বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে বিতর্ক স্বাধীনতার পর থেকেই চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশ কেমন রাষ্ট্র হবে—এই বড় প্রশ্নের ভেতর থেকেই একের পর এক ছোট প্রশ্ন সামনে আসে। জাতীয় পরিচয় কী হবে? ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে? অর্থনীতি কোন পথে চলবে? নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের ক্ষমতার সীমা কোথায় হবে? বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন থাকবে?
এর মধ্যে তিনটি প্রশ্ন রাষ্ট্রচরিত্র নির্ধারণের কেন্দ্রে ছিল—জাতীয় পরিচয়, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা। ১৯৭২ সালের সংবিধানের রাষ্ট্রদর্শন বুঝতে এই তিনটি প্রশ্নই তাই প্রধান ভিত্তি।
এসব প্রশ্নের মধ্যেই ১৯৭২ সালের সংবিধান তৈরি হয়। কিন্তু সংবিধান প্রণয়নের পরও বিতর্ক থামেনি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, সামরিক শাসন এসেছে, আবার গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। সংবিধানও বারবার সংশোধিত হয়েছে। ফলে সময়ের সঙ্গে একই সাংবিধানিক প্রশ্ন নতুন অর্থ পেয়েছে।
সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি দলিল নয়; এর মধ্যে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনও প্রকাশ পায়। কে কতটা ক্ষমতা পাবে, নাগরিকের অধিকার কী হবে, রাষ্ট্র কোন আদর্শ অনুসরণ করবে এবং ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে থাকবে—এসবের কাঠামো সংবিধান নির্ধারণ করে। তাই সংবিধানের পেছনে শুধু আইন থাকে না; থাকে একটি সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আশা, ভয়, দাবি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন।
সংবিধান বুঝতে হলে তাই শুধু ধারা-উপধারা পড়লেই হয় না। দেখতে হয়, কোন পরিস্থিতিতে এটি লেখা হয়েছিল, কোন রাজনৈতিক শক্তিগুলো তখন সক্রিয় ছিল, তাদের রাষ্ট্রচিন্তা কী ছিল এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তাদের অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল। একই সঙ্গে দেখতে হয়, পরে সংবিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তার অর্থ কীভাবে বদলেছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানের বিরোধিতার উৎসও এক ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক বা আদর্শগত ভাবে যুক্ত একটি অংশ নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো মেনে নেয়নি। তাদের কাছে নতুন সংবিধান ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান এবং একটি নতুন রাষ্ট্র দর্শনের ঘোষণা। ফলে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সংবিধান বিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, চীনপন্থী বাম রাজনীতির একটি অংশও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান নেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল)-এর মতো প্রধান চীনপন্থী সংগঠনগুলো মোটা দাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও বাঙালির প্রতিরোধকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে গ্রহণ করেনি; সংঘাতকে অনেক ক্ষেত্রে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ হিসেবে দেখেছে।
তবে সংগঠন গুলোর সব কর্মী একই অবস্থানে ছিল না। কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ বা ব্যক্তি স্থানীয় ভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধের পর তাদের অনেকে আবার নিজ রাজনৈতিক সংগঠনে ফিরে যায়। স্বাধীনতার পরও চীনপন্থী বাম রাজনীতির একটি অংশ বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে মেনে নেয়নি। পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এবং পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)-সহ বিভিন্ন সংগঠন ও ধারা নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিরোধিতা করে। পরবর্তী সময়ে এসব ধারার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন নামে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায়।
তাদের বিরোধিতার ভাষা ছিল পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন—বিপ্লবী ও মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা, সংবিধান, ‘বাংলাদেশ’ নাম ও জাতীয় প্রতীক নিয়েও তাদের আপত্তি ছিল। এই ধারার রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ১৯৭১-এর পর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে ‘বেহাত বিপ্লব’ বা বিপ্লবের বিপর্যয়ের ফল হিসেবে দেখার প্রবণতাও ছিল।
তবে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক শুধু এই দুই ধরনের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যেও এই তিনটি মূল প্রশ্নে মতপার্থক্য ছিল। সেই মত পার্থক্যই ১৯৭২ সালের সংবিধানের রাষ্ট্রদর্শন ও পরবর্তী সাংবিধানিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
নিচের সংস্করণে পুনরাবৃত্তি কমিয়ে ধারাবাহিকতা বাড়ানো হয়েছে। তিনটি বিতর্কের কাঠামো শুরুতেই পরিষ্কার রাখা হয়েছে এবং শেষের অংশে পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে স্বাভাবিক সেতু তৈরি করা হয়েছে।
পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামকে শুরু থেকেই একটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখা যায় না। ১৯৪৮–৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ, কিন্তু মূল দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা। অর্থাৎ শুরুতে প্রশ্নটি ছিল ভাষার অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সমঅধিকারের; তখনই স্বাধীন বাঙালি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি সামনে আসেনি।
পরবর্তী আন্দোলন গুলোও ধাপে বিকশিত হয়েছে। ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর অসহযোগ ও মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি পর্যায়ের দাবি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য এক ছিল না। ভাষার অধিকার থেকে গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতার দাবি হয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে আসে।
বাঙালির জাতীয় পরিচয় দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রশ্নটি নতুন রূপ নেয়—এই রাজনৈতিক পরিচয় কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হবে?
