বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। লোডশেডিংয়ের বাস্তবতায় মানুষ যখন বিদ্যুতের বিকল্প উৎস নিয়ে প্রতিদিনই চিন্তিত, তখন কেউ যদি দাবি করেন—তিনি মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে বাইরের কোনো শক্তির যোগান ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন—স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কৌতূহল তৈরি হবে। কিন্তু কৌতূহল আর বৈজ্ঞানিক সত্য এক জিনিস নয়। আর এখানেই সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে ঘিরে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আব্দুর রহমান সুহাইল গত ২৭ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি ‘অপ্রচলিত’ পদ্ধতি আবিষ্কারের দাবি করেন। তিনি সাইকেলের চেন ও টেনিস বল যুক্ত একটি যন্ত্রও দেখান। কিন্তু যন্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, তার কোনো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তিনি দেননি। কোনো লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন হয়নি, কোনো পরীক্ষার তথ্য দেওয়া হয়নি, এমনকি যন্ত্রটি ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে—এমন কোনো ভিডিও বা পরিমাপযোগ্য প্রমাণও প্রকাশ করা হয়নি।
২৭ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলন তখন বড় কোনো সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর বাংলাভিশন বিষয়টি প্রচার করেছে। কেন এতদিন পর সংবাদটি গুরুত্ব পেল, সেটি অবশ্যই সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে ‘বিদ্যুৎ আবিষ্কার’-এর মতো চমকপ্রদ দাবির একটি আলাদা গসিপ ভ্যালু আছে—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। প্রশ্ন হলো, এই কৌতূহলকে কি সংবাদ যাচাইয়ের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
সাংবাদিকতার উত্তর হওয়া উচিত—না।
কোনো ব্যক্তি কোনো বৈজ্ঞানিক দাবি করতেই পারেন। সেটি সংবাদযোগ্যও হতে পারে। কিন্তু দাবি করা এবং আবিষ্কার করা এক বিষয় নয়। ‘তিনি দাবি করেছেন’—এটি একটি সংবাদতথ্য। ‘তিনি বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছেন’—এটি একটি বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রথমটির বাইরে প্রমাণ প্রয়োজন।
মাধ্যাকর্ষণকে ব্যবহার করে একটি যন্ত্র থেকে অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত শক্তি পাওয়া যায়—এমন দাবি পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। কোনো বস্তু ওপর থেকে নিচে নামলে তার বিভব শক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু সেই বস্তুটিকে আবার আগের অবস্থানে তুলতে অন্তত সমপরিমাণ শক্তি প্রয়োজন। বাস্তব যন্ত্রে ঘর্ষণ, বায়ুর প্রতিরোধ, শব্দ, তাপ এবং অন্যান্য ক্ষতির কারণে প্রয়োজন হয় আরও বেশি শক্তি। ফলে পতন ও উত্তোলনের একটি চক্র থেকে কোনো বাহ্যিক শক্তি ছাড়াই ক্রমাগত নিট শক্তি পাওয়ার ধারণা মূলত perpetual motion-এর ধারণা।
এখানে energy harvesting-এর সঙ্গে বিষয়টি গুলিয়ে ফেলারও সুযোগ নেই। সূর্যের আলো, বাতাস বা প্রবাহমান পানির শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, কারণ সেখানে বাইরের উৎস থেকে শক্তি আসছে। সৌর প্যানেল শক্তি সৃষ্টি করে না; সূর্যালোককে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। উইন্ড টারবাইনও বাতাসের শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। কিন্তু একটি বন্ধ ব্যবস্থার ভেতর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে একটি বস্তুকে নামিয়ে সেই শক্তি দিয়ে আবার তাকে ওপরে তুলে একই প্রক্রিয়া অনন্তকাল চালানো সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি।
এই জায়গায় বিজ্ঞান খুবই নির্মোহ। কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি বিজ্ঞানের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কোনো যন্ত্র কাজ করে কি না, তা নির্ধারণের জন্য এসব পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক। সেখানে দরকার শক্তির হিসাব, পরীক্ষার ফল, পুনরুৎপাদনযোগ্যতা এবং স্বাধীন যাচাই।
সমস্যাটি আরও জটিল হয় যখন এই দাবিকে পবিত্র কোরআনের বিজ্ঞান-সম্পর্কিত আয়াতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে কোরআন ধর্মীয়ভাবে পবিত্র। ফলে কোনো বৈজ্ঞানিক দাবিকে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে যুক্ত করলে সেই দাবির সমালোচনা অনেকের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা বলে প্রতীয়মান হতে পারে। অর্থাৎ একটি বৈজ্ঞানিক দাবির চারপাশে এমন এক ধরনের প্রতিরক্ষাবলয় তৈরি হয়, যেখানে যুক্তিগত প্রশ্ন তোলাই অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে।
এটি ধর্মের জন্যও ভালো নয়।
কোনো ধর্মীয় গ্রন্থের মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ তার নামে করা প্রতিটি বৈজ্ঞানিক দাবিকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং পবিত্র গ্রন্থকে অপ্রমাণিত আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে না ফেলাই তার মর্যাদার প্রতি বেশি সম্মানজনক। একটি যন্ত্র ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হবে যন্ত্রটির উদ্ভাবকের তত্ত্ব; সেটিকে ধর্মীয় সত্যের সঙ্গে জুড়ে দিলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসও সেই ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
