শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! টাকায় আপস, গরুতে সহায়তা—বিচার কোথায়? বারিধারায় মেহেদীর মৃত্যু: টাকার জোরে কি এবারও পার পেয়ে যাবে কেউ? চাকরি খুঁজতে এসে লাশ হয়ে ফেরা মরিয়ম “অপ্রতিমের হাতে আইফোন, অপরাধীর হাতে আইন কোথায়?” একবেলা ভাতের জন্য খুন: অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে  সমাজ ! হত্যার পর বিচার কোথায়: শিশু থেকে সংখ্যালঘু—আইনের শাসনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: এখনই সময় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর মেধা না বিশেষ সুবিধা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে? রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার? মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

টাকায় আপস, গরুতে সহায়তা—বিচার কোথায়?

সমসমাজ প্রতিবেদক।
Update : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বারিধারার ডিপ্লোমেটিক জোনের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। নীলফামারীর ডোমারের এই তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। অবসরে কাগজের ফুল বানিয়ে বিক্রি করতেন। বাড়িঘর ঠিক করার জন্য কিছু টাকা জমাতে ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। পরদিন বিকেলে একটি দ্রুতগতির প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাঁকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ২৪ বছর বয়সী মেহেদী।

ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন গাড়িতে থাকা ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। সিসিটিভি ফুটেজেও দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালকের আসন থেকে ওই কিশোরকে নামতে দেখা যায়। প্রথমে মামলায় চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের একজনকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার সময় গাড়ির চালকের আসনে কিশোরটি এবং পাশে আকাশ মারক ছিলেন। আকাশ মারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও একটি বিষয়—মেহেদীর পরিবারের সঙ্গে ৯ লাখ টাকায় আপসের দাবি। আপসনামায় দাফন-কাফনের জন্য ১ লাখ এবং তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যতের জন্য ৮ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মামলায় সহযোগিতা করা এবং অভিযুক্তদের জামিনে আপত্তি না জানানোর কথাও রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইনের এই মামলা আপসযোগ্য নয়। বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে ব্যক্তিগত সমঝোতা হলেও আদালত তা গ্রহণ করতে বাধ্য নন।

এখানেই মূল প্রশ্ন: একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে টাকা দিলেই কি সেই মৃত্যুর আইনগত দায়ও টাকায় মিটে যায়?

মেহেদীর ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও মামলা প্রত্যাহার, স্থানীয় সালিশ কিংবা অর্থের বিনিময়ে আপসের খবর আমরা আগেও দেখেছি। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবার দরিদ্র ও অসহায় হওয়ায় অর্থনৈতিক চাপই তাদের আপসের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে বিচার পাওয়ার অধিকার এবং তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে পরিবারকে বেছে নিতে হয়।

এটি শুধু আইনের দুর্বলতা নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামোরও প্রতিফলন। যার অর্থ আছে, সে দীর্ঘ মামলা চালাতে পারে, আইনজীবী নিয়োগ করতে পারে, সময় দিতে পারে। যার অর্থ নেই, তার কাছে কয়েক লাখ টাকা তাৎক্ষণিকভাবে বিশাল সহায়তা মনে হতে পারে। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে যদি গুরুতর অপরাধের মামলা নিষ্পত্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা—রাষ্ট্রীয় আইনকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক বা ধর্মীয় সালিশের মাধ্যমে বিচার করার চেষ্টা। ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেই কোথাও অভিযুক্তকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানো হচ্ছে, কোথাও মারধর বা প্রকাশ্যে অপমান করা হচ্ছে। অভিযোগ সত্য কি না, অপরাধের প্রমাণ কী এবং অভিযুক্তের দায় কতটুকু—এসব নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। জনতা, স্থানীয় মাতব্বর বা কোনো ধর্মীয় সালিশের নয়।

অর্থাৎ আমরা যেন দুই বিপরীত পথে একই জায়গায় পৌঁছাচ্ছি। একদিকে টাকার জোরে আপস, অন্যদিকে সামাজিক বা ধর্মীয় ক্ষমতার জোরে বিচার। দুটোই রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ধর্মীয় সালিশ প্রতিষ্ঠা করা হলে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি পরিবারকে টাকা দিয়ে মামলা প্রত্যাহারে রাজি করিয়ে নেওয়া হলেও সেটিকে ন্যায়বিচার বলা যায় না।

সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনাও বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বগুড়ায় একজন প্রতিমন্ত্রীকে বহনকারী সরকারি গাড়ির ধাক্কায় ৭৯ বছর বয়সী ফিরোজা বেগম গুরুতর আহত হয়ে পরে মারা যান। দুর্ঘটনার পর তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জীবিকার জন্য একটি গরু দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে।

একটি দরিদ্র পরিবারকে গরু দেওয়া বা আর্থিক সহায়তা করা মানবিক উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার—সহায়তা এক বিষয়, বিচার আরেক বিষয়।

একটি পরিবারকে টাকা দেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জীবিকার জন্য গরু দেওয়া যেতে পারে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো উপহার বা আর্থিক সহায়তা একজন মানুষের মৃত্যুর আইনগত দায় নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না। ক্ষতিপূরণ এবং ফৌজদারি বিচার—দুটি আলাদা বিষয়।

নইলে একটি ভয়ংকর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবে: টাকা থাকলে অপরাধের পরিণতি ম্যানেজ করা যায়। আর টাকা না থাকলে ধর্মীয় বা সামাজিক সালিশের দ্বারস্থ হতে হয়।

এই দুটি প্রবণতাই বিপজ্জনক। কারণ আদালতের বাইরে দরকষাকষি এবং আদালতের বাইরে শাস্তি—দুটিই রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃত্বকে ক্ষয় করে।

মেহেদীর পরিবার ৯ লাখ টাকা পেতে পারে। সেই টাকা হয়তো তাঁর বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই টাকা মেহেদীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাঁর অসমাপ্ত পড়াশোনা, শ্রম, স্বপ্ন কিংবা পরিবারের জন্য তাঁর পরিকল্পনা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাই ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন হলেও সেটি বিচার-এর বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান থাকলেও ধর্মীয় সালিশ রাষ্ট্রের ফৌজদারি আইনের বিকল্প হতে পারে না। কোনো অপরাধের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আদালতে এবং প্রচলিত আইনের অধীনে।

মেহেদীর মামলায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—কী ঘটেছিল, গাড়িটি কে চালাচ্ছিল, কার অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটল এবং আইনে কার কতটা দায়—এসব নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা। ৯ লাখ টাকার আপসনামা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। একজন শ্রমিকের মৃত্যুর দাম ৯ লাখ টাকা হতে পারে না। আবার কোনো প্রভাবশালী মানুষের দায়ও কোনো টাকা, গরু বা সামাজিক সমঝোতার বিনিময়ে শেষ হয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্র যদি এই সীমারেখা স্পষ্ট না করে, তাহলে ভবিষ্যতে দুটি ব্যবস্থা পাশাপাশি চলবে—ধনীর জন্য টাকার আপস, আর দুর্বলের জন্য সালিশের বিচার। মাঝখানে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে রাষ্ট্রের আদালত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল: বাংলাদেশে বিচার হবে আইনের ভিত্তিতে, নাকি যার টাকা আছে তার সঙ্গে আপসে এবং যার সামাজিক বা ধর্মীয় প্রভাব আছে তার সালিশে? মেহেদী হাসানের মৃত্যু এই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে। ক্ষতিপূরণ হতে পারে, সহায়তা হতে পারে, পুনর্বাসন হতে পারে—কিন্তু অপরাধের বিচার বিক্রি বা বদলি হতে পারে না।

তথ্যসূত্র

১. প্রথম আলো, “বারিধারায় গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু: চালকের আসনে ছিল কিশোর, মামলায় আসামি আরেকজন”, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

২. প্রথম আলো, “টাকা জমিয়ে ঘর ঠিক করার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন, পরদিনই থেমে গেল জীবন”, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

৩. প্রথম আলো, “৯ লাখ টাকায় আপসের দাবি, তাতে কি ছাড়া পাবে ওই কিশোর”, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

৪. প্রথম আলো, বগুড়ায় সরকারি গাড়ির ধাক্কায় ফিরোজা বেগমের মৃত্যুর ঘটনা। ৪  সেপ্টেম্বর ২০২৬।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!