শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! একটি রিল, বহু প্রশ্ন: আক্রমণের মুখে নারী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা  বাংলাদেশের আয়নায় ভারতকে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত? প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: শেষ নয়, শুরু ৪৫ বছর পর মেজর মোজাফফর: সত্য উদ্ঘাটনের সুযোগ, নাকি নতুন বিভ্রান্তি ? ভারতের ছাত্র আন্দোলনের বার্তা: দমন-পীড়ন নয় এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্ন সেনা বিদ্রোহ মামলার পলাতক মেজর মোজাফফর : পুরোনো মামলা, নতুন মামলা—বিতর্ক কোথায়? মহিউদ্দিন আহমদ : এজেন্ডার রাজনীতি, মুসলিম লীগবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাপানে জাতীয় পতাকা অবমাননা নিষিদ্ধ: নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক ফকল্যান্ডের ব্যানার ঘিরে বিতর্ক, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ফিফার দ্বারস্থ ব্রিটেন আর্জেন্টিনার জয়, মালভিনাসের দাবি এবং ক্ষমতার সীমারেখা
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন

একটি রিল, বহু প্রশ্ন: আক্রমণের মুখে নারী ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

সমসমাজ প্রতিবেদক।
Update : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল স্কুল প্রাঙ্গণে শাড়ি পরে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের তালে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হয় ট্রল, চরিত্রহনন ও সামাজিক হেনস্তা। চলতি বছরের নির্বাচিত জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও ওঠে। এমনকি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি তদন্তে শিক্ষা অফিস কমিটিও গঠন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কিসের তদন্ত? একজন শিক্ষক গান শুনে হাঁটলেন, হাসলেন, নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দিলেন—এটি কি এখন প্রশাসনিক অপরাধ?

এই ঘটনার ইতিবাচক দিকও আছে। দেশের নানা প্রান্তের হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সাধারণ মানুষ একই গানের সঙ্গে ভিডিও প্রকাশ করে বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। অন্তত এই ঘটনাটি দেখিয়েছে, অসহিষ্ণুতার বিপরীতে এখনও প্রতিরোধের শক্তি সমাজে টিকে আছে।

কিন্তু এখানেই থেমে গেলে ভুল হবে। এই ঘটনাকে নিছক একটি ‘রিল ভিডিও বিতর্ক’ বা ‘সাইবার বুলিং’ হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যাবে। ট্রল কেবল কয়েকটি ফেসবুক মন্তব্য নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাষা। এই ভাষার লক্ষ্য মানুষকে ভয় দেখানো, চুপ করিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নারীকে নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার হলো নৈতিকতার নামে প্রকাশ্য বিচার। একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কীভাবে হাঁটবেন, গান গাইবেন কি না, হাসবেন কি না—এসব নিয়ে সামাজিক আদালত বসে। কিন্তু একই সমাজ স্কুলে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কিংবা শিশুদের শিক্ষার মান নিয়ে এতটা সোচ্চার হয় না। অর্থাৎ সমস্যার কেন্দ্র শিক্ষা নয়; কেন্দ্র হলো নারী।

এই কারণেই বিউটি রানী পালের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারী অবদমন, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এবং সামাজিক ক্ষমতার রাজনীতি। একজন হিন্দু নারী শিক্ষককে ঘিরে যে ভাষা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটিও আমাদের সমাজের অস্বস্তিকর বাস্তবতার অংশ। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও নারীবিদ্বেষ অনেক সময় একই স্রোতে মিশে যায়; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বোঝা যায় না।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে গান, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা শিল্পচর্চাকে কেন্দ্র করে একের পর এক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কোথাও শিল্পীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে, কোথাও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।  বিউটি রানী পালের ঘটনাও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংকোচনের একটি অংশ । একজন শিক্ষক নিশ্চয়ই দায়িত্বশীল হবেন। কিন্তু দায়িত্বশীল হওয়ার অর্থ নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া নয়। শিক্ষক মানুষ; তাঁরও ব্যক্তিগত জীবন, অনুভূতি ও আনন্দ আছে। একজন শিক্ষককে আদর্শ হতে হবে, কিন্তু তাঁকে রোবট বানানোর অধিকার সমাজের নেই।

বিউটি রানী পালের ভিডিও নিয়ে যে ঝড় উঠেছে, তা আসলে একটি আয়না। সেখানে আমরা একজন শিক্ষিকাকে নয়, নিজেদের সমাজকেই দেখি। যে সমাজে দুর্নীতির চেয়ে শাড়ি বড় অপরাধ, বদলি বাণিজ্যের চেয়ে একজন নারীর হাসি বড় সংকট, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের চেয়ে শিল্পচর্চা বেশি প্রশ্নবিদ্ধ—সেই সমাজে ট্রল নিছক সাইবার বুলিং নয়; এটি ক্ষমতার প্রদর্শন, ভয় তৈরির কৌশল এবং স্বাধীন মানুষকে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। যদি এই মানসিকতার বিরুদ্ধে আজ দৃঢ় অবস্থান নেওয়া না যায়, তবে আগামীকাল কাঠগড়ায় দাঁড়াবে শুধু একজন বিউটি রানী পাল নন—শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের গণতান্ত্রিক সমাজবোধই।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!