[ “এখন আর শ্রমিক অসন্তোষ নেই, এটি রাজনৈতিক”—নাজমা আক্তারের এই বক্তব্যকে শিরোনাম করে একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চ্যানেল আই অনলাইন (২ নভেম্বর ২০২৬), দৈনিক নয়া দিগন্ত (১ নভেম্বর ২০২৬) এবং দৈনিক ইনকিলাব (২ নভেম্বর ২০২৬)। ]
নাজমা আক্তার বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের একজন পরিচিত শ্রমিকনেত্রী। তিনি সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (SGSF) সভাপতি এবং শ্রম অধিকারবিষয়ক আওয়াজ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। শৈশবে পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তী সময়ে তিনি নারী শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে কাজ করেছেন।
গত ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পোশাকশিল্পের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নাজমা আক্তার বলেছেন, এখন আর শ্রমিক অসন্তোষ নেই; বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের নামে যে আন্দোলন ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে, তা রাজনৈতিক। একজন শ্রমিকনেত্রীর এমন বক্তব্যের পক্ষে তথ্য ও প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। কারণ শ্রমিক অসন্তোষের বাস্তবতা কিংবা কোনো আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনুমান নয়, যাচাইযোগ্য তথ্যই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
শ্রমিকের মজুরি নিয়ে আলোচনায় ন্যূনতম মজুরি ও জীবনযাপনযোগ্য মজুরির পার্থক্য বোঝা জরুরি। ন্যূনতম মজুরি হলো আইন নির্ধারিত সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক। অন্যদিকে, জীবনযাপনযোগ্য মজুরি বলতে পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো আয় বোঝায়। আরও একটি ধারণা হলো ‘ভদ্রস্থ জীবনযাপনযোগ্য মজুরি’ (Decent Living Wage), যা বিলাসিতা ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যয় বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের মজুরি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও হিসাবের আলোচনায় ২০২৫ সালের জন্য ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, ৩৬ হাজার টাকা জীবনযাপনযোগ্য মজুরি এবং ৪৮ হাজার টাকা ভদ্রস্থ জীবনযাপনযোগ্য মজুরির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো সর্বজনস্বীকৃত বা সরকারি নির্ধারিত হার নয়; গবেষণার পদ্ধতি, পরিবারের আকার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে। এসব পরিমাণের নির্দিষ্ট গবেষণাগত উৎস ও হিসাবের পদ্ধতি যাচাই করাও জরুরি। তা সত্ত্বেও এই আলোচনা শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
শুধু রাস্তায় আন্দোলন কম দেখা যাচ্ছে, তা থেকে শ্রমিকদের অসন্তোষ দূর হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। চাকরি হারানোর আশঙ্কা, সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্যান্য কারণে শ্রমিকেরা অনেক সময় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন না। তাঁদের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেছেন। তখন শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর একই ধরনের দাবি বা আন্দোলনকে রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রেও সামঞ্জস্যপূর্ণ মানদণ্ড থাকা জরুরি। শ্রমিকের অধিকার ও ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন সরকারের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। দুই সময়ের শ্রমিক আন্দোলন মূল্যায়নে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়।
নাজমা আক্তারের যদি মনে হয় বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, তাহলে তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা প্রয়োজন। কোন আন্দোলনে কারা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত, তাদের ভূমিকা কী এবং শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার সম্পর্ক কী—তা ব্যাখ্যা করা দরকার। কোনো আন্দোলনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি অকার্যকর হয়ে যায় না। রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির যৌক্তিকতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি মূল্য ও মালিকদের ব্যবসায়িক সীমাবদ্ধতা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। তবে শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধু শ্রমিকের কম মজুরির ওপর নির্ভর করতে পারে না। শ্রমিকের পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়ও অর্থনৈতিক হিসাবের অংশ হওয়া প্রয়োজন। শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নত না করে শিল্পের সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বলা কঠিন।
নাজমা আক্তারের বক্তব্য ও কাজের বিষয়ে ছয়টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
প্রথমত, শ্রমিক অসন্তোষ নেই—এই মূল্যায়নের ভিত্তি কী? কোন সময়ের কতজন শ্রমিকের ওপর জরিপ চালিয়ে, কোন শিল্পাঞ্চল ও কী কী সূচক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে? জরিপ বা গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব কি?
দ্বিতীয়ত, বর্তমান মজুরি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? ২০২৫ সালের জন্য আলোচিত ৩০, ৩৬ ও ৪৮ হাজার টাকার মজুরি-হিসাব সম্পর্কে নাজমা আক্তারের মূল্যায়ন কী? তাঁর সংগঠন কি নিজস্ব কোনো গবেষণা করেছে? একজন পোশাকশ্রমিকের পরিবার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য মাসে কত টাকা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন? এ বিষয়ে গবেষণার পদ্ধতি, জরিপের নমুনা ও ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব কি?
তৃতীয়ত, গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা ও ছাঁটাইয়ের পরিস্থিতিতে কী পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন এসেছে? এ বিষয়ে কোনো তুলনামূলক পরিসংখ্যান বা স্বাধীন গবেষণা রয়েছে কি? আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং বর্তমান সময়ের শ্রমিক আন্দোলন মূল্যায়নে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে কি?
চতুর্থত, শ্রমিকদের নামে চলমান আন্দোলন রাজনৈতিক—এই অভিযোগের পক্ষে কী সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে? কোন আন্দোলনে কারা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত, তাদের ভূমিকা কী এবং শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির সঙ্গে সেই সম্পৃক্ততার সম্পর্ক কী? এ বিষয়ে কোনো তদন্ত, নথি বা যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে কি?
পঞ্চমত, আওয়াজ ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রকল্প ও বার্ষিক প্রতিবেদনে Laudes Foundation, Fair Wear Foundation, Friedrich Ebert Stiftung, GIZ এবং Foundation for a Just Society-সহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন বা সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রকল্পে অর্থের পরিমাণ, ব্যয়ের বিবরণ এবং অর্জিত ফলাফল কি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়? কতজন শ্রমিক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন, তার পরিমাপযোগ্য তথ্য কী? আওয়াজ ফাউন্ডেশন ও সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের পৃথক পরিচয়, কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাবও কি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়?
ষষ্ঠত, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন ও আওয়াজ ফাউন্ডেশনের কাজের ফলে মজুরি বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কী পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে? এসব কাজের ফলাফল যাচাইয়ে কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন রয়েছে কি?
শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে। শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের জবাবদিহিও প্রয়োজন। একইভাবে, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দেশি-বিদেশি অর্থায়ন এবং প্রকল্পের ফলাফল সম্পর্কেও স্বচ্ছতা থাকা দরকার। তবে এসব আলোচনা শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নকে আড়াল করতে পারে না। শ্রমিকের অধিকার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়; এটি শ্রম, অর্থনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
নাজমা আক্তারের কাছে মূল প্রশ্ন হলো, শ্রমিক অসন্তোষ নেই—এটি কি মাঠপর্যায়ের তথ্য ও গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত, নাকি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন? শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মপরিবেশের তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। একইভাবে, শ্রমিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক বলার ক্ষেত্রেও অভিযোগ নয়, যাচাইযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে। শ্রমিকের পক্ষে থাকার বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু বক্তব্যে নয়; তথ্য প্রকাশ, সংগঠনের জবাবদিহি এবং শ্রমিকদের জীবনে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।