শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ? শেখ হাসিনার শাসনের অবসান: গণঅভ্যুত্থান নাকি সামরিক হস্তক্ষেপ? দিল্লির মঞ্চে হাসিনা, ঢাকার ক্রোধ জুলাই ২৪ অভ্যুত্থান : শেখ হাসিনার পতন ও কালার রেভল্যুশনের প্রশ্ন চব্বিশের জুলাই: রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি — ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক লজ্জার পর : সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ও মুক্তচিন্তার অবরুদ্ধ বাংলাদেশ তসলিমার নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির দুই প্রান্তে একই ভোটের সমীকরণ কাঁটাতারের বেড়া: নিরাপত্তা, না কি রাজনীতির দেয়াল? আজাদ কাশ্মীর: রাষ্ট্রের ছায়ায় গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং প্রবাসীদের অংশগ্রহণ
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন

‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—শব্দের ঝলকানি, নাকি রাষ্ট্রনীতির বাস্তব পরীক্ষা ?

অপু সারোয়ার
Update : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “শুরু থেকে আমাদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দিকটি হচ্ছে—সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা সেই ক্লায়েন্ট স্টেট পর্যায়ে আর কখনো ফিরে যাব না, কখনোই না।” বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬, রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’-এর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। বক্তব্যটি শুনতে নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। এতে দেশপ্রেম মূলক মাদকতা আছে,  সার্বভৌমত্বের ঘোষণা আছে এবং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের প্রতিশ্রুতিও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রনীতি বক্তৃতার শব্দ দিয়ে বিচার করা যায় না। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট ধারণা—‘ক্লায়েন্ট স্টেট’—ব্যবহৃত হয়, তখন শব্দটির অর্থ, প্রয়োগ এবং বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাগাড়ম্বর একটি পুরোনো দুষ্ট ক্ষত। কথার চমক দিয়ে রাজনৈতিক শূন্যতা ঢাকার এই সংস্কৃতি এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে নিজেকে বোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে কথার মধ্যে দু-চারটি ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া যেন প্রায় বাধ্যতামূলক। ইংরেজি শব্দ যত দুর্বোধ্য, বক্তার বোদ্ধা ভাব তত বেশি—এমন প্রবণতা বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ভাষাকে আক্রান্ত করে রেখেছে। আবার নিজেকে ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আরবি শব্দ বা বাক্য জুড়ে দেওয়ারও প্রবল রেওয়াজ আছে। শব্দটির প্রকৃত অর্থ কতটা বোঝা হয়েছে, তার চেয়ে সেটি কতটা ভারী শোনাচ্ছে—সেটিই যেন বড় বিষয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ ব্যবহার সেই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের ধারাবাহিকতা কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন।

‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ মানে আসলে কী?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত অর্থে client state বলতে এমন একটি রাষ্ট্রকে বোঝায়, যা আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অথবা সামরিকভাবে একটি অধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তার পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নির্দেশনার প্রভাব নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। কোনো দেশের কাছ থেকে বেশি পণ্য আমদানি করলেই একটি রাষ্ট্র ক্লায়েন্ট স্টেট হয়ে যায় না। কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও রাষ্ট্র নতজানু হয়ে যায় না। কোনো দেশের কাছ থেকে খাদ্য, জ্বালানি, ঋণ বা প্রযুক্তি নিলেই সার্বভৌমত্ব বিলীন হয় না। ক্লায়েন্ট স্টেট হওয়ার মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রটি শেষ পর্যন্ত নিজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে কি না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধারণাটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ বাদ দিয়ে শুধু ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’কে ‘নতজানু রাষ্ট্র’ হিসেবে ব্যবহার করলে শব্দটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। আমাদের আশে পাশে যে দুটি ক্লায়েন্ট স্টেট রয়েছে তাদের একটি হচ্ছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ” আজাদ কাশ্মীর ” অন্যটি হচ্ছে তুরুস্ক নিয়ন্ত্রিত সাইপ্রাস। তুরুস্ক সাইপ্রাসের একাংশ দখল করে দখলকৃত সাইপ্রাসকে একটি ‘ স্বাধীন ‘ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে। তুরুস্কই একমাত্র দেশ ” ‘ স্বাধীন সাইপ্রাস ‘ কে স্বীকৃতি দিয়েছে।