১৯৭২ সালের সংবিধান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। এখানেই আপত্তির সূত্রপাত। কারণ বাংলাদেশের সব নাগরিক বাঙালি জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত নন।
২৫ অক্টোবর ১৯৭২ গণপরিষদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই প্রশ্নটি সরাসরি উত্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং বাঙালি হওয়া একই বিষয় নয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষও বাংলাদেশের নাগরিক। রাষ্ট্রীয় নাগরিক পরিচয় এবং জাতিগত পরিচয়কে এক করে দেখলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়।
এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশ্নটিও যুক্ত হয়। পাকিস্তান আমলের প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাই প্রথম বিতর্কের মূল প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় কি শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি নাগরিক পরিচয়ের পাশাপাশি সব জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে?
দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্থান পায়। এর পেছনে ছিল মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্র চিন্তার বাইরে একটি নতুন রাষ্ট্র দর্শন গড়ে তোলার চেষ্টা।
১৯৭১ সালে মুসলিম বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। কিন্তু তাদের অবস্থানকে শুধু ধর্মীয় সংহতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও জাতিগত প্রশ্ন—সবই কমবেশি ভূমিকা রেখেছিল।
সে সময় তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কুর্দি প্রশ্ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান ও ইরানেও বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল। ফলে একটি রাষ্ট্রের ভেতরের কোনো জাতিগোষ্ঠী স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুললে তা শুধু সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকত না; প্রতিবেশী ও অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছেও তা সংবেদনশীল হয়ে উঠত।
সুদান, ইথিওপিয়া ও ইয়েমেনের অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতার আরেকটি দিক দেখায়। এসব দেশে দীর্ঘ সময় ধরে জাতিগত, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য এবং সংঘাত ছিল। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরোধ অনেক সময় সশস্ত্র সংঘাতেও রূপ নেয়। ফলে জাতীয় প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক অধিকার বা স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; কোথাও তা শেষ পর্যন্ত পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার কারণ সব মুসলিম দেশের ক্ষেত্রে একই ছিল। প্রত্যেক দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতা ছিল। তাই মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা বুঝতে হলে দেশভেদে সেই বাস্তবতা বিবেচনা করতে হয়।
স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আগের রাজনৈতিক হিসাবও পরিবর্তিত হয়। সৌদি আরব ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ এবং চীন ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন অবস্থান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে পরবর্তী সম্পর্ক এক ছিল না।
কিন্তু দেশের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ নতুন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের বিরোধিতা করে। অন্যদিকে ইসলামকে রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাও পরবর্তী রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়।
এই বিরোধিতার কারণও এক ছিল না। কেউ ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গা থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতার সমালোচনা করেছে। কেউ রাষ্ট্রের পরিচয়কে ইসলাম ভিত্তিক করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আবার কেউ পাকিস্তানি রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থান থেকে নতুন রাষ্ট্রের আদর্শ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ককে শুধু ধর্মীয় বিতর্ক হিসেবে দেখলে বিষয়টি ছোট হয়ে যায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তার স্মৃতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পরিচয়।
জাতীয়তাবাদ দিয়ে রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। ধর্ম নিরপেক্ষতা দিয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এবার প্রশ্ন ছিল—এই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি কী হবে?
