ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সীমান্তের যেসব অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে দ্রুত বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই দুই বাংলায় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রশ্নকে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে রেখেছে। ফলে ক্ষমতায় এসেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে বিস্ময়কর নয়।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। এর ধারণা উঠে আসে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে, যখন আসামের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল পূর্ব পাকিস্তান থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের দাবি তোলে। তবে বাস্তব সিদ্ধান্ত আসে ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির পর। ১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধী সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ঘোষণা দেয়। ১৯৮৯ সালে কাজ শুরু হলেও প্রায় চার দশক পরও পুরো ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। ভারত বরাবরই এই প্রকল্পকে সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক আইন, সীমান্ত চুক্তি এবং নির্ধারিত সীমারেখা মেনে নিজ ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে, তাহলে অন্য রাষ্ট্রের আপত্তির যৌক্তিক ভিত্তি কোথায়? পৃথিবীর বহু দেশে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ব্যবস্থা বহু বছর ধরেই চালু। ফলে ভারত যদি তার নিজস্ব ভূখণ্ডে নিয়ম মেনে বেড়া নির্মাণ করে, সেটিকে বাংলাদেশের প্রতি অসম্মান বা আগ্রাসনের প্রতীক হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ নেই।
কাঁটাতারের বেড়া কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এটি একা চোরাচালান, মানবপাচার বা অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। সীমান্তে নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয় এবং দুই দেশের সহযোগিতা ছাড়া কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। তবুও একটি উন্মুক্ত ও অরক্ষিত সীমান্তের তুলনায় সুরক্ষিত সীমান্ত অবৈধ কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়ক—এটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশেরও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে চোরাচালান চলে আসছে, তার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশই। বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সরকার বিপুল রাজস্ব হারায় এবং সীমান্তজুড়ে একটি ছায়া অর্থনীতি গড়ে ওঠে। অবৈধ পথে পণ্য প্রবেশের পরিবর্তে যদি সেগুলো বৈধ আমদানি-রপ্তানির আওতায় আসে, তাহলে রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়বে, দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।
আরও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সীমান্তে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ কমে গেলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে উগ্র আবেগনির্ভর প্রচারণার ক্ষেত্রও কিছুটা সংকুচিত হবে। বিশেষ করে তথ্য-উপাত্তের বদলে সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে অন্ধ ভারতবিরোধী রাজনীতি পরিচালিত হয়, তারও অন্তত কিছুটা ভিত্তি দুর্বল হবে। একইভাবে ভারতে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণারও বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। সুসংগঠিত সীমান্ত উভয় দেশের জন্যই রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি নীতি কখনোই বিসর্জন দেওয়া যায় না—মানবজীবনের মর্যাদা। সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা, আহত করা কিংবা মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার মতো ঘটনা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না। সীমান্তে অপরাধ ঘটলে তার প্রতিকার আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে, প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়। সীমান্ত হত্যা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ দায়িত্ব।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে; থাকবে মানুষে-মানুষে যোগাযোগও। তাই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈধ বাণিজ্য সহজ করা এবং অবৈধ কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা—সম্পর্কের দেয়াল নির্মাণ নয়। ভারত যদি আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে তার নিজস্ব ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে, তাহলে সেটিকে অযথা রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়ে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। বরং সীমান্তে চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশ কমলে তার সুফল বাংলাদেশও পাবে। বৈধ বাণিজ্য বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্তকে কেন্দ্র করে আবেগ নির্ভর ও অন্ধ ভারতবিরোধী রাজনীতিরও অন্তত কিছুটা ভিত্তি দুর্বল হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি অনিবার্য শর্ত রয়েছে—সীমান্তে হত্যা, অমানবিক আচরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান। নিরাপদ সীমান্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি মানবিক সীমান্তও অপরিহার্য।