ব্যালট বাক্সে, ব্যারিকেডে নয়। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। কে কীভাবে সেই ঘটনাকে মূল্যায়ন করবেন, তা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে ভারতের ওপর হুবহু আরোপ করা বিশ্লেষণকে শক্তিশালী করে না; বরং তুলনাটিকেই দুর্বল করে। দুটি দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য এবং ক্ষমতার ভারসাম্য এক নয়।

আরও একটি বিষয় উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে এক ধরনের অন্ধ ভারতবিরোধিতাকে অনেক সময় দেশপ্রেমের সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে এই প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তিনির্ভর পররাষ্ট্র বিশ্লেষণের পরিবর্তে আবেগ ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে উসকে দেয়। একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা অবশ্যই করা যায়, করা উচিতও। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা আর একটি দেশের অস্তিত্ব, জনগণ বা সবকিছুর প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ—এই দুটি বিষয় এক নয়। ভারত দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক শক্তি। ফলে একটি বড় রাষ্ট্র ও একটি ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে যেমন বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা বা কূটনৈতিক স্বার্থ নিয়ে টানাপোড়েন থাকে, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেও তেমন বাস্তব সংকট রয়েছে। এসব প্রশ্নে সমালোচনা বা মতপার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করেও বলা যায়, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ককে কেবল শত্রুতা কিংবা ষড়যন্ত্রের একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।

গণতন্ত্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের শক্তি নির্ভর করে তথ্য, ইতিহাস ও বাস্তবতার ওপর। তাই ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনকে বোঝার জন্য ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস, সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকেই বিবেচনায় নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগ বা অন্য দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যান্ত্রিক তুলনা দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। রাজনীতিতে তুলনা করা সহজ, কিন্তু সঠিক তুলনা করা কঠিন। তাই ভারতকে বোঝার জন্য ভারতকে, আর বাংলাদেশকে বোঝার জন্য বাংলাদেশকে—তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোতেই বিচার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!