১৯৭২ সালের সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ করা হয়। এর পেছনে ছিল পাকিস্তানি আমলের অর্থনৈতিক বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। যুদ্ধের পর একটি তুলনামূলক সমতা ভিত্তিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কিন্তু ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ নিয়ে শুরু থেকেই মতপার্থক্য ছিল। সমাজতন্ত্রকে অনেক সময় কমিউনিজমের সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে। আবার মুসলিম সমাজে সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমকে ধর্ম বিরোধী বা নাস্তিকতার সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক প্রচারও হয়েছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের ইতিহাস তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। মার্ক্সবাদ সমাজতান্ত্রিক চিন্তার একটি শক্তিশালী ধারা হলেও সমাজতন্ত্রের সব রূপ মার্ক্সবাদী নয়।
এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধানে সমাজতন্ত্র বলতে সরাসরি একটি মার্ক্সবাদী বিপ্লবী রাষ্ট্রব্যবস্থা বোঝানো হয়েছিল—এমন দাবি যেমন সরলীকরণ, তেমনি সমাজতন্ত্রকে শুধু ধর্ম বিরোধী মতবাদ হিসেবে দেখাও ভুল।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ সংবিধানের সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করেছিল। তাদের কাছে সমাজতন্ত্র ছিল নতুন রাষ্ট্রের আদর্শগত পরিবর্তনের প্রতীক।
অন্যদিকে চীনপন্থী বাম রাজনীতির একটি অংশও সংবিধানের সমাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছিল। তবে তাদের আপত্তি ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, সংবিধানে যে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে তা মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদভিত্তিক বিপ্লবী সমাজতন্ত্র নয়। অর্থাৎ একই ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দকে দুই বিপরীত রাজনৈতিক পক্ষ দুইভাবে দেখছিল।
বাস্তবে ১৯৭২ সালের সমাজতন্ত্রকে বুঝতে হলে সেই সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। পাকিস্তানি আমলের বৈষম্য, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, দারিদ্র্য এবং শোষণের অভিজ্ঞতা থেকে একটি অপেক্ষাকৃত সমতা ভিত্তিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।
তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—১৯৭২ সালে সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝানো হয়েছিল এবং কেন সেটিকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে রাখা হয়েছিল? তাকে শুধু কমিউনিজমের আরেক নাম বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তার অর্থকে কেবল ধর্ম বিরোধিতা হিসেবে দেখাও ইতিহাসকে সরল করে ফেলে।
সমাজতন্ত্রের এই বিতর্ক থেকেই বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ভেতরের বিভাজনটি আরও স্পষ্ট হয়। স্বাধীনতার পক্ষের বাম শক্তিগুলো সংবিধান ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই অবস্থানে ছিল না। ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাসদের মধ্যে রাষ্ট্রের চরিত্র, অর্থনীতি, গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে পার্থক্য ছিল।
কেউ সংবিধানের কাঠামোর ভেতর থেকে পরিবর্তন চেয়েছে। কেউ রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক চরিত্র আরও গভীর করতে চেয়েছে। আবার কেউ নতুন রাষ্ট্রের প্রচলিত রাজনৈতিক পথই প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীনপন্থী বাম রাজনীতির একটি অংশ আরও ভিন্ন পথে যায়। তাদের একটি অংশ সশস্ত্র বিপ্লবের রাজনীতিতে যুক্ত হয়। ‘খতম’ রাজনীতির মতো ধারণাও তাদের কর্মকাণ্ডে জায়গা পায়। স্বাধীনতার পর তাদের একটি অংশ মূলধারার রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়।
এই রাজনীতিকে আবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি থেকে আলাদা করা যায় না। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক, ভারত-সোভিয়েত সমীকরণ এবং শীতল যুদ্ধের শক্তির ভারসাম্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছিল। চীন ১৯৭২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের আবেদনে ভেটো দেয় এবং দীর্ঘ সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। পরে ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
তবে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির প্রতিটি অবস্থানকে শুধু চীনের নীতির ফল হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, মাওবাদী চিন্তার প্রভাব এবং বাংলাদেশের সমাজকে কীভাবে বদলানো হবে সে বিষয়ে নিজস্ব ধারণাও ছিল।
তবে সংবিধানে সমাজতন্ত্র থাকলেও বাম রাজনীতির সব ধারা একই সমাজতন্ত্র বা একই রাজনৈতিক পথের পক্ষে ছিল না। ন্যাপ (মোজাফফর) ও কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের পক্ষে থেকে গণতান্ত্রিক ও গণআন্দোলন ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে চেয়েছিল। জাসদ ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’-এর কথা সামনে এনে রাষ্ট্র ক্ষমতার চরিত্র ও ক্ষমতার সামাজিক ভিত্তি পরিবর্তনের প্রশ্নকে আরও তীব্রভাবে সামনে আনে।
চীনপন্থী বামদের একটি অংশ ছিল আরও ভিন্ন অবস্থানে। তারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো, ভারতীয় প্রভাব এবং সংসদীয় রাজনীতির পথের সমালোচনা করে শ্রেণী শত্রু খতমের রাজনীতির দিকে যায়। কয়েকটি সংগঠন সশস্ত্র রাজনীতিতেও যুক্ত হয়।
জাতীয় পরিচয়, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা—এই তিনটি প্রশ্নের বিষয় আলাদা। কিন্তু তিনটির সঙ্গেই একটি মৌলিক বিষয় যুক্ত ছিল: স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র কী হবে এবং সেই রাষ্ট্র কোন পথে পরিচালিত হবে?
এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর সংবিধানে নীতিগত ভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সংবিধানের কোনো নীতি নিজে বাস্তবায়িত হয় না। তার বাস্তব অর্থ নির্ভর করে রাজনৈতিক দল, সংসদ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের ওপর।
এখানেই সংবিধানের পরবর্তী ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এসব নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং সেই ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর থাকবে?
কোনো সংবিধানেই একটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি আগাম লিখে রাখা সম্ভব নয়। সমাজ বদলায়, রাজনীতি বদলায়, নতুন সংকট তৈরি হয় এবং নতুন প্রশ্ন সামনে আসে। তাই সংবিধানকে কিছু জায়গা নীতিগত ভাবে উন্মুক্ত রাখতেই হয়।
তবে মূল নীতিগুলোর অর্থ যতটা সম্ভব পরিষ্কার থাকলে পরবর্তী বিতর্কের পরিসর কিছুটা নির্দিষ্ট করা যায়। জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ কী, সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় অর্থ কী, নাগরিক পরিচয় ও জাতিগত পরিচয়ের সম্পর্ক কোথায়—এসব বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা যত পরিষ্কার, রাজনৈতিক বিতর্কও তত বেশি নির্দিষ্ট হতে পারে।
তবু কোনো আইন বা সংবিধানই শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফল দেয় না। একটি বিধান যে উদ্দেশ্যে করা হয়, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার প্রয়োগ ভিন্ন ফল তৈরি করতে পারে। কোনো নীতি একদিকে একটি সমস্যা সমাধান করতে পারে, আবার অন্যদিকে নতুন সমস্যাও তৈরি করতে পারে। সংবিধানের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানও এর বাইরে নয়। এর কিছু নীতি যে উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়েছিল, পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেগুলোর প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা সব সময় একই ফল দেয়নি। কোথাও অস্পষ্টতা বিতর্ক তৈরি করেছে, কোথাও রাজনৈতিক প্রয়োগ সংবিধানের মূল উদ্দেশ্যকে নতুন অর্থ দিয়েছে, আবার কোথাও একটি বিধান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
তাই ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বুঝতে হলে শুধু কী লেখা হয়েছিল তা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে—কেন লেখা হয়েছিল, কী বোঝানো হয়েছিল, তখনকার রাজনৈতিক শক্তিগুলো সেটিকে কীভাবে দেখেছিল এবং পরে বাস্তব রাজনীতিতে তার ফল কী হয়েছিল।
একই কারণে সংবিধানের রাজনৈতিক অর্থও সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান নতুন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শের ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই ভিন্ন রাজনৈতিক অর্থ ধারণ করে। সামরিক শাসনের সময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান গণতান্ত্রিক বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে সামনে আসে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নির্বাচিত সংসদ ও সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে এর সম্পর্ক তৈরি হয়।
এখানে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কেউ একসময় ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্দিষ্ট আদর্শ বা কাঠামোর সমালোচনা করেছিল, তাদেরই কেউ পরে সেই সংবিধানকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে সামনে এনেছে। অর্থাৎ একটি সংবিধানের রাজনৈতিক অর্থ তার জন্মের সময়েই চূড়ান্ত হয়ে যায় না। সময়, রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে একই সাংবিধানিক দলিলের অর্থ ও ব্যবহারও বদলে যেতে পারে।
এই জায়গা থেকেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের পরবর্তী ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্রের পরিচয়, ধর্মের অবস্থান ও অর্থনৈতিক আদর্শের মতো বড় নীতিগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে। সেই ক্ষমতা কীভাবে সংগঠিত হলো, কোথায় কেন্দ্রীভূত হলো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারল—পরবর্তী আলোচনার বড় অংশ সেখানেই।