একটি ফেসবুক পোস্টের অভিযোগে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগরে যে সহিংসতার আগুন জ্বলে উঠেছিল, তার ক্ষত এক দশক পরও শুকায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পর এসেছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার; এরপর দায়িত্ব নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। কিন্তু হিন্দু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, ভয়ভীতি, জমি দখল ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ এখনো রয়ে গেছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু তাদের জীবনে নিরাপত্তা কতটা ফিরেছে?
দশ বছর আগে নাসিরনগরে একটি ফেসবুক পোস্টের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হামলা হয়েছিল, তার বিচারপ্রক্রিয়াও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ১৫টি মন্দির ও তিন শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। একটি গুজব ও উসকানির পরিণতি যে কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, নাসিরনগর তারই নির্মম উদাহরণ।
রসরাজ দাস কোনো রাজনীতিবিদ নন, ক্ষমতাবান কেউ নন, সংবাদমাধ্যমের পরিচিত মুখও নন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর গ্রামের একজন দরিদ্র হিন্দু জেলে। অথচ তাঁর ফেসবুক আইডি থেকে একটি ছবি প্রকাশের অভিযোগ তাঁর জীবনকে এমনভাবে ওলটপালট করে দিয়েছিল যে, নিজের নির্দোষিতার দাবি নিয়েও তাঁকে বছরের পর বছর আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর মতো মানুষের নাম হয়তো ইতিহাসের বড় পাতায় লেখা হয় না। কিন্তু তাঁদের কান্না, অপমান, আতঙ্ক ও বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস মুছে যায় না।
নাসিরনগরের ঘটনা তাই কেবল একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার, গুজবকে জনতার ক্রোধে পরিণত করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
২০১৬ সালের অক্টোবরে রসরাজের ফেসবুক আইডি থেকে ইসলাম ও পবিত্র কাবা শরিফ অবমাননাকর একটি ছবি প্রকাশের অভিযোগ ওঠে। রসরাজ দাবি করেন, তাঁর আইডি হ্যাক করে অন্য কেউ ছবিটি পোস্ট করেছে। ২৯ অক্টোবর তাঁকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পরদিন, ৩০ অক্টোবর, ওই অভিযোগের প্রতিবাদে নাসিরনগরে পৃথক বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হেফাজতে ইসলাম এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সমাবেশকে ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামলা শুরু হয়।
দত্তপাড়া থেকে শুরু হয়ে হামলা ছড়িয়ে পড়ে ঘোষপাড়া, গাংকুলপাড়া, মহাকালপাড়া, কাশিপাড়া, নমঃশূদ্রপাড়া, মালিপাড়া ও শীলপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায়। বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়, মন্দিরে হামলা চালানো হয়, প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। বহু মানুষ আহত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৫টি মন্দির ও তিন শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের কথা উঠে আসে। হামলা ঠেকাতে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং ঘটনার সময় তাদের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
পরে পুলিশি ফরেনসিক পরীক্ষায় রসরাজের মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ড থেকে বিতর্কিত ছবিটি আপলোডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ছবিটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় আল-আমিন সাইবার পয়েন্টের মালিক জাহাঙ্গীর আলমের নামও সামনে আসে। ২০২১ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রসরাজ ও জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। অর্থাৎ, অভিযোগের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পরও রসরাজকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে হামলায় উসকানি দেওয়া বা সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ ওঠে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া ও গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধান নিয়ে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনেও হিন্দুদের জমি দখল করে তাঁদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠে আসে। তবে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন ছিল নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর বিচার।
নাসিরনগরের ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, একটি যাচাই না করা অভিযোগ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, উপাসনালয় ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।
নাসিরনগরের সবচেয়ে ভয়াবহ শিক্ষা হলো, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই একটি জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য উন্মত্ত জনতা সংগঠিত হয়ে উঠতে পারে। ফেসবুক আইডি হ্যাক, ভুয়া পোস্ট, সম্পাদিত ছবি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্ক্রিনশট—যেকোনো কিছু মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের জীবন বিপন্ন করতে পারে।