আমাদের গণমাধ্যমের এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
বাংলাদেশে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি ছাড়া গাড়ি চালানো, প্রায় বিনা খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন, অসম্ভব প্রযুক্তি আবিষ্কার কিংবা প্রচলিত বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিকে অস্বীকার করে নানা ‘বিস্ময়কর আবিষ্কার’-এর দাবি সামনে এসেছে। এসব দাবির অনেকগুলোরই পরে কোনো বাস্তব বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কখনো কখনো মূলধারার গণমাধ্যমের প্রচারে সেগুলো সাময়িকভাবে জনআলোচনায় এসেছে।
এখানেই অপবিজ্ঞানের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্কের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
অপবিজ্ঞান সবসময় নিজস্ব প্রমাণ দিয়ে জনপ্রিয় হয় না। অনেক সময় জনপ্রিয় হয় প্রচারের মাধ্যমে। একটি অদ্ভুত দাবি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায়, পরে টেলিভিশন সেটিকে ‘বিস্ময়কর আবিষ্কার’ হিসেবে দেখায়, এরপর মানুষ ধরে নেয়—যেহেতু টেলিভিশনে এসেছে, নিশ্চয়ই এর মধ্যে সত্যতা আছে। এভাবেই গণমাধ্যমের দৃশ্যমানতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি প্রমাণহীন দাবিকে সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে দেয়।
গণমাধ্যমের কাজ অবশ্যই নতুন ও অস্বাভাবিক দাবিকে উপেক্ষা করা নয়। বরং এমন দাবি সংবাদে আরও বেশি দায়িত্বের সঙ্গে আনা উচিত। কিন্তু সেখানে ভাষাটিই গুরুত্বপূর্ণ। ‘অমুক ব্যক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন’—এটি এক ধরনের উপস্থাপন। ‘অমুক ব্যক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের দাবি করেছেন’—এটি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের উপস্থাপন। প্রথমটিতে সংবাদমাধ্যম দাবিটির সত্যতা যেন মেনে নিচ্ছে; দ্বিতীয়টিতে সংবাদমাধ্যম কেবল দাবিটির অস্তিত্ব জানাচ্ছে।
তারপর দরকার বিশেষজ্ঞ মতামত।
একজন পদার্থবিদ বা প্রকৌশলীকে যন্ত্রটি দেখানো যেত। শক্তির ইনপুট-আউটপুটের হিসাব জানতে চাওয়া যেত। যন্ত্রটি নির্দিষ্ট সময় চালিয়ে তার উৎপাদনক্ষমতা পরিমাপ করা যেত। স্বাধীন পর্যবেক্ষকের সামনে পরীক্ষা করা যেত। এগুলো করতে খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই সামান্য যাচাইই একটি সংবাদকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায় পরিণত করতে পারে।
এখানে কওমি মাদ্রাসার প্রসঙ্গও সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। একজন মাদ্রাসা শিক্ষক একটি অবৈজ্ঞানিক দাবি করেছেন বলে গোটা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি দাবি করেছেন বলেই তার বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও ঠিক নয়। বরং ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রাখে—সব শিক্ষাব্যবস্থাতেই কি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যুক্তি, পরীক্ষা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার যথেষ্ট চর্চা আছে?
আর মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি রক্ষার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি অপ্রমাণিত দাবিকে প্রচার করা নয়। বরং কোনো শিক্ষক অস্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক দাবি করলে সেখানেও একই প্রশ্ন করা—প্রমাণ কোথায়?
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই।
একটি প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের সুনাম কতটা চমকপ্রদ খবর প্রকাশ করেছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে চমকপ্রদ খবরের মধ্যেও কতটা যাচাই-বাছাই করতে পেরেছে তার ওপর। বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে ‘নতুন বিদ্যুৎ আবিষ্কার’ নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় শিরোনাম হতে পারে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম যদি সেই আকর্ষণকে যাচাইয়ের চেয়ে বড় করে দেখে, তাহলে অজান্তেই অপবিজ্ঞানের প্রচারক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলার জন্য ধর্মকে প্রতিপক্ষ বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—তার প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিয়েই দিতে হবে। কোনো পবিত্র গ্রন্থের প্রতি শ্রদ্ধা মানে তার নামে করা প্রতিটি বৈজ্ঞানিক দাবিকে প্রশ্নাতীত করে দেওয়া নয়।
বরং প্রশ্ন করার অধিকারটিই রক্ষা করতে হবে।
কারণ সাংবাদিকতার কাজ বিশ্বাস তৈরি করা নয়; তথ্য যাচাই করা। বিজ্ঞানের কাজ বিশ্বাস দাবি করা নয়; প্রমাণ হাজির করা। আর গণমাধ্যম যখন যাচাই ছাড়াই প্রমাণহীন বৈজ্ঞানিক দাবিকে প্রচার করে, তখন সে শুধু একটি দুর্বল সংবাদ প্রকাশ করে না—সে জনপরিসরে অপবিজ্ঞানকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি খুব সরল:
কে দাবি করেছেন—তা নয়, প্রমাণ কোথায়?
আর গণমাধ্যমের জন্য প্রশ্নটি আরও সরল:
খবরটি কতটা চমকপ্রদ—তা নয়, খবরটি কতটা যাচাই করা?