 ভূগোলকে কি বক্তৃতা দিয়ে বদলানো যাবে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বাস্তব ভূগোলকে স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। অন্যদিকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত থাকলেও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। ফলে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা একই বাস্তবতায় বিচার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য তাই কেবল রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূগোল, পরিবহনব্যবস্থা, অবকাঠামো, বাজারের আকার, সরবরাহশৃঙ্খল এবং আমদানি ব্যয়।

খাদ্যের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা আরও কঠিন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় আবাদযোগ্য জমি সীমিত। চাল, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ঘাটতি পূরণে আমদানি করতে হয়। নিকটবর্তী এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ের বাজার থেকে এসব পণ্য আমদানি করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক।  ভারত থেকে পেঁয়াজ কেনা আর ভারতের নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা এক কথা নয়। ভারত থেকে চাল কেনা আর ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ওপরে বসিয়ে দেওয়া এক কথা নয়। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সহযোগিতা আর ভারতের রাজনৈতিক আনুগত্য স্বীকার করাও এক কথা নয়। এই পার্থক্যটুকু না বুঝলে ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ শব্দটি কেবল শব্দের জৌলুস হয়ে থাকে। যদি খাদ্য আমদানিই ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের লক্ষণ হয়, তাহলে পৃথিবীর অসংখ্য রাষ্ট্রকে সেই তালিকায় ঢোকাতে হবে। আর যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতাই ক্লায়েন্ট স্টেটের একমাত্র প্রমাণ হয়, তাহলে ভূগোলের কারণে পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রকেই নতজানু বলতে হবে।

রাষ্ট্রনীতি এত সরল নয়।

চোখ ফেরানোর পুরোনো কৌশল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্ধ ভারতবিরোধিতা নতুন কোনো কৌশল নয়; বরং এটি বহুদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক অস্ত্র। দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা শাসনের জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণ যখন উত্তর চায়, তখন আলোচনার কেন্দ্র ঘুরিয়ে ভারতের দিকে আঙুল তোলা অনেক সময় সহজ রাজনৈতিক পথ হয়ে ওঠে। দেশের বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য, রাজনৈতিক ব্যর্থতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা কিংবা অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের নিজেদের নীতি, প্রতিষ্ঠান, বাজারব্যবস্থা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার দিকে তাকাতে হবে। কিন্তু এসব কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার বদলে প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে ভারতের কোনো না কোনো সম্পর্ক খুঁজে বের করা অনেক সহজ। এটি যেমন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অলস, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও বিপজ্জনক।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তব ও গুরুতর বিরোধ নেই—এ কথা কেউ বলছে না। সীমান্তে হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, অশুল্ক বাধা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের কঠোর ও সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা জরুরি। প্রয়োজন হলে দিল্লির সঙ্গে কঠিন দর-কষাকষিও করতে হবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। সীমান্ত সমস্যার দায় সবসময় দিল্লির নয়; অনেক সমস্যার ঠিকানা ঢাকা। কিন্তু ভারতের সঙ্গে যে বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থের সংঘাত আছে, সেটিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে মোকাবিলা করা আর দেশের প্রতিটি সমস্যার সঙ্গে ভারতকে জুড়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। বরং অন্ধ ভারতবিরোধিতা অনেক সময় প্রকৃত জাতীয় স্বার্থেরই ক্ষতি করে। কারণ স্লোগান যখন যুক্তিকে প্রতিস্থাপন করে, তখন কোন চুক্তিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোন বাণিজ্যিক শর্ত অসম, কোন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া যাচ্ছে না কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোথায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ব্যর্থতা রয়েছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এই কৌশল দেশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির প্রশ্নকেও দুর্বল করে দেয়। সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যর্থতার ব্যাখ্যা না দিয়ে বারবার বাইরের কোনো শক্তিকে দায়ী করে, তখন জনগণের স্বাভাবিক প্রশ্ন—“আমাদের নিজেদের দায় কোথায়?”—সেটিই হারিয়ে যায়। দেশের সমস্যার দায় সবসময় দিল্লির নয়; অনেক সমস্যার ঠিকানা ঢাকা। যে সরকার সত্যিই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণ করতে চায়, তাকে এই সত্য স্বীকার করার সাহসও রাখতে হবে।

আসল নতজানু অবস্থার নমুনা কোথায়?

