শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! চাকরি খুঁজতে এসে লাশ হয়ে ফেরা মরিয়ম “অপ্রতিমের হাতে আইফোন, অপরাধীর হাতে আইন কোথায়?” একবেলা ভাতের জন্য খুন: অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে  সমাজ ! হত্যার পর বিচার কোথায়: শিশু থেকে সংখ্যালঘু—আইনের শাসনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: এখনই সময় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর মেধা না বিশেষ সুবিধা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে? রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার? মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি রংপুরের চার খুন: গ্রেপ্তারের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায় সার্জিও গোরের কাশ্মীর মন্তব্য: মার্কিন নীতির পরিবর্তন, নাকি কৌশলী বার্তা?
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

চাকরি খুঁজতে এসে লাশ হয়ে ফেরা মরিয়ম

অপু সারোয়ার
Update : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। ফ্ল্যাটটি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের। পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠান। পরে মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালত তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। মামলার অভিযোগে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর আগে লেখা বলে একটি কথিত আত্মহত্যার চিঠিও উদ্ধার হয়েছে; সেটি তাঁর নিজের লেখা কি না, তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। ফলে পুরো ঘটনাটিই এখন তদন্তাধীন।

মামলার এজাহারে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের কথা পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মৃত্যুর দিন বিকেলে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবাকে দ্রুত ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে যেতে বলেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাঁর বাবা মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এই তথ্যগুলো একটি প্রশ্ন সামনে আনে—মরিয়মের মৃত্যুর আগের জীবনটি কেমন ছিল এবং তিনি কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মৃত্যুর শেষ কয়েক ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহে পাওয়া যাবে না। একজন মানুষের মৃত্যুর আইনি কারণ নির্ধারণ যেমন জরুরি, তেমনি সেই মৃত্যুর সামাজিক ও পারিবারিক পটভূমিও বোঝা দরকার। মানুষ কোনো শূন্যতার মধ্যে গিয়ে মৃত্যুর দিকে পৌঁছায় না; তার আগে থাকে সম্পর্ক, নির্ভরশীলতা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা, ভয়, অপমান কিংবা অসহায়তার নানা স্তর। মরিয়মের ক্ষেত্রেও তাই শুধু শেষ মুহূর্তটির দিকে তাকালে পুরো ছবিটি দেখা যাবে না। তাঁকে চাকরির প্রয়োজন কেন রাজধানীতে নিয়ে এল, সেই প্রয়োজন তাঁকে কার ওপর নির্ভরশীল করেছিল, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর কতটা ছিল এবং সংকটে পড়লে বেরিয়ে আসার নিরাপদ পথ তাঁর সামনে ছিল কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই মরিয়মের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়। একজন ১৯ বছরের তরুণী জীবিকার প্রয়োজনেই যদি এমন একটি অসম ক্ষমতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যেখানে একদিকে থাকে অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক প্রভাব, আর অন্যদিকে থাকে চাকরি ও নিরাপত্তার প্রয়োজন, তাহলে সেই সম্পর্কের ঝুঁকি শুধু ব্যক্তিগত থাকে না। সেখানে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং ক্ষমতার অসমতা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

চাকরি আমাদের দেশে শুধু আয় করার মাধ্যম নয়। দরিদ্র পরিবারের অনেক তরুণীর কাছে চাকরি মানে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ, পরিবারকে সাহায্য করার সুযোগ এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব সেই প্রয়োজনকেই অনেক সময় দুর্বলতায় পরিণত করে। তখন চাকরির প্রতিশ্রুতি, অর্থনৈতিক সহায়তা কিংবা নিরাপত্তার আশ্বাস একজন তরুণীকে এমন মানুষের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে, যার সঙ্গে তাঁর ক্ষমতার ভারসাম্য একেবারেই সমান নয়।

