শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি রংপুরের চার খুন: গ্রেপ্তারের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায় সার্জিও গোরের কাশ্মীর মন্তব্য: মার্কিন নীতির পরিবর্তন, নাকি কৌশলী বার্তা? গোলাপি বাস, হিজাব ও নারীর স্বাধীনতার চেকপোস্ট জাতিসংঘের রিপোর্ট: বাংলাদেশের উগ্রবাদ সংকট ১৫ আগস্ট: শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ড বিজ্ঞানের নামে দাবি, ধর্মের নামে ঢাল: গণমাধ্যমের দায়িত্ব কোথায়? সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু :শ্রমিকের জীবন, শিল্পের মুনাফা ফরহাদ মজহারের বক্তব্য: জুলাইয়ের ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে হবে? ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ?
রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি

অপু সারোয়ার
Update : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

[ সম্পাদনাগত নোট: বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়টি এখন অত্যন্ত চলমান। Reuters-এর ২৫ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে এবং যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের non-alignment নীতিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে। ]

মক্কা প্যাক্টকে শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। এটি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন ইরান–আমেরিকা সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে, তুরস্ক নিজের সামরিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তান ভারত ও আফগানিস্তানকে ঘিরে একাধিক নিরাপত্তা সংকটে আবদ্ধ। ফলে মক্কা প্যাক্ট কেবল একটি সামরিক সমঝোতা নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ারও একটি প্রচেষ্টা।

চুক্তির নামটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘মক্কা’ মুসলিম জনগণের কাছে কেবল একটি শহরের নাম নয়; এটি ধর্মীয় আবেগ, পবিত্রতা ও ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রতীক। সেই নামকে একটি সামরিক জোটের পরিচয়ে ব্যবহার করার ফলে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সহজেই ‘মুসলিম বিশ্বের ঐক্য’ হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পায়। কিন্তু ধর্মীয় আবেগ আর রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এক জিনিস নয়। একটি জোটের প্রকৃতি নির্ধারিত হয় তার সামরিক অঙ্গীকার, কৌশলগত স্বার্থ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের দায় দিয়ে—তার নামের পবিত্রতা দিয়ে নয়।

বরং মক্কা প্যাক্টের সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই: মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমানোর বদলে এটি সেই বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত—সবাই মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্র; কিন্তু তাদের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি এক নয়। সৌদি আরব ও ইরানের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সৌদি আরব ও আমিরাতের আঞ্চলিক নেতৃত্বের টানাপোড়েন, তুরস্কের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পাকিস্তানের ভারতকেন্দ্রিক নিরাপত্তা হিসাব—এসব বাস্তবতাকে ‘মুসলিম ঐক্য’ শব্দটি মুছে দিতে পারে না।

সুদানের যুদ্ধ এই বিভাজনের নির্মম উদাহরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে Rapid Support Forces (RSF)-কে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে, যা আবুধাবি অস্বীকার করে। অন্যদিকে তুরস্কের বিরুদ্ধে Sudanese Armed Forces (SAF)-কে ড্রোন ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা আঙ্কারাও অস্বীকার করেছে। অভিযোগ সত্য-মিথ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: সুদানের গৃহযুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। একই মুসলিম বিশ্বের দুই রাষ্ট্র ভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একই দেশের যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করছে। ‘মুসলিম ঐক্য’র বাস্তব চিত্র এর চেয়ে পরিষ্কার আর কী হতে পারে?

ইয়েমেন তার চেয়েও ভয়াবহ উদাহরণ। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের পর এক দশক ধরে ইয়েমেনের জনগণ যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক বিপর্যয়ের ভার বহন করেছে। যুদ্ধের পক্ষগুলো নিজেদের নিরাপত্তা, ধর্ম, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার যুক্তি দিয়েছে; কিন্তু সেই যুক্তির সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে সাধারণ মানুষ। একটি মুসলিম দেশের ওপর আরেক মুসলিম দেশের সামরিক শক্তি প্রয়োগের এই ইতিহাস মক্কা প্যাক্টের আলোচনায় উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

