শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! ১৫ আগস্ট: শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ড বিজ্ঞানের নামে দাবি, ধর্মের নামে ঢাল: গণমাধ্যমের দায়িত্ব কোথায়? সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে? ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ? শেখ হাসিনার শাসনের অবসান: গণঅভ্যুত্থান নাকি সামরিক হস্তক্ষেপ? দিল্লির মঞ্চে হাসিনা, ঢাকার ক্রোধ জুলাই ২৪ অভ্যুত্থান : শেখ হাসিনার পতন ও কালার রেভল্যুশনের প্রশ্ন চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি — ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৫০ অপরাহ্ন

১৫ আগস্ট: শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ড

অপু সারোয়ার
Update : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

১৫ আগস্ট ১৯৭৫

১৫ আগস্ট ২০২৬—শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম প্রয়াণ দিবস। শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রধান নেতা। পাকিস্তানের প্রায় সিকি শতাব্দীর শাসনকালে তিনি বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও শেখ মুজিবুর রহমান অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয় সহ মোট ২৬ জন সেদিন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ আগস্ট তাই এক গভীর বেদনাদায়ক ও কলঙ্কিত অধ্যায়। সে সময় তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে রক্ষা পান। ১৫ আগস্টের ঘটনাকে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে এর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে থেকে যায়। শেখ মুজিবের শাসনের ব্যর্থতা, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সংকুচিত করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা অবশ্যই করা দরকার। কিন্তু সেই সমালোচনা কখনোই তাঁকে হত্যার রাজনৈতিক বা নৈতিক বৈধতা তৈরি করে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এক বিষয় নয়।

বাকশাল 

শেখ মুজিবের শাসনামলে বাকশাল প্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়ন এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটও সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এসব ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় শেখ মুজিব ও তাঁর সরকারের। কিন্তু একটি সরকারের ব্যর্থতার বিচার হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাচন, গণআন্দোলন ও আইনের মাধ্যমে—বন্দুকের মাধ্যমে নয়।

বাকশালকে শুধু শেখ মুজিবের স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে সমাজতন্ত্রের দিকে যাওয়ার একটি সোভিয়েত-ঘরানার পথ। দক্ষিণ ইয়েমেন, মোজাম্বিকসহ কয়েকটি দেশে এ ধরনের রাষ্ট্রনির্ভর সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের চেষ্টা হয়েছিল। চীন এই কেন্দ্রীভূত সোভিয়েত মডেলের বিরোধী ছিল। কিউবার অভিজ্ঞতাও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি ভিন্ন পথ। অন্যদিকে চিলিতে সালভাদর আলেন্দে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন; সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর সরকার উৎখাত হয় এবং তিনি নিহত হন। বাংলাদেশে বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগেই দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক হানাহানি ও রাষ্ট্র-সমাজে দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব এত গভীর হয়ে উঠেছিল যে নতুন মডেলটির রাজনৈতিক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ খুব কম ছিল। বাকশালে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সিপিবি ও ন্যাপও অংশ নিয়েছিল। ফলে বাকশালকে স্রেফ প্রচলিত অর্থে ‘একদলীয় শাসন’ বলা কিছুটা সরলীকরণ। তবে বহুদলীয় রাজনীতি বন্ধ করে একটি জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার কারণে রাজনৈতিক আলোচনায় বাকশাল মূলত একদলীয় শাসন হিসেবেই থেকে গেছে।

মুজিব হত্যার পর

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ক্ষমতায় বসেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন। শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর মোশতাকের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর বেদনাদায়ক ও কঠিন প্রশ্নের জন্ম দেয়। যে নেতার নেতৃত্বে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং যে দলের পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁর হত্যার পর এত দ্রুত নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে সমঝোতা করা রাজনৈতিক আনুগত্য ও আদর্শের বড় সংকটকে সামনে আনে।

মোশতাকের ৮১ দিনের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রায় ২১ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাঁর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক বাস্তবতার যুক্তি দিয়ে এই অবস্থানের সাফাই গাওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় সুবিধাবাদের এই ব্যাখ্যা নৈতিক প্রশ্নকে মুছে দিতে পারে না। একজন রাজনৈতিক নেতাকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সহকর্মীদের একটি বড় অংশ যখন দ্রুত নতুন ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করেন, তখন তাঁদের রাজনৈতিক আনুগত্য ও আদর্শের প্রশ্নটি সামনে আসবেই।

তবে সবাই একই পথ নেননি। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী—মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলাতে এবং তাঁর সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এই চার জাতীয় নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই দুই বিপরীত অবস্থান ১৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনীতির একটি কঠিন সত্য সামনে আনে: **কেউ ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন, কেউ জীবন দিয়ে আপস না করার মূল্য দিয়েছিলেন।** তাই ১৫ আগস্টের ইতিহাস শুধু হত্যাকারীদের বিচার নয়; হত্যার পর কে কী অবস্থান নিয়েছিলেন, সেই রাজনৈতিক দায়েরও নির্মোহ মূল্যায়ন দাবি করে।

ইন্ডেমনিটি: হত্যার পর আইনের দেয়াল

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলোর একটি হলো **Indemnity Ordinance, 1975**। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়ার পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ হত্যার পর রাষ্ট্রই হত্যাকারীদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়। এটি শুধু একটি আইন বাতিল বা বহাল রাখার প্রশ্ন নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির: ” রাষ্ট্র কি হত্যার বিচার করবে, নাকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থে হত্যাকারীদের বিচার থেকে রক্ষা করবে? ”