খলিলুর রহমান যদি সত্যিই ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বলতে কী বোঝাতে চান, তাহলে শুধু ভারতের দিকে তাকালে হবে না; তাঁকে তাকাতে হবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর দিকেও। ইউনূস সরকারের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দর-কষাকষির সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশ্য মার্কিন নথিতে বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশ কর্তৃক বিপুল পরিমাণ মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার অঙ্গীকারের কথাও এসেছে।

এখানে প্রশ্ন আমেরিকা থেকে গম কেনা যাবে কি যাবে না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কী দামে, কী শর্তে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল? কোন পণ্য কত দামে কেনা হবে, আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় সেই দাম কত, বাংলাদেশের কৃষক ও রপ্তানিকারক কী পেলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ কতটা সহজ হলো এবং বাণিজ্য ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে থাকা উচিত।

রাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে একটি শক্তিশালী দেশের বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে তার কৃষিপণ্য কেনার অঙ্গীকার করতে হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই কঠিন দর-কষাকষির বিষয়। এটিকে সরাসরি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ প্রমাণ বলা যেমন অতিরঞ্জন হবে, তেমনি এর মধ্যে অসম দর-কষাকষির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেও অযৌক্তিক বলা যাবে না।

আর রুশ জ্বালানির প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর প্রভাব এড়াতে ওয়াশিংটনের ছাড় চেয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে বিষয়টি সরাসরি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের ‘অনুমতি নেওয়া’ নয়; বরং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কোন উৎস থেকে জ্বালানি কিনবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যদি তাকে কোনো পরাশক্তির নিষেধাজ্ঞা, ছাড় কিংবা সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হিসাব করতে হয়, তাহলে তার কৌশলগত স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এটাই সেই জায়গা, যেখানে ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ শব্দটি সত্যিকার অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

 যত গর্জন, তত নির্ভরতা?

ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেক ধরনের দ্বৈততা দেখা যায়। একদিকে ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়, অন্যদিকে বাস্তব প্রয়োজনের মুহূর্তে ভারতের বাজার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হতে পারে। একই সময়ে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানির প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসতে পারে। এতে কোনো মৌলিক বৈপরীত্য নেই; বরং এটাই রাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা।

একটি রাষ্ট্র কোনো দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে পারে, কিন্তু একই দেশের কাছ থেকে অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় পণ্যও কিনতে পারে। সার্বভৌমত্ব মানে বাজার বন্ধ করে দেওয়া নয়; সার্বভৌমত্ব মানে নিজের স্বার্থে সম্পর্ক পরিচালনা করা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে: এই সম্পর্ক কি সত্যিই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি একদিকে রাজনৈতিক গর্জন এবং অন্যদিকে বাস্তব নির্ভরতার দ্বৈতনীতি চলছে?

ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সংযোগের যে অবকাঠামো আজ প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হচ্ছে, তার অনেকটাই আগের সরকারের সময়ে নির্মিত। তখন সেই অবকাঠামোকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধিতা হয়েছে, নানা ধরনের প্রচারণা হয়েছে, এমনকি সাম্প্রদায়িক আবেগও উসকে দেওয়া হয়েছে। আজ বাস্তবতা যদি সেই প্রচারণাকে অকার্যকর প্রমাণ করে, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও সেই বাস্তবতা স্বীকার করার সাহস থাকা উচিত। রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো দলের নির্বাচনী স্লোগানের বিষয় নয়।

তুরস্কের প্রশংসা !

খলিলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশংসার কথাও বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তুরস্ক মনে করে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আবার দৃশ্যমান হচ্ছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব স্বীকার করলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু কূটনীতিতে একটি পুরোনো সত্য আছে—রাষ্ট্র গুলো প্রশংসা করে স্বার্থ ছাড়া নয়। বাংলার মানুষ আরও সরলভাবে বলে—বড়োর প্রেম শুধু কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও তাই ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করতে হবে। মুসলিম বিশ্বের কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিজে থেকেই ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কোনো মুসলিম পরিচয় ভিত্তিক জোটে যুক্ত হলেই সেটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে—এমন সরল সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে কোনো নতুন নিরাপত্তা-সমীকরণ যদি বাংলাদেশকে ইরানসহ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে সেটিকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য বলা কঠিন; সেটি এক বলয় থেকে আরেক বলয়ে সরে যাওয়ার নামও হতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি। ঢাকার দরজা দিল্লির জন্য খোলা থাকবে, কিন্তু দিল্লির জন্য বাংলাদেশের নীতির চাবি থাকবে না। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ওয়াশিংটনের অনুমোদন বাংলাদেশের জ্বালানি বা পররাষ্ট্রনীতির পূর্বশর্ত হবে না। বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু চীনা স্বার্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিকল্প হবে না। আঙ্কারা, রিয়াদ, ইসলামাবাদ বা অন্য কোনো রাজধানীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বন্ধুত্বকে কৌশলগত আনুগত্যে পরিণত করা যাবে না।