ধর্মের ভিত্তিতে সামরিক জোটের বিপদ এখানেই। একটি রাষ্ট্র যখন নিজেকে ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে বৃহত্তর সামরিক জোটের অংশ করে, তখন প্রতিপক্ষকেও সহজেই ধর্মীয় ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা যায়। ‘অদৃশ্য শত্রু’, ‘ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’, ‘মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা’—এই ধরনের স্লোগান জনগণকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারে। বিশেষত যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত এবং সরকারের ওপর কার্যকর জবাবদিহি নেই, সেখানে নিরাপত্তার নামে ভয় তৈরি করা এবং সেই ভয়কে যুদ্ধের রাজনৈতিক অনুমোদনে পরিণত করা কঠিন নয়।

এখানে NATO-র ইতিহাসের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। NATO-ও একটি সামরিক জোট; এর জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট সম্প্রসারণকে ঠেকানোর পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে। কিন্তু জোট থাকা মানেই তার প্রত্যেক সদস্য প্রতিটি যুদ্ধে অংশ নেবে—এমন নয়। ২০২৬ সালের ইরান–আমেরিকা সংঘাতেও NATO নিজে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ একটি সামরিক জোটের সদস্য হওয়া এবং প্রতিটি সামরিক সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে নেমে পড়া এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি মক্কা প্যাক্টের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর দাঁড়ানো সামরিক জোটের রাজনৈতিক ব্যবহার আলাদা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ এখানে যুদ্ধকে শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে নয়, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবেও হাজির করার সুযোগ থাকে। তখন যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানে সহজেই ‘নিজের পক্ষের বিরুদ্ধে’ দাঁড়ানো হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আর এর প্রথম শিকার হতে পারে সেই জনগণ, যাদের নামে যুদ্ধ করা হচ্ছে।

ইরান–আমেরিকা যুদ্ধের অভিঘাত এবং উপসাগরীয় শক্তির পুনর্বিন্যাসের পটভূমিতে ভারত–আমিরাত প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতাকেও দেখা দরকার। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে সৌদি আরব ও আমিরাতের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—ইয়েমেন, বন্দর ও বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং ইরান-নীতির পার্থক্য—যোগ করলে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা সমীকরণটি আরও স্পষ্ট হয়। এই কারণে ভারত–আমিরাত প্রতিরক্ষা সমঝোতাকে মক্কা প্যাক্টের সরাসরি ‘প্রতিক্রিয়া’ বলা হয়তো কিছুটা সরলীকরণ হবে; কারণ দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু মক্কা প্যাক্ট যে এই বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন সামরিক মাত্রা দিয়েছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। একদিকে সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্কের নিরাপত্তা অক্ষ, অন্যদিকে ভারত–আমিরাতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সমন্বয়—মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা এখন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির শক্তি কোনো সামরিক জোটে নয়, তার কৌশলগত স্বাধীনতায়। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে। তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য সামরিক বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করতে হবে—এমন কোনো যুক্তি নেই। রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব এবং রাষ্ট্রের সামরিক দায় এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ সৌদি আরবের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু সৌদি আরবের প্রতিটি সামরিক সংঘাতের পক্ষ হতে পারে না। তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারে, কিন্তু তুরস্কের প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের অংশীদার হওয়ার প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানের ভারতবিরোধী নিরাপত্তা হিসাব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির হিসাব হয়ে উঠতে পারে না।

এখানেই দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং collective defence alliance-এর মৌলিক পার্থক্য।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিটি বিষয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু কোনো collective defence alliance-এ প্রবেশ করলে সেই স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়। আজ যে সংঘাত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কহীন, কাল সেটিই চুক্তির কোনো ধারার কারণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দায় হয়ে উঠতে পারে। আজ যে যুদ্ধকে ঢাকা ‘অন্যের যুদ্ধ’ বলে এড়িয়ে যেতে পারে, কাল সেই যুদ্ধের পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য তার ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে এই ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

পাকিস্তান ও ভারতের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য কোনো দূরের যুদ্ধ নয়। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহন—দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অসংখ্য বাস্তব স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সেই বাস্তবতায় পাকিস্তানকেন্দ্রিক কোনো collective defence কাঠামোর অংশ হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর একটি নতুন নিরাপত্তা-ছায়া তৈরি করা। বর্তমান চুক্তির ভিত্তিতে অবশ্য বলা যায় না যে বাংলাদেশ সদস্য হলেই ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের দিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: একটি সামরিক জোটে ঢোকার পর বাংলাদেশ কি আগের মতো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বলতে পারবে—‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়’?