১৯৯৬ সালে **The Indemnity (Repeal) Act, 1996** পাস করে ১৯৭৫ সালের Indemnity Ordinance বাতিল করা হয়। পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনামলের বিভিন্ন অধ্যাদেশ ও কার্যক্রমকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তার বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়। কথা তাই স্পষ্ট: শেখ মুজিবের শাসন যতই খারাপ হোক, তাঁর হত্যাকারীদের বিচার থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অধিকার কোনো সরকারের নেই। ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক নেতা অপশাসন করলেও তাঁর হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কোনো Indemnity আইন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মুজিব হত্যার পর স্বীকৃতি: মুসলিম বিশ্বের নৈতিক প্রশ্ন

১৫ আগস্টের পর আন্তর্জাতিক কূটনীতির ঘটনাবলিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি আরব স্বাধীনতার পর কয়েক বছর বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের আগস্টেই সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। চীনও ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতি মানেই হত্যার সরাসরি সমর্থন—এমন সিদ্ধান্ত অবশ্যই অতিসরলীকরণ। রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়: “একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার পর নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে দ্রুত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন কি সেই ক্ষমতা পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ভূমিকা রাখেনি?”

এই প্রশ্ন মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বের বহু রাষ্ট্র ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব, কাশ্মীরের প্রশ্নে অবস্থান নেয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কথা বলে। কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক পরিসরে জাতিগত নিপীড়ন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তাদের অবস্থান অনেক সময় ভিন্ন। কুর্দিস্তান, বেলুচিস্তান কিংবা পশতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রশ্নে মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর নীরবতা বা দ্বৈত অবস্থান তাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ” অন্যের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে নৈতিক ভাষণ, কিন্তু নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে নীরবতা—এই দ্বৈত মানদণ্ডই সমস্যার মূল। ”

বাংলাদেশের ১৫ আগস্টকেও এই নৈতিক প্রশ্নের আলোকে দেখা দরকার। ফিলিস্তিনে জনগণের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলা যদি ন্যায়বিচারের দাবি হয়, তবে একটি স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যা করে ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ভুক্তভোগী কোন ধর্মের, কোন জাতির বা কোন দেশের—তার ওপর নীতির পরিবর্তন হতে পারে না। তবে ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক নয়। সৌদি আরব বা অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল বলেই তারা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সমর্থক ছিল—এমন সিদ্ধান্তের জন্য আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর নতুন ক্ষমতাকাঠামোকে দ্রুত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া যে তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বাভাবিকীকরণে সাহায্য করেছিল, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

বাম রাজনীতির ব্যর্থতা

১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অবস্থানও নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জাসদ, চীনপন্থী বিভিন্ন বাম সংগঠন এবং অন্যান্য সরকারবিরোধী শক্তি শেখ মুজিবের শাসনের তীব্র সমালোচনা করেছিল। কিন্তু তাঁর পতনের পর তারা কোনো কার্যকর, গণভিত্তিক ও সুসংগঠিত বিকল্প রাষ্ট্রনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। এটি বাংলাদেশের বাম রাজনীতির একটি ঐতিহাসিক ব্যর্থতা। শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি করা আর সেই ক্ষোভকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকল্পে রূপান্তর করা এক জিনিস নয়। ১৯৭৫-এর সংকট দেখিয়েছে, সুস্পষ্ট কর্মসূচি, শক্তিশালী গণভিত্তি এবং সংগঠিত নেতৃত্ব ছাড়া বিপ্লবী ভাষ্য বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় না।

১৫ আগস্টের ইতিহাস তাই কয়েকটি বিষয়কে আলাদা করে দেখতে শেখায়। শেখ মুজিবের শাসনের ব্যর্থতার বিচার হতে হবে নির্মোহভাবে। সেই ব্যর্থতা কোনোভাবেই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না। একই সঙ্গে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি এবং হত্যার পর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকাঠামোকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়াকেও প্রশ্ন করতে হবে। ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে শেখ মুজিবকে দেবতা বানানো নয়; আবার তাঁর হত্যাকে রাজনৈতিক রোমান্টিকতার আবরণে বৈধতা দেওয়াও নয়। তাঁর শাসনের ভুলের সমালোচনা করতে হবে, কর্তৃত্ববাদের হিসাব নিতে হবে, কিন্তু বলতে হবে—” রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক হত্যা কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়।”

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো জনগণের গণঅভ্যুত্থান ছিল না। শেখ মুজিব বা পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক আন্দোলনকে এক করে দেখা যায় না। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সামরিক শক্তির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। একই সঙ্গে এর পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রশ্নও ইতিহাসে উত্থাপিত হয়েছে; এসব প্রশ্নের নির্মোহ অনুসন্ধান প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত শিক্ষা একটাই: ” অপশাসনের জবাব হত্যা নয়; জবাব জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং আইনের শাসন। হত্যা ও রাজনৈতিক বিপ্লব এক জিনিস নয়।” যে রাষ্ট্র হত্যার বিচার বন্ধ করে, সে শুধু একটি হত্যার বিচার অস্বীকার করে না—নিজের আইনের শাসনের ভিত্তিকেও দুর্বল করে।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!