এক প্রভুর বদলে আরেক প্রভু—এটা স্বাধীনতা নয়

জুলাইয়ের রক্ত,  আত্মত্যাগ এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই তিনটি ধারণাকে সামনে রেখে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার যে স্বাধীনতার অঙ্গীকার উচ্চারিত হচ্ছে, সেটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা আবেগঘন বক্তৃতা, স্মরণ সভা কিংবা রাজনৈতিক ঘোষণায় নয়, বরং তার নির্ভরতার ধরন এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সে কতটা স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থ নির্ধারণ ও রক্ষা করতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।

পুরোনো কোনো শক্তির রাজনৈতিক বা কৌশলগত প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে যদি বাংলাদেশ অন্য কোনো শক্তির কৌশলগত বলয়ে প্রবেশ করে এবং সেই নতুন শক্তির স্বার্থ, প্রত্যাশা কিংবা নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নির্ধারক প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তাহলে শুধু প্রভুর পরিচয় বদলেছে বলেই সেটিকে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বলা যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সে বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গেও প্রয়োজনের জায়গায় মতভেদ করতে পারে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং নিজের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কোনো বিদেশি শক্তির স্বার্থের সংঘাত হলে কোনো রাজনৈতিক সংকোচ ছাড়াই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে।

জুলাইয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকা কোনো ব্যক্তি যদি জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থায় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা প্রয়োজনের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান, সেটিকে নিজেই কোনো অপরাধ বা অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না; কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব পাওয়ার নৈতিক বৈধতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় দায়িত্ব পালনের দক্ষতা, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বাস্তব সক্ষমতার মাধ্যমে। ফলে ড. খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অতীত নয়; বরং তিনি যে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রের স্বাধীনতার অঙ্গীকারের কথা বলছেন, তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবে সেই অঙ্গীকার কতটা ধারণ করছে, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

ইউনূস সরকারের সময়ে তাঁকে বিদেশ থেকে এনে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—এই রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, প্রশ্নও উঠতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কে আটকে গেলে মূল বিষয়টি আড়ালে চলে যাবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক এবং যে ব্যক্তিই পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্বে থাকুন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সীমা ও অগ্রাধিকার কি ঢাকায় বসেই নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি ওয়াশিংটন, দিল্লি, বেইজিং, মস্কো, আঙ্কারা কিংবা অন্য কোনো রাজধানীর প্রত্যাশা ও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াকে হিসাব করে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের পরিসর আগে থেকেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তিগত আনুগত্য, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্যের ভাষায় পাওয়া যাবে না; এর উত্তর পাওয়া যাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বাস্তব ফলাফলে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সক্ষমতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন সে নিজের প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী প্রয়োজনের মুহূর্তে ‘না’ বলতে পারে, এমনকি সেই ‘না’ যদি কোনো ঘনিষ্ঠ বা শক্তিশালী রাষ্ট্রের পছন্দের বিরুদ্ধে যায়; একইভাবে প্রয়োজনের মুহূর্তে যে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিরোধী মনে করা হয়, তার সঙ্গেও জাতীয় স্বার্থে বাণিজ্য, যোগাযোগ কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতা করতে পারে এবং কোনো পরাশক্তির অসন্তোষ বা সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাকে নিজের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের একমাত্র নিয়ামক হতে না দেয়।

এই পরীক্ষাটি ভারতের ক্ষেত্রেও যেমন প্রযোজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া কিংবা অন্য যে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই প্রযোজ্য। বাংলাদেশ যদি দিল্লির অন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান নিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের চাপের ক্ষেত্রেও একই দৃঢ়তা দেখাতে না পারে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নয়। আবার ভারতবিরোধিতার নামে যদি বাংলাদেশ এমন কোনো নতুন ভূরাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করে, যেখানে অন্য একটি শক্তির কৌশলগত স্বার্থ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলেও সেটিকে স্বাধীনতার সাফল্য বলা যাবে না। তুরস্ক, সৌদি আরব কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা নিরাপত্তাগতভাবে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু তাদের প্রশংসা বা রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে এমন কোনো কৌশলগত আনুগত্যে পরিণত করা যাবে না, যার ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলেও ঢাকা সেই সম্পর্কের কারণে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