আরেকটি সম্ভাব্য সংকট পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা, সীমান্ত ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। ভবিষ্যতে এই সংঘাত বড় আকার নিলে পাকিস্তানের মিত্রদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। তখন collective defence-এর প্রতিশ্রুতি কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সেটিই হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ কেন এমন একটি সামরিক কাঠামোয় প্রবেশ করবে, যার ভবিষ্যৎ সদস্য হিসেবে তাকে এমন সংঘাতের রাজনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলা করতে হতে পারে, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি সম্পর্ক নেই?

মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন।

বাংলাদেশের বিপুল শ্রমশক্তি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করে। সেখানে যুদ্ধ হলে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে, কর্মী ফেরত পাঠানো হতে পারে, নতুন নিয়োগ বন্ধ হতে পারে, রেমিট্যান্স কমতে পারে, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। রিয়াদে যে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে, তার অভিঘাত ঢাকার একটি শ্রমজীবী পরিবারের রান্নাঘরেও পৌঁছাতে পারে। এটাই বাংলাদেশের বাস্তব নিরাপত্তা।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা হয়তো সীমান্ত ও তেলক্ষেত্র রক্ষা। তুরস্কের নিরাপত্তা হয়তো সামরিক প্রভাব ও কৌশলগত গভীরতা। পাকিস্তানের নিরাপত্তা হয়তো ভারত ও আফগানিস্তানকে ঘিরে সামরিক হিসাব। বাংলাদেশের নিরাপত্তা অনেক বেশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা—শ্রমিকের চাকরি, অভিবাসীর জীবন, রেমিট্যান্স, খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ, রপ্তানি বাজার এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক। তাই বাংলাদেশের জন্য মক্কা প্যাক্টের প্রশ্নটি ধর্মীয় আবেগের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের দরকার যুদ্ধের জোট নয়, কূটনীতির জোট।

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বন্ধুত্বের সঙ্গে যুদ্ধের দায় বাঁধা থাকবে না। সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সহযোগিতার সঙ্গে অন্ধ আনুগত্য থাকবে না। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু অন্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের সৈনিকের কাঁধে চাপবে না। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হওয়া উচিত। কিন্তু ‘মুসলিম ঐক্য’কে সামরিক জোটে রূপান্তর করার প্রয়োজন নেই। কারণ মুসলিম দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থ এক নয়। সৌদি আরবের স্বার্থ ও ইরানের স্বার্থ এক নয়; তুরস্কের স্বার্থ ও পাকিস্তানের স্বার্থও সব ক্ষেত্রে এক নয়। তাহলে বাংলাদেশের স্বার্থ কেন তাদের প্রত্যেকটির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক হয়ে যাবে?

মুসলিম জনগণের কাছে মক্কার নাম পবিত্র। কিন্তু সেই পবিত্রতা রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থকে মুছে দিতে পারে না।

বরং বাংলাদেশের উচিত এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা, যেখানে ঢাকা সবার সঙ্গে কথা বলবে, কারও সঙ্গে অকারণে শত্রুতা করবে না, কিন্তু কোনো শক্তির সামরিক ছায়াতেও নিজেকে সমর্পণ করবে না। ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সেনাবাহিনীর আকার নয়—তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। কৌশলগত স্বাধীনতা হারালে বন্ধুত্বও একসময় দায় হয়ে যায়। মক্কা প্যাক্টের সামনে বাংলাদেশের তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোনো জোটে আমরা কতটা শক্তিশালী হব, তা নয়; বরং সেই জোটের যুদ্ধ আমাদের ঘাড়ে কতটা চাপবে। কারণ অন্যের যুদ্ধের মিত্র হওয়া সহজ। যুদ্ধের মূল্য দেওয়া কঠিন। আর সেই মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!