বাংলাদেশে রামু, নাসিরনগর, শাল্লা, কুমিল্লা, রংপুর ও যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার দাবি কিংবা গুজবকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ও দায়ী ব্যক্তি এক নয়। কিন্তু বারবার একটি পরিচিত ধারা সামনে এসেছে: প্রথমে অভিযোগ বা গুজব, এরপর উত্তেজনা ছড়ানো, তারপর সংখ্যালঘু বসতি কিংবা উপাসনালয়ে হামলা; সবশেষে তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠলে পুলিশের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধ করা। অভিযোগের বিচার আদালতে হবে, জনতার হাতে নয়। কেউ অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে; তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো পরিবার বা সম্প্রদায়কে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। সরকার পরিবর্তনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার খবর আসে। ৫ ও ৬ আগস্টের সহিংসতার সময় অন্তত ২৭ জেলায় হিন্দুদের বাড়ি ও সম্পত্তিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের কথা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এসব ঘটনার কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অনেক হামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত হিন্দুদের ওপর আক্রমণ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো ধর্মীয় পরিচয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক দুর্বলতাকে হামলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরে। বাস্তবে কোনো কোনো ঘটনায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কোথাও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, আবার কোথাও জমি ও সম্পত্তি দখলের স্বার্থ কাজ করে থাকতে পারে। তাই প্রতিটি ঘটনার উদ্দেশ্য ও দায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭৪টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা জানায়। সংগঠনটির হিসাবে, এসব ঘটনায় ২৩ জন নিহত হন। নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, লুটপাট ও সম্পত্তি দখলের অভিযোগও ছিল। সংগঠনটির প্রকাশিত পরবর্তী প্রতিবেদনেও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের একাধিক ঘটনার হিসাব উঠে আসে। তবে এসব পরিসংখ্যান সংগঠনটির নিজস্বভাবে সংকলিত; প্রতিটি ঘটনার সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।
পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও যদি সংখ্যালঘু মানুষ নিজেদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ও সম্পত্তি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কোথায় ছিল—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার পরিবর্তনের পর সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে কোথায় ঘাটতি ছিল, তারও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। নতুন সরকার গঠনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—হামলা, ভয়ভীতি ও জমি দখলের অভিযোগ কমবে; অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের মুখোমুখি হবে। কিন্তু নতুন সরকারের সময়েও সহিংসতার অভিযোগ অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনটির হিসাবে, এসব ঘটনায় ৪৪ জন নিহত হয়েছেন; ৬২টি ঘটনায় মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে হামলা বা ভাঙচুর এবং ৪৭টি ঘটনায় বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট বা অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। এই ছয় মাসের হিসাবের মধ্যে ইউনূস সরকারের শেষ সময় এবং তারেক রহমান সরকারের প্রথম কয়েক মাস—দুই সময়ই অন্তর্ভুক্ত। তাই পুরো সংখ্যাকে এককভাবে কোনো একটি সরকারের আমলের ঘটনা বলা সঠিক হবে না।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ঐক্য পরিষদ আরও ১৪১টি নির্যাতনের ঘটনার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ড, মন্দিরে হামলা, জমি দখল, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ এবং বাড়িঘরে ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান বাংলাফ্যাক্ট ভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের পর্যালোচনায়, ওই সময়ের হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনোটিতেই সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; কিছু ঘটনা ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য কারণে ঘটেছে বলে তারা জানায়।
এই মতপার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো অপরাধের সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকলে সেটিকে সাধারণ অপরাধ বলে আড়াল করাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তারেক রহমান ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ—হামলার দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ, দখল হওয়া জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নতুন সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে প্রতিশ্রুতিতে নয়, আক্রান্ত মানুষের জীবনে বাস্তব নিরাপত্তা ফিরেছে কি না, তার ভিত্তিতে।
নাসিরনগরের ঘটনা ঘটেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এরপর এসেছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার, আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তাহীনতা দূর হয়নি। বিভিন্ন সময়ের অভিযোগ ও পরিসংখ্যান অন্তত সেই প্রশ্নই সামনে আনে।
এখানে কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রমাণ ছাড়া সব ঘটনার জন্য দায়ী করা যায় না। আবার ক্ষমতায় থাকা বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী কোনো দলই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি—বিভিন্ন সময়ে এসব রাজনৈতিক শক্তির শাসনামল বা স্থানীয় প্রভাববলয়ে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ভূমি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সাম্প্রদায়িক উসকানি, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কোথাও জমি দখল, আবার কোথাও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা—ঘটনা ও দায়ের ধরন আলাদা। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নাগরিককে রক্ষা করা।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে সম্প্রীতি, সমঅধিকার ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়। সংখ্যালঘুদের ভোটও চায়। কিন্তু হামলার পর আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মামলা পরিচালনায় সহায়তা করা, জমি ফিরিয়ে দেওয়া, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়?