মরিয়মের ঘটনাকে তাই শুধু একটি পারিবারিক বিরোধ বা দাম্পত্য কলহ হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর দিকটি আড়ালে থেকে যাবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে এখানে প্রশ্ন উঠবে ক্ষমতার ব্যবহার, নির্যাতন এবং একজন তরুণীর দুর্বল অবস্থাকে কাজে লাগানোর। তবে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বলা যাবে না—তদন্ত ও বিচারই নির্ধারণ করবে আসলে কী ঘটেছিল।

এর পাশাপাশি মরিয়মের পরিবারের ভূমিকাও প্রশ্নের বাইরে রাখা যায় না। পরিবার তাঁর পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা জানত, তিনি নির্যাতনের কথা জানালে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তাঁর বিয়ে বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁর মা-বাবাকে ‘লোভী’ বলে দায়ী করা অনুচিত। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বা কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে।

তবে বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জীবনের সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে থাকে না। কখনো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার কথা বলে বিয়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, কখনো চাকরির আশায় কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়, আবার কখনো নির্যাতনের অভিযোগ জানালেও মেয়েটিকে বলা হয়—সংসার টিকিয়ে রাখো, একটু সহ্য করো। ফলে একজন নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা অনেক সময় পরিবারের সম্মান, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধার নিচে চাপা পড়ে যায়।

এই সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। নারীর নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ও। একটি তরুণী যেন চাকরির জন্য ব্যক্তিগত অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল না হন, সে জন্য স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রয়োজন। আর কোনো নারী নির্যাতনের অভিযোগ করলে তাঁকে এমন ব্যবস্থা দিতে হবে, যাতে অভিযোগ করার কারণে তিনি আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে না পড়েন।

মরিয়মের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশ্নটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তদের একজন জনপ্রতিনিধি। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তাঁকে অপরাধী প্রমাণ করে না, কিন্তু সেই পরিচয় তদন্তকে প্রভাবিত করার সুযোগও থাকা উচিত নয়। সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যেমন প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়, একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও একই মানদণ্ডে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতা যেন বিচারপ্রক্রিয়ার ঢাল না হয়, আবার অভিযোগও যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আগাম রায়ে পরিণত না হয়।

মরিয়মের মৃত্যুর আগে তাঁর লেখা বলে কথিত চিঠি, তাঁর পরিবারের কাছে করা অভিযোগ, মুঠোফোন ও বৈদ্যুতিন যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রমাণ, মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা হয়ে থাকলেও কেন তিনি সেই অবস্থায় পৌঁছালেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে তার পেছনে থাকা নির্যাতন, চাপ কিংবা সামাজিক ব্যর্থতার অনেকটাই অদৃশ্য হয়ে যায়।

মরিয়মের মৃত্যু তাই আমাদের সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে। একজন তরুণীর জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা আছে? নারীরা নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীনভাবে নিতে পারেন? পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে মেয়েদের জীবন কি কখনো সেই সংকটের বোঝা হয়ে যায়? আর ক্ষমতাবান মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু মরিয়মের জন্য নয়, তাঁর মতো আরও অসংখ্য তরুণীর ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন।

মরিয়ম চাকরি খুঁজতে এসেছিলেন। তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা অপরাধ ছিল না। তিনি নিরাপদ জীবন চেয়েছিলেন—এটিও অপরাধ নয়। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে তাঁর প্রয়োজনকে কেউ ব্যবহার করেছে, তাঁকে নির্যাতন করেছে কিংবা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাহলে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; দেখতে হবে কোন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দিয়েছে।

একটি ১৯ বছরের মেয়ে চাকরির সন্ধানে রাজধানীতে এসে লাশ হয়ে ফিরবেন—এটি কোনো স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা হতে পারে না। তাই মরিয়মের মৃত্যুকে আরেকটি সংবাদ, আরেকটি মামলা কিংবা কয়েক দিনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাব বা গাফিলতি থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মরিয়মের লাশের সঙ্গে যেন সত্যেরও দাফন না হয়। কার দায়ে, কীভাবে এবং কেন একটি ১৯ বছরের মেয়ের জীবন থেমে গেল—তার জবাব শুধু আদালত নয়, রাষ্ট্র ও সমাজকেও দিতে হবে।

 


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!