পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত “আজাদ জম্মু ও কাশ্মির (Azad Jammu and Kashmir–AJK) “আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থার বৈষম্য এবং বিক্ষোভ দমনে প্রাণহানির ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান কাশ্মির সংকটের ভেতরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে—আজাদ কাশ্মীরের জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। কাশ্মির ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সাধারণত ভারত-নিয়ন্ত্রিত অংশ বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত অংশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক সংকট তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। অথচ সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করছে, এখানকার মানুষের দাবিও কেবল ভারত-পাকিস্তান বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মিরের আয়তন প্রায় ১৩,২৯৭ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ। অন্যদিকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলের আয়তন ৪২,২৪১ বর্গকিলোমিটার এবং সর্বশেষ সরকারি জনগণনা (২০১১) অনুযায়ী জনসংখ্যা ১.২৩ কোটি।
আজাদ কাশ্মীরের জন্ম
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের সময় জম্মু ও কাশ্মির ছিল একটি দেশীয় রাজ্য। এর শাসক ছিলেন হিন্দু মহারাজা হরি সিং, কিন্তু অধিকাংশ জনগণ ছিলেন মুসলমান। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মহারাজা ভারত বা পাকিস্তান—কোনো রাষ্ট্রেই সঙ্গে সঙ্গে যোগ দেননি। অক্টোবর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে উপজাতীয় যোদ্ধারা কাশ্মিরে প্রবেশ করে। একই সময়ে পশ্চিম কাশ্মিরে মহারাজার শাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিদ্রোহও শুরু হয়। পরিস্থিতির মধ্যে মহারাজা ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী কাশ্মিরে প্রবেশ করে। শুরু হয় প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির পর কাশ্মির বিভক্ত হয়ে যায়। একটি অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে এবং অপর অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে আসে। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলটি পরে **আজাদ জম্মু ও কাশ্মির** নামে পরিচিতি পায়। তবে “আজাদ” বা “স্বাধীন” শব্দটি নামের অংশ হলেও অঞ্চলটি কখনোই একটি পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
সীমিত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবতা
আজাদ কাশ্মীরের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনসভা এবং আদালত রয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, মুদ্রা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা ইসলামাবাদের হাতে। বিশেষ করে ১৯৭৪ সালের অন্তর্বর্তী সংবিধানের মাধ্যমে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাব আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। একই সঙ্গে “আজাদ জম্মু ও কাশ্মির কাউন্সিল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকে। ফলে অনেক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ, এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন কাগজে-কলমে যতটা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম।
রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা
আজাদ কাশ্মীরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোই প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি স্বাধীনতাপন্থী, স্বায়ত্তশাসনপন্থী এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা সবসময় সক্রিয় ছিল। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার এবং অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে এসেছে। কখনও এসব আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল, কখনও তা দমন-পীড়নের মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালে গঠিত “জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JAAC) ” এই ধারার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী নাগরিক আন্দোলনগুলোর একটি। শুরুতে তাদের দাবি ছিল বিদ্যুৎ, আটা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমানো। বিশেষ করে মাংলা বাঁধ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সুবিধা স্থানীয় মানুষকে কম খরচে দেওয়ার দাবি ব্যাপক জনসমর্থন পায়। পরবর্তীতে আন্দোলন অর্থনৈতিক দাবি ছাড়িয়ে রাজনৈতিক সংস্কারের দিকে অগ্রসর হয়।
বর্তমান সংকটের মূল কারণ
সাম্প্রতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। আজাদ কাশ্মীরের আইনসভায় কয়েকটি আসন সংরক্ষিত রয়েছে সেইসব মানুষের জন্য, যাদের পরিবার ১৯৪৭ সালের সংঘাতের সময় কাশ্মির ছেড়ে পাকিস্তানের অন্য অঞ্চলে চলে যায়। আন্দোলনকারীদের যুক্তি, বর্তমানে এসব আসনের প্রতিনিধিরা স্থানীয় জনগণের কাছে জবাবদিহি নন, অথচ তারা সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে নির্বাচনের ফল অনেক সময় আজাদ কাশ্মীরে বসবাসকারী ভোটারদের ইচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটায় না। এই ব্যবস্থার সংস্কারই এখন JAAC-এর প্রধান দাবি। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। আন্দোলনকারীরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই সহিংসতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনও এই উত্তেজনার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কাশ্মির প্রশ্নের আরেকটি বাস্তবতা
কাশ্মির নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই মুখোমুখি। কিন্তু আজাদ কাশ্মীরের সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখিয়ে দিচ্ছে, এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক দাবি রয়েছে, যা কেবল দুই রাষ্ট্রের বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য—এসব প্রশ্ন এখন আজাদ কাশ্মীরের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। যে অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে কেবল একটি ভূরাজনৈতিক বিরোধের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে, সেখানকার জনগণ এখন নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়েই উচ্চকণ্ঠ।
শেষ কথা
আজাদ কাশ্মীরের বর্তমান সংকট শুধু একটি নির্বাচনী বিরোধ নয়; এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং জনগণের সম্পর্ক নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কোনো অঞ্চলকে “আজাদ” বলা যত সহজ, বাস্তবে সেই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, কার্যকর প্রতিনিধিত্ব এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা ততটাই কঠিন। পাকিস্তানের জন্য এই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বলপ্রয়োগে সাময়িকভাবে বিক্ষোভ দমন করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান হয় না। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ নির্বাচন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান এবং জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ওপর। আজাদ কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নয়; নির্ধারণ করবে সেখানকার জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া।
বর্তমান পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মিরের (পিওজেকে) অস্থিরতা শুধু একটি বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিরোধ নয়। এটি পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল সম্পর্কে যে ধারণা তুলে ধরেছে, সেই দাবিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
পাকিস্তান এই অঞ্চলকে “আজাদ জম্মু ও কাশ্মির” বা “স্বাধীন কাশ্মির” নামে অভিহিত করে। এই নামের মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, অঞ্চলটি কাশ্মিরিদের স্বাধীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু শুধু একটি নাম বাস্তবতা বদলে দিতে পারে না।
যে অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং জবাবদিহির দাবির জবাবে সংলাপের পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই “আজাদ” বা “স্বাধীনতা” আসলে কতটা বাস্তব?
যদি স্বাধীনতার অর্থ হয় নাগরিকেরা নির্ভয়ে সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন, রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে পারবেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারবেন, তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে “আজাদ কাশ্মির” নামের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে।