সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন

জাসদ অফিসে হামলা ও গ্রেফতার : ২৮৯ জন আটক

সমসমাজ প্রতিবেদক।
Update : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জাসদ কার্যালয়ে ২৮৯ জনকে আটকের পর তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হয়েছে—অর্থাৎ আগে আটক, পরে যাচাই। এর সঙ্গে আটকের সময় ‘আওয়ামী লীগের লোক’