[ ২০০৭ সালের নভেম্বরে মৌলবাদী চাপ ও রাজনৈতিক আপসের আবহে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ উনিশ বছর। ২০২৬ সালে আবার কলকাতায় ফিরলেন বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি শহরে ফেরা নয়, এক দীর্ঘ নির্বাসনের অধ্যায়ে নতুন এক পর্বের সূচনা।
কলিকাতার রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে তাঁর বক্তৃতাজুড়ে ছিল নির্বাসনের যন্ত্রণা, নিজের ভাষার শহরে ঘর হারানোর বেদনা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইতিহাস। কলকাতায় ফিরে আবেগাপ্লুত তসলিমা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাঁর জন্য পশ্চিমবঙ্গের দরজা আবার খুলে দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও তাঁর সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।” এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে গত দুই দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা—এক সময় যে শহর তাঁকে ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল, সেই শহরই আজ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। ]
তসলিমা নাসরিনের জীবন কেবল একজন লেখকের ব্যক্তিগত নির্বাসনের ইতিহাস নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং ভোটভিত্তিক রাজনীতির জটিল সম্পর্কেরও দলিল। ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাঁকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়। তাঁর উপন্যাস লজ্জা প্রকাশের পর থেকেই ইসলামপন্থী মৌলবাদী সংগঠনগুলি তাঁর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন, মৃত্যুর হুমকি ও ফতোয়া জারি করে। রাষ্ট্র তাঁর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার পরিবর্তে ক্রমশ আপসের পথ বেছে নেয়। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতার মুখে তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য হতে হয়। একজন লেখকের পরিবর্তে মৌলবাদীদের চাপই কার্যত রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।
ভারতে আশ্রয় পাওয়ার পর কলকাতা ছিল তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক ঠিকানা। কিন্তু ২০০৭ সালের নভেম্বরে মৌলবাদী গোষ্ঠীর সহিংস বিক্ষোভ, কলকাতাজুড়ে অরাজকতা এবং আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জের মুখে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাঁকেই পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়। একজন নাগরিক বা আশ্রয়প্রার্থী লেখকের মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই অগ্রাধিকার পেয়েছিল।
এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী উপাদান। বহু বিশ্লেষকের মতে, বামফ্রন্ট আমলে মুসলিম ভোটব্যাংক রক্ষার রাজনীতি নতুন মাত্রা লাভ করে। তসলিমা ইস্যুতে সরকারের অবস্থান সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। পরে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেও এই প্রশ্নে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়নি। তসলিমার কলকাতায় অবাধ প্রত্যাবর্তন বা তাঁর প্রকাশ্য সাহিত্যচর্চার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল— উভয় সরকারের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা নীতির চেয়ে ভোটের অঙ্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালে নতুন সরকারের উদ্যোগে তসলিমার কলকাতায় প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ঘটনা। দীর্ঘদিনের একটি অন্যায়ের অবসান ঘটেছে এবং একজন নির্বাসিত লেখক আবার বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক রাজধানীতে ফিরতে পেরেছেন। তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে নয়। বর্তমান সরকার যেমন অতীতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তেমনি এই ঘটনাকে রাজনৈতিক বার্তা ও নির্বাচনী অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে— এমন মূল্যায়নও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের।
দুই সময়ের ঘটনাই ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটলেও একটি অভিন্ন সত্য সামনে আসে। ২০০৭ সালে একজন লেখককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভোটের সমীকরণ বিবেচনায়— এমন অভিযোগ রয়েছে; ২০২৬ সালে তাঁর প্রত্যাবর্তনও রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে— এমন পর্যবেক্ষণও অমূলক নয়। গণতন্ত্রের আদর্শিক অবস্থান হওয়া উচিত এর ঊর্ধ্বে। কোনও লেখকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার বা সাংস্কৃতিক উপস্থিতি কখনও ভোটব্যাংকের হিসাবের ওপর নির্ভর করতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নীতির ভিত্তিতে নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করা, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই নীতির পরিবর্তন ঘটানো নয়।