শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! বারিধারায় মেহেদীর মৃত্যু: টাকার জোরে কি এবারও পার পেয়ে যাবে কেউ? চাকরি খুঁজতে এসে লাশ হয়ে ফেরা মরিয়ম “অপ্রতিমের হাতে আইফোন, অপরাধীর হাতে আইন কোথায়?” একবেলা ভাতের জন্য খুন: অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে  সমাজ ! হত্যার পর বিচার কোথায়: শিশু থেকে সংখ্যালঘু—আইনের শাসনের পরীক্ষায় বাংলাদেশ বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: এখনই সময় নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর মেধা না বিশেষ সুবিধা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে? রংপুর ৪ খুন : আসামির আইনজীবী না থাকা কি ন্যায়বিচার? মক্কা প্যাক্ট: পবিত্র নামের আড়ালে নতুন যুদ্ধের রাজনীতি রংপুরের চার খুন: গ্রেপ্তারের পরও যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন

বারিধারায় মেহেদীর মৃত্যু: টাকার জোরে কি এবারও পার পেয়ে যাবে কেউ?

যমুনা রহমান
Update : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বারিধারার অভিজাত এলাকায় ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। একটি দ্রুতগতির প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাঁকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ। নীলফামারীর ডোমার থেকে ঢাকায় এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঈদের আগে টাকা জমিয়ে বাড়িঘর মেরামত করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ঢাকায় আসার পরদিনই সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

মেহেদীর মৃত্যু নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনা—এভাবে ঘটনাটি শেষ করে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ দুর্ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, গাড়িটি আসলে কে চালাচ্ছিলেন?

প্রত্যক্ষদর্শীরা গাড়ির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। পুলিশও তাকে হেফাজতে নেয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে গাড়ির চালকের পাশের দরজা দিয়ে ওই কিশোরকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মামলায় চালক হিসেবে আসামি করা হয়েছে ৪৪ বছর বয়সী আকাশ মারককে। তিনি ঘটনার পর থেকে পলাতক।

এখানেই সন্দেহের জায়গাটি তৈরি হয়েছে। যদি ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত থেকে প্রকৃত চালকের পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, তাহলে তদন্তকারীদের সেটি স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে আনতে হবে। আর যদি ভিডিও বা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ভুল হয়, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে।

কিন্তু কোনো অবস্থাতেই একজন দরিদ্র নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যুর মামলায় চালক কে ছিলেন—এই মৌলিক প্রশ্নটি অনিশ্চিত রেখে বিচার এগোতে পারে না।

আর এখানেই আসে বাংলাদেশের পুরোনো বাস্তবতা।

মেহেদী ছিলেন শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে গাড়িটির মালিকানা একটি সচ্ছল পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়িটি কিশোরটির মায়ের নামে নিবন্ধিত এবং তাঁর বাবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন ক্যাপ্টেন। কারও ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া অপরাধ নয়। কিন্তু অর্থ ও সামাজিক অবস্থান যেন তদন্তে কোনো বিশেষ সুবিধা তৈরি না করে, সেটিই রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ বাংলাদেশের মানুষ এমন ঘটনা আগেও দেখেছে।

ঢাকার আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনার মামলাগুলোর অতীত খুব আশাব্যঞ্জক নয়। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে আলোচিত ১২টি সড়ক দুর্ঘটনার মামলার চিত্র উঠে এসেছিল। সেখানে দেখা যায়, মামলা হলেও তদন্ত এগোয়নি প্রত্যাশিত গতিতে; ১২টির মধ্যে মাত্র একটি মামলার বিচার শুরু হয়েছিল এবং ১৩ জন আসামি তখনও গ্রেপ্তার হননি।

এটাই আমাদের বিচারব্যবস্থার একটি ভয়াবহ দুর্বলতা। কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথম কয়েক দিন তৎপরতা দেখা যায়। মামলা হয়। পুলিশ বক্তব্য দেয়। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়। তারপর সময় চলে যায়। মানুষের মনোযোগ অন্য ঘটনায় চলে যায়। আর মামলা ঢুকে পড়ে দীর্ঘসূত্রতার অন্ধকারে।