সরকার বদলালেও যদি স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যায়, তাহলে ক্ষমতার পালাবদলে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রকৃত নিরাপত্তা আসে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের বাইরে এনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না করলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সমতলের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ধর্মীয় বিদ্বেষ ও গুজবকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, বসতি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। বিভিন্ন সময়ে ভূমি দখল, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সমতলের হিন্দু পরিবার কিংবা পাহাড়ের আদিবাসী পরিবার—উভয়ের ক্ষেত্রেই মৌলিক প্রশ্নটি একই: নিজের জন্মভূমিতে নিরাপদে বসবাস করার অধিকার কি তারা নিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারছে? ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা ভাষার কারণে কাউকে কি নিজের বাড়ি, জমি, উপাসনালয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা নিয়ে বাঁচতে হবে?
সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা কোনো সরকারের দয়া কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার বিষয় নয়। এটি নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে না।
প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ডিজিটাল অপরাধের ক্ষেত্রে ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা, আক্রান্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, দখল হওয়া জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং পুলিশ-প্রশাসনের ব্যর্থতার জবাবদিহি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নও জরুরি।
কোনো দল ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে থাকুক, এই দায়িত্ব থেকে তার অব্যাহতি নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা জাতীয় পার্টি—কেউই শুধু রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করতে পারে না। বিচারহীনতা চলতে থাকলে অপরাধীরা বারবার একই কাজ করার সাহস পায়; আর রাষ্ট্রের প্রতি আক্রান্ত মানুষের আস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ে।
রসরাজ হয়তো বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কোনো নাম হয়ে উঠবেন না। তাঁর নামে হয়তো কোনো সড়ক হবে না, কোনো স্মৃতিস্তম্ভও তৈরি হবে না। কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্র যখন দুর্বল নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তখন একটি গুজবও তার জীবন ধ্বংস করার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
রসরাজের কথা মনে রাখার অর্থ শুধু ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবরের হামলার কথা স্মরণ করা নয়। এর অর্থ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত প্রতিটি মানুষকে মনে রাখা; ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর কথা মনে রাখা; নিরাপত্তাহীনতায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের কথা মনে রাখা; আর পাহাড়ে নিজেদের ভূমি ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো।
বাংলাদেশ কোনো একক ধর্ম, জাতি কিংবা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষ—সবাই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। কারও নিরাপত্তা অন্য কারও রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাসিরনগর, ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ, আর তারেক রহমানের সরকারের সময়ও সহিংসতার ধারাবাহিকতার দাবি—সব মিলিয়ে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে: সরকার বদলেছে, কিন্তু দুর্বল নাগরিককে রক্ষার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা কি সত্যিই বদলেছে?
রসরাজদের ভুলে গেলে শুধু একটি ঘটনার স্মৃতি হারাবে না; হারাবে রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাওয়ার নৈতিক ভিত্তিও। যে রাষ্ট্র তার দুর্বলতম নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবিকতার দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।