[ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের একাধিক জায়গায় কয়েক মাসের মধ্যে বোমা কিংবা বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। এরমধ্যেই, সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (একিউআইএস) একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নিচ্ছে। বড় ইউনিটের বদলে তারা ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কাজ করছে এবং শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। উদ্বেগের বিষয়, সংগঠনটি বাংলাদেশে নতুন সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, একিউআইএসের শীর্ষ নেতৃত্ব আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের তালেবান-প্রদত্ত পরিচয়পত্র (তাজকিরা) রয়েছে। ১০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। সূত্র : বিবিসি বাংলা ১৫ অগাস্ট ২০২৬। ]
রাষ্ট্র যখন ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে দিক্বিদিক হারিয়ে ফেলে, তখন ভূখণ্ডের অন্দরে ডালপালা মেলে হিংসা ও অন্ধকারের পুরনো সিন্ডিকেট। বিশ্ব রাজনীতির গতিধারায় ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট যেখানে এসে মিলেছে, সেখানে সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) মনিটরিং টিমের প্রতিবেদন এক চরম উদ্বেগের বার্তা বয়ে এনেছে। প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ‘আল কায়দা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (AQIS)-এর পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে নতুন আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের যে অভিযোগ জাতিসংঘের দলিলে উঠে এসেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অদূরদর্শী পদক্ষেপের এক নির্মম ফসল।
কয়েদখানার তোরণ উন্মোচন ও শূন্যতার সুযোগ:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নজিরবিহীন সামাজিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন কারাগার থেকে চিহ্নিত চরমপন্থী ও সহিংসতাকামী অপরাধীদের মুক্তি পাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনে গভীর দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছিল। আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির শিথিলতার সেই সুযোগে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। যখন কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়ে, তখন তার সুদূরপ্রসারী খেসারত দিতে হয় অখণ্ডতা দিয়ে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলো তাদের সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন ও প্রচার-প্রচারণার নতুন ঘাটি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। অবাধ রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষণ শিবিরের অস্তিত্ব প্রকাশ পাওয়ার পেছনে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক সিন্ডিকেটের পরোক্ষ সহায়তার অভিযোগ ঐতিহাসিকভাবে উপেক্ষা করার মতো নয়।
আফগান-পাক অক্ষ ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাকড়সার জাল:
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আফগানিস্তানের তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশের আশ্রয়-প্রশ্রয় দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদের অন্যতম চালিকাশক্তি। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুসারে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তুরস্কভিত্তিক সীমান্ত পারের কানেকশনগুলোর সাথে আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের পুনঃসংযোগ স্থাপিত হয়েছে।
বিশেষ করে, ভারতকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ প্রক্সি জোন’ বা লঞ্চপ্যাড হিসেবে ব্যবহারের দীর্ঘদিনের যে কৌশলগত চক্রান্ত, তা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশকে চাপে রাখার এই নোংরা ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশ কোনো সুবিধা পাবে না; বরং নিজের ভূখণ্ডকে অপরের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার চরম মূল্য দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক:
আফগানিস্তান/পাকিস্তান/অন্যান্য
▼
আঞ্চলিক লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণ হাব
▼
সীমান্ত পারের অস্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ
নিরাপত্তা সংকট
বোমার আলামত ও অদূরদর্শিতার খেসারত:
বিগত দিনগুলোতে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় বিস্ফোরক ও বোমার আলামত উদ্ধারের ঘটনাগুলো কেবল সাধারণ অপরাধের চিত্র নির্দেশ করে না; বরং তা কোনো বড় ষোলোআনা পরিকল্পনার মহড়া মাত্র। জাতিসংঘের রিপোর্ট যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বাংলাদেশের নামকে এভাবে দাগিয়ে দেয়, তখন তা বহির্বিশ্বে দেশটির ভাবমূর্তি, বিনিয়োগ এবং শ্রমবাজারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
শেষ কথা
অরণ্যে বাতাস বইলে পাতা ঝড়ে, কিন্তু অরণ্যের হৃদয়ে যখন আগুন লাগে, তখন সবুজ সুজলা-সুফলা প্রান্তর ভস্মীভূত হয়ে কেবল ছাই পড়ে থাকে। যে রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ এক অসাম্প্রদায়িক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, আজ আন্তর্জাতিক ছায়াযুদ্ধের উর্বর ভূমিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে তার অস্তিত্ব কাঁদছে।
জাতিসংঘের এই বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক দালিলিক সতর্কবার্তা যদি আজ রাজনৈতিক অস্বীকারের সংস্কৃতিতে চাপা পড়ে যায়, তবে সেই উপেক্ষা একদিন গোটা জাতিকেই গ্রাস করবে।
উগ্রবাদ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পরম বন্ধু নয়, ঐতিহাসিক সত্য যে- তা যাকে আশ্রয় দেয়, প্রথম আঘাতটি তাজেই করে। সময় এসেছে বাস্তবতাকে অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং দেশের মাটি থেকে যেকোনো রূপ উগ্রবাদের শিকড় উপড়ে ফেলার।
১৫.০৮.২৬