২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ একটি গবেষণা প্রকাশ করে। গবেষণাটির নাম “Not an Idea We Have to Shun”: Chinese Overseas Basing Requirements in the 21st Century। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘যে ধারণা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না: একবিংশ শতাব্দীতে বিদেশে চীনের সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজনীয়তা’। গবেষণাটি লিখেছেন ক্রিস্টোফার ডি. ইয়ুং ও রস রুস্টিচ; তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্কট ডেভারি ও জেনি লিন।
প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল, চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশে স্বার্থ যত বাড়বে, ততই তার নৌবাহিনীর জন্য দেশের বাইরে জ্বালানি, রসদ, মেরামত ও অন্যান্য সহায়তার প্রয়োজন বাড়তে পারে। এই প্রয়োজন মেটাতে চীন বিদেশে কী ধরনের বন্দর ও সামরিক সহায়তা-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, গবেষণাটিতে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তার নিয়ে আলোচিত ‘পার্লসের মালা’ বা String of Pearls ধারণাও এতে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণাটির ৩৬ নম্বর পৃষ্ঠার একটি সারণি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে পাকিস্তানের গোয়াদর, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের কোকো দ্বীপপুঞ্জের বন্দর-অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের বড় সামরিক অভিযানকে সহায়তা করার জন্য নির্ধারিত অবকাঠামোগত মানদণ্ডের তুলনা করা হয়েছে। ২০১২ সালের অবস্থা এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য উন্নয়ন বিবেচনায় নিয়ে এই তুলনা করা হয়। সারণিতে দেখা যায়, গবেষণায় ব্যবহৃত মানদণ্ডের বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম তখনই অন্য বন্দরগুলোর তুলনায় এগিয়ে ছিল।
তবে গবেষণাটি চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। বরং এর মূল বিষয় ছিল বিদেশে চীনের সম্ভাব্য সামরিক রসদ-সহায়তার প্রয়োজন। প্রতিবেদনের লেখকেরা আরও বলেছেন, ভারত মহাসাগরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে চীনের ‘পার্লসের মালা’ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পক্ষে তখন পর্যাপ্ত বাস্তব প্রমাণ ছিল না। অর্থাৎ, গবেষণাটি চীনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি প্রচলিত আশঙ্কার সীমাবদ্ধতাও দেখিয়েছে।
তবু বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে: চট্টগ্রাম বন্দর শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র নয়। এর অবস্থান ও অবকাঠামো এমন যে, বাণিজ্যিক ব্যবহারের পাশাপাশি এটি আঞ্চলিক সামরিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশেও গুরুত্ব পেতে পারে। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। তাই বন্দরের উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ ও দক্ষ পরিচালনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। কিন্তু একটি কৌশলগত বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রশ্নে শুধু বাণিজ্যিক লাভের হিসাব করলেই চলে না। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও জড়িত।
বন্দরের অবস্থান, জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা, পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো সংকটের সময়ে সামরিক রসদ পরিবহনেও কাজে লাগতে পারে। তাই কোনো বন্দরকে কে পরিচালনা করছে, তার কার্যক্রমের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র কত দ্রুত নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে—এসব প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে বলেই এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনা বৃহত্তর ভূরাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই চুক্তির অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এর কৌশলগত প্রভাবও পরীক্ষা করা দরকার।
বিদেশি প্রতিষ্ঠান বন্দর পরিচালনা করলে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সেই প্রতিষ্ঠান বন্দরের দৈনন্দিন কার্যক্রম, পণ্য পরিবহনের প্রবাহ, পরিচালনব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করে। রাষ্ট্রের মালিকানা থাকলেও পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা ও তথ্য যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এখানেই ১৫ বছরের চুক্তির গুরুত্ব। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়বে, নাকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা বাড়বে—তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্তের ওপর। প্রযুক্তি, তথ্য, নিরাপত্তা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অধিকার স্পষ্ট না থাকলে ভবিষ্যতে অপারেটর পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, আঞ্চলিক সংঘাত বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে বন্দরের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ, তার আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন সব সময় এক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই জরুরি অবস্থায় সরকার যেন দ্রুত নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, সে ব্যবস্থা চুক্তিতেই থাকতে হবে।
এই ঝুঁকি মানেই যে চুক্তিটি সামরিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, তা নয়। বরং কৌশলগত স্থাপনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে অর্থনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। প্রতি কনটেইনারে প্রায় ১০৫ ডলার নিট আয় হওয়ার যে হিসাব প্রকাশিত হয়েছে, তা সঠিক হলে টার্মিনালটি বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য রাজস্বের উৎস। তবে এই হিসাবের ভিত্তি, পরিচালন ব্যয়ের সংজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারের যুক্তি হতে পারে, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিনিয়োগ করবে, আধুনিক প্রযুক্তি আনবে এবং বন্দরের দক্ষতা বাড়াবে। কিন্তু এই যুক্তির পক্ষে স্বচ্ছ হিসাব থাকা দরকার। বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করে একই ফল অর্জন করতে পারত কি না, সেটিও তুলনা করে দেখতে হবে।
চুক্তিতে বাংলাদেশের আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন খরচ বাদ যাবে, বিনিয়োগের দায় কার ওপর থাকবে এবং কনটেইনারের সংখ্যা বাড়লে রাজস্বের ভাগ কীভাবে বদলাবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। শুধু রাজস্বের একটি শতাংশ জানলে চুক্তির প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বোঝা যায় না।
একটি লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও বিকল্প ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে।
ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর এখন চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। চীনের বন্দর বিনিয়োগ ও সামুদ্রিক যোগাযোগ নিয়ে যেমন আলোচনা রয়েছে, তেমনি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন বাংলাদেশের বাণিজ্যকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু বন্দর পরিচালনা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত যেন দেশকে একটি নির্দিষ্ট শক্তির কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
চুক্তির পেছনে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা রয়েছে—এমন অভিযোগের পক্ষে সরাসরি প্রমাণ প্রয়োজন। তবে প্রমাণের অভাবে বন্দরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখা যায় না। বরং চুক্তির শর্ত, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের সীমা প্রকাশ করা হলে এই বিতর্কের জবাব তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের উচিত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ, বিনিয়োগের শর্ত, রাজস্ব ভাগাভাগির হিসাব, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধান এবং চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার নিয়ম জনসমক্ষে প্রকাশ করা। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখতে হলে তার যুক্তি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্ত অস্বচ্ছ রেখে জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।
সংসদীয় তদারকি, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার উপযোগী পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দর পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও থাকতে হবে, যাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগলেও রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পদ। এর উন্নয়ন প্রয়োজন, বিদেশি বিনিয়োগও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু উন্নয়নের নামে এমন কোনো চুক্তি করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে।
প্রশ্নটি ডিপি ওয়ার্ল্ড কোন দেশের প্রতিষ্ঠান, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, ১৫ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা, তথ্য ও নিরাপত্তার ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী থাকবে। এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির লাভ-ক্ষতির পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। বন্দর আধুনিক হোক, বাণিজ্য বাড়ুক—কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়।