শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ তসলিমার নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির দুই প্রান্তে একই ভোটের সমীকরণ কাঁটাতারের বেড়া: নিরাপত্তা, না কি রাজনীতির দেয়াল? আজাদ কাশ্মীর: রাষ্ট্রের ছায়ায় গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং প্রবাসীদের অংশগ্রহণ একটি রিল, বহু প্রশ্ন: আক্রমণের মুখে নারী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা  বাংলাদেশের আয়নায় ভারতকে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত? প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: শেষ নয়, শুরু ৪৫ বছর পর মেজর মোজাফফর: সত্য উদ্ঘাটনের সুযোগ, নাকি নতুন বিভ্রান্তি ? ভারতের ছাত্র আন্দোলনের বার্তা: দমন-পীড়ন নয় এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্ন
সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৫ পূর্বাহ্ন

লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ

যমুনা রহমান
Update : রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬

[ তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ২৫ আগস্ট ১৯৬২) বাংলাদেশের একজন লেখক ও সাবেক চিকিৎসক। তিনি ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। আশির দশকে  সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশের পর তিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ ও কলাম লেখার মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর লেখায় নারীর অধিকার, লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, নাস্তিক্যবাদ এবং ধর্মের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি স্থান পেয়েছে। এসব কারণে তিনি তীব্র বিতর্ক ও বিরোধিতার মুখে পড়েন এবং ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। এরপর ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে বসবাস করেন। বর্তমানে তিনি ভারতের দিল্লিতে বসবাস করছেন।

বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে তসলিমা নাসরিন একটি আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। তিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা ও কলামে নারী অধিকার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজের প্রচলিত নানা অন্যায় ও কুসংস্কারকে প্রশ্ন করা। এ কারণে তিনি যেমন অনেক পাঠকের সমর্থন পেয়েছেন, তেমনি তীব্র বিরোধিতারও মুখে পড়েছেন। তসলিমা নাসরিনের সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস “লজ্জা”। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভয়ভীতি ও নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাস লেখা হয়। উপন্যাসে একটি হিন্দু পরিবারের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মানবিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। বইটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। কেউ এটিকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ অভিযোগ করেছেন যে এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। ] 

“লজ্জা” ছাড়াও তসলিমা নাসরিনের “উত্তাল হাওয়া”, “ফরাসি প্রেমিক”, “শোধ”, “ক” এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থগুলোর বিভিন্ন খণ্ডে নারী-পুরুষের অসমতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, যৌনতা, পারিবারিক নিপীড়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর অনেক লেখায় সমাজের প্রচলিত প্রথা ও ক্ষমতাকাঠামোর সমালোচনা রয়েছে। এসব কারণে তাঁর বই বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে বা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে তসলিমা নাসরিনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ করে এবং তাঁর বিচার ও শাস্তির দাবি জানায়। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা সংকটের মুখে তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন এবং পরে বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। এরপর থেকে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

তসলিমা নাসরিনকে দেশত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাটি আজও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় অনুভূতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। একদিকে অনেকের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে, অনেকেই মনে করেন, লেখালেখির ক্ষেত্রেও সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই একটি পরিণত সমাজের চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রদায়িকতা কোনো একক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সমস্যা নয়; এটি মানুষের সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি। মতের অমিল থাকলে তার জবাব হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে, সহিংসতা বা নিপীড়নের মাধ্যমে নয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা—দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষাই তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিতর্ক থেকে আমাদের নেওয়া উচিত।

তসলিমা নাসরিনকে কেন্দ্র করে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন তাঁর পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ বাংলাদেশে খুব সীমিত ছিল। কিছু লেখক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকারকর্মী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সতর্ক কণ্ঠে বক্তব্য দিলেও, বৃহত্তর পরিসরে সংগঠিত প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। অনেকেই সামাজিক প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক চাপ বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকাকেও নতুন করে আলোচনার সামনে নিয়ে আসে। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে অনেকেই নীরবতা বেছে নিয়েছিলেন।

এ সময় “লজ্জা” উপন্যাসকে ঘিরে আলোচনায়ও একটি প্রবণতা দেখা যায়। অনেক বিতর্ক বইটির মূল বক্তব্য—বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন—নিয়ে না হয়ে, ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ফলে উপন্যাসের উত্থাপিত সামাজিক প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। একই সঙ্গে ভারতবিরোধী আবেগ ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি জনপরিসরের আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

সে সময় বামপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। সীমিত সাংগঠনিক শক্তি, নিরাপত্তাহীনতা এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে তারা বড় আকারে রাজপথে অবস্থান নিতে পারেনি। তসলিমা নাসরিনবিরোধী মিছিলগুলোতে শুধু তাঁর বিরুদ্ধেই নয়, নাস্তিক, মুরতাদ এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেওয়া হতো বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও সমসাময়িক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফলে আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল একজন লেখককে ঘিরে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা অনেক ক্ষেত্রেই বৃহত্তর মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধেও প্রতিফলিত হয়েছিল।

একই ধরনের পরিস্থিতি সালমান রুশদিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের সময়ও দেখা যায়। তাঁর The Satanic Verses-এর বিরোধিতাকে ঘিরে বাংলাদেশেও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে বামপন্থী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক স্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল। সে সময় ঢাকার রাজপথে “বাংলার রুশদিদের আস্তানা তোপখানা উড়িয়ে দাও”—এ ধরনের স্লোগানও শোনা যায়। তোপখানা এলাকায় বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের কার্যালয় থাকায় এই স্লোগান রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করেছিল। এসব ঘটনা দেখায় যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ঘিরে সংঘাতের সময় প্রায়ই লেখক, বুদ্ধিজীবী, বামপন্থী কর্মী এবং অন্যান্য মুক্তচিন্তার মানুষ একই সঙ্গে হুমকি ও আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন।

গণতান্ত্রিক সমাজে মতের বিরোধিতা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিরোধিতা যদি ভয়, সহিংসতার হুমকি বা সামাজিক বহিষ্কারের পরিবেশ সৃষ্টি করে, তবে তা কেবল একজন লেখকের স্বাধীনতাকেই নয়, সমগ্র সমাজের মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেও সংকুচিত করে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে শুধু কোনো একটি মতের সুরক্ষা নয়; বরং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে সবার জন্য নিশ্চিত করা।

 

 


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!