জুলাইয়ের নামে সবচেয়ে বড় দায়

খলিলুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের শহীদরা তাঁদের হাতে একটি বড় দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। এই বক্তব্যের নৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কারণ যে রাষ্ট্রব্যবস্থা জুলাইয়ের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বৈধতার দাবি করে, সেই রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতাও স্বাভাবিকভাবেই অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু শহীদদের প্রতি দায়িত্ব কেবল স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ কিংবা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাঁদের নাম উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; সেই দায়িত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা।

শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যদি একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এমন হওয়া উচিত যেখানে কোনো বিদেশি রাজধানীর রাজনৈতিক সন্তুষ্টি, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা কৌশলগত প্রত্যাশা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ওপর স্থান পাবে না। এই নীতি কোনোভাবেই ভারতবিরোধী, আমেরিকাবিরোধী, চীনবিরোধী, রাশিয়াবিরোধী কিংবা মুসলিম বিশ্বের বিরোধী নীতি নয়; এর একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত—এটি বাংলাদেশপন্থী নীতি, যেখানে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্যায়ন করা হবে বাংলাদেশের স্বার্থের ভিত্তিতে এবং কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বকে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত করা হবে না।

বাংলাদেশের জনগণ পুরোনো কোনো প্রভুর জায়গায় নতুন কোনো প্রভুকে বসিয়ে সেটিকে নতুন স্বাধীনতা হিসেবে দেখতে চায় না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যে রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় বাণিজ্য করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চুক্তি করবে, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনবে, চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা করবে, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর করবে এবং সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবে; কিন্তু এসব সম্পর্কের কোনোটিকেই এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে না, যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোনো বিদেশি রাজধানীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এই জায়গাতেই ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রকৃত পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে একটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা যতটা সহজ, সেই শব্দটির প্রকৃত অর্থকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বলা সহজ, জুলাইয়ের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা সহজ, সার্বভৌমত্বের কথা বলা সহজ; কিন্তু কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির টেবিলে বসে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, অসম কোনো শর্ত প্রত্যাখ্যান করা, বাণিজ্যিক দর-কষাকষিতে সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনুমোদনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা অনেক কঠিন কাজ।

স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা আরও কঠিন হয় তখন, যখন একই নীতি সব শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে এবং অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো শক্তির ক্ষেত্রেও একই নীতিতে অটল থাকতে হবে। একইভাবে তুরস্ক, সৌদি আরব বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং বাংলাদেশের স্বার্থের মধ্যে কোনো সংঘাত তৈরি হলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে। কারণ কোনো রাষ্ট্রের প্রশংসা গ্রহণ করা কূটনৈতিক সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেই প্রশংসার বিনিময়ে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া কখনোই সাফল্য নয়।

অতএব বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি হলো—আমরা কি সত্যিই একটি নির্ভরশীল রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটছি, নাকি কেবল নির্ভরতার কেন্দ্র পরিবর্তন করছি? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো স্মরণসভায়, রাজনৈতিক বক্তৃতায় কিংবা ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ শব্দের পুনরাবৃত্তিতে পাওয়া যাবে না; উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তির শর্তে, জ্বালানি নীতির স্বাধীনতায়, সীমান্ত ও পানি বণ্টনের দর-কষাকষিতে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রকৃত কাঠামোয় এবং দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো, আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কতটা নিজস্ব স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তার বাস্তব প্রমাণে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসবে সেই মুহূর্তে, যখন কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর এমন কোনো চাপ সৃষ্টি করবে, যা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই মুহূর্তে ঢাকা যদি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখেও স্পষ্টভাবে জানাতে পারে যে বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অংশীদারিত্ব চায়, কিন্তু নিজের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অধিকার কোনো বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেবে না, তখনই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কথাটি রাজনৈতিক স্লোগান থেকে রাষ্ট্রনীতির বাস্তব দর্শনে পরিণত হবে।

তার আগে পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যাবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে, নাকি শুধু কার ছায়ার নিচে দাঁড়াবে, সেই সিদ্ধান্তটুকুই পরিবর্তিত হয়েছে?

তথ্য সূত্র :
১. জুলাইয়ের অন্যতম শিক্ষা হলো বাংলাদেশ কখনোই আর ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হবে না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রথম আলো। ০৬ আগস্ট ২০২৬।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!