গুলশান-বনানী ও অভিজাত ঢাকার সড়কে দামি গাড়ির বেপরোয়া ব্যবহার নিয়েও বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। গভীর রাতে দামি গাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতা, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো এবং দুর্ঘটনার খবর নতুন নয়। এমনকি ‘ড্রাগ রেসিং’-এর মতো বিপজ্জনক প্রবণতার কথাও পুলিশের বক্তব্যে এসেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—অভিজাত এলাকার রাস্তা কি আইনের বাইরে?

সেখানে নিহত মানুষটি যদি শ্রমিক হয়, তাঁর পরিবারের হাতে যদি আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকে, মামলা চালানোর অর্থ না থাকে, তাহলে কি তাঁর ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাও কমে যায়?

আইনের বইয়ে উত্তর অবশ্যই ‘না’। বাস্তব অভিজ্ঞতা কিন্তু অন্য প্রশ্ন তৈরি করে।

এই দেশে দরিদ্র পরিবারকে প্রায়ই দুটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। একদিকে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি মারা গেছেন; অন্যদিকে দীর্ঘদিন মামলা চালানোর মতো অর্থ নেই। ফলে ক্ষতিপূরণের নামে দ্রুত সমঝোতা করার চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা তখন ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু একটি প্রাণের দাম কেবল কয়েক লাখ টাকা দিয়ে মেটানো যায় না। ক্ষতিপূরণ এবং ফৌজদারি দায়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

মেহেদীর ঘটনায় তাই এখন দরকার লোক দেখানো তৎপরতা নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। গাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা, চালকের আসনে কে ছিলেন, গাড়িতে কারা ছিলেন এবং ঘটনার পর কে কোথায় গেছেন—সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকৃত চালক যেই হোন, তাঁর পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। ধনী কিংবা দরিদ্র—কোনো পরিচয়ই আইনের বিকল্প হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই মামলাকে যেন আরেকটি ‘কিছুদিনের খবর’ হতে দেওয়া না হয়।

কারণ মেহেদীর পরিবার শক্তিশালী নয়। তারা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তাদের হাতে সংবাদমাধ্যম নেই, রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, অর্থের প্রাচুর্য নেই। তাদের একমাত্র ভরসা আইন।

সেই আইন যদি শেষ পর্যন্ত অর্থ ও প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে মেহেদীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হবে না; সেটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ধারণাকেও আঘাত করবে।

আর এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।

এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মামলা হয়েছে, তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিছুদিন তৎপরতাও দেখা গেছে। কিন্তু অর্থ, সামাজিক অবস্থান ও প্রভাবের কারণে অভিযুক্তরা শেষ পর্যন্ত আইনের কঠিন পরিণতি এড়িয়ে গেছে—এমন অভিজ্ঞতা ও ধারণা সমাজে তৈরি হয়েছে।

মেহেদীর ঘটনাও যদি শেষ পর্যন্ত সেই একই পথে যায়, তাহলে মানুষের কাছে বার্তাটি হবে ভয়াবহ: আইন সবার জন্য সমান নয়; যার টাকা আছে, যার প্রভাব আছে, তার পার পাওয়ার পথও আছে।

এই ধারণা ভাঙার দায়িত্ব পুলিশের, তদন্ত সংস্থার এবং আদালতের। মেহেদীর পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের দায় শুধু মামলা নেওয়া নয়—ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

মেহেদী আর ফিরে আসবেন না। তাঁর পরিবারের স্বপ্নও আগের জায়গায় ফিরবে না। অন্তত তাঁর মৃত্যুর পর যেন আরেকটি অন্যায় না ঘটে—এইটুকু নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের পরীক্ষা।

নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে: ফুটপাতে বসা গরিব মানুষের জীবন কি দামি গাড়ির চাকার নিচে চাপা পড়লেই আইনের কাছেও সস্তা হয়ে যায়?


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!