সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাশাসক জিয়াউর রহমান হত্যা এবং ১৯৮১ সালের সেনা বিদ্রোহ মামলার পলাতক অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনকে ১৬ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে। চার দশকেরও বেশি সময় পর এই গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর থেকে সরকারি বক্তব্য, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং বিভিন্ন ব্যাখ্যা যত সামনে আসছে, ততই নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে অতীতের আলোচিত কোনো ঘটনার আসামি গ্রেপ্তার হলেই প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই নানা ব্যাখ্যা, দাবি ও পাল্টা দাবি সামনে আসে। অনেক সময় এসব বক্তব্যের উদ্দেশ্য হয় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা আড়াল করা, আবার কখনো দ্রুত একটি “দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ” নিশ্চিত করার জনমত তৈরি করা। কিন্তু ইতিহাস বলে, **দৃষ্টান্তমূলক বিচারের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং নিয়মতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা সব সময় এক জিনিস নয়।** বিচার দ্রুত হতে পারে, কিন্তু তার আগে আইনগত ভিত্তি সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, মেজর মোজাফফর দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় তাঁর বিচার হয়নি; তবে অন্য আসামিদের বিচারের রায়ে তাঁর বিষয়ে কিছু **”পর্যবেক্ষণ”** রয়েছে। যদি সত্যিই তাঁর বিচার না হয়ে থাকে, তাহলে ৪৫ বছর ধরে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত অবস্থান কী ছিল? গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বহাল ছিল? যদি থাকে, তবে তা কার্যকর হলো না কেন? আর যদি বিচারই শুরু না হয়ে থাকে, তাহলে আজ যে সামরিক বিচারের কথা বলা হচ্ছে, তার আইনগত ভিত্তি কী? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর রাষ্ট্রের কাছ থেকেই আসা উচিত।
মোজাফফরকে ঘিরে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনাও একমুখী নয়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস অভিযানে মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আবার সার্কিট হাউসে ফিরে যান, জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও ডায়েরি খোঁজা হয় এবং পরে বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের বৈঠকেও অংশ নেন। তবে এসব তথ্য কখনো বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; এগুলো প্রকাশিত ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই বিবেচ্য।
মোজাফফরের পলাতক জীবন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিবরণ পাওয়া যায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা *এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক* বইয়ে। পরে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ *দ্য ডেইলি স্টার*-এ একটি নিবন্ধ লিখলেও সেটি মূলত ওই স্মৃতিকথার ইংরেজি অনুবাদের ওপর ভিত্তি করেই রচিত। অর্থাৎ তথ্যের মূল উৎস শেষ পর্যন্ত মইনুল হোসেন চৌধুরীর নিজের বক্তব্য। মইনুলের দাবি, থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি ব্যাংককে পলাতক মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের ভাষ্য ছিল, উদ্দেশ্য ছিল জিয়াউর রহমানকে হত্যা নয়, বরং সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই দাবি দুই পলাতক আসামির বক্তব্য মাত্র; এটি কখনো আদালতে যাচাই হয়নি।
বরং মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথাই আরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে। তিনি লিখেছেন, বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁর বই নীরব। একজন কর্মরত রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি থাই কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন কি না, পলাতক দুই কর্মকর্তার গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা তাঁরা কোন পাসপোর্টে ও কী পরিচয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করছিলেন—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও অনুল্লেখিত। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো ছোট প্রশ্ন মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হত্যার মতো একটি ঘটনার তদন্তে এমন তথ্যই অনেক সময় সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র হয়ে ওঠে। ফলে স্মৃতিকথাটি যেমন কিছু তথ্য দেয়, তেমনি কিছু নীরবতাও রেখে যায়।
আরও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। বিএনপি ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬—দুই দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটনে নতুন কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বা প্রকাশ্য অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়নি। যে হত্যাকাণ্ডকে দলটি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে তুলে ধরে, সেই ঘটনার পূর্ণ সত্য অনুসন্ধানে এই অনীহাও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
অন্যদিকে সাবেক সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তাঁর *দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১–র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান* বইয়ে লিখেছেন, জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও পরে তাঁকে পুলিশি হেফাজত থেকে সেনাবাহিনীর কাছে নেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি নিহত হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন ও সামরিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও বিচার বিভাগীয় কমিশনের প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ করা হয়নি। সামরিক আদালতে কয়েকজন কর্মকর্তার বিচার সম্পন্ন হলেও হত্যার পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং ঘটনার পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট আজও রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
জেনারেল মঞ্জুর হত্যার বিচারও শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ পরিণতি পায়নি। ফলে ১৯৮১ সালের দুটি কেন্দ্রীয় ঘটনা—জিয়াউর রহমান হত্যা এবং জেনারেল মঞ্জুর হত্যা—আজও ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি ১৯৮১ সালের ঘটনার জীবিত অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম। তাঁর বক্তব্য হয়তো দীর্ঘদিনের বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু যদি এই সুযোগটি সত্য উদ্ঘাটনের বদলে কেবল নতুন মামলা, নতুন ব্যাখ্যা এবং পুরোনো অসঙ্গতি আড়াল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ইতিহাসের জট আরও বাড়বে, কমবে না। রাষ্ট্রের কাছে আজ সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটিই—*বিচার শুধু হোক তা নয়, বিচার যেন সত্য উদ্ঘাটনের পথও খুলে দেয়। কারণ ইতিহাসের অসমাপ্ত প্রশ্নকে নতুন বিতর্ক দিয়ে ঢেকে রাখা যায়; কিন্তু তার সমাধান করা যায় না।*
জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার সামরিক বিচারে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু থেকেই বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিচারটি সম্পূর্ণ সামরিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়ায় কার্যক্রম জনসমক্ষে উন্মুক্ত ছিল না। পূর্ণাঙ্গ রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশদ বিবরণ এবং আদালতের যুক্তিও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত দায়, নির্দেশদাতাদের ভূমিকা এবং আদালতের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত থেকে যায়।
একই সঙ্গে জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনও কখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সামরিক আদালতের রায় কার্যকর হলেও হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ তৈরি হয়নি। বরং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, তদন্তের পরিধি এবং প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মধ্যে এ কথাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত যে, তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ জিয়া হত্যা-পরবর্তী বিচার ও সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনকে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি সুসংহত করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে এবং এ দাবির পক্ষে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নেই। তবু এই বিতর্কই দেখায় যে, ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহ এখনো ইতিহাসের নিষ্পত্তিকৃত অধ্যায় নয়।
এই প্রেক্ষাপটে মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার নতুন তাৎপর্য বহন করে। কারণ, তিনি যদি সত্যিই ওই মামলায় বিচারের মুখোমুখি হন, তাহলে প্রশ্নটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চার দশকের বেশি সময় আগে পরিচালিত তদন্ত, সামরিক বিচারপ্রক্রিয়া এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোও নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে সেই সুযোগ অর্থবহ হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র কেবল বিচারের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সত্য উদ্ঘাটনের প্রতিও সমান অঙ্গীকার দেখাবে। অন্যথায় ১৯৮১ সালের বিচার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো এতদিন ধরে উত্তরহীন ছিল, সেগুলোর সঙ্গে নতুন প্রশ্নই কেবল যুক্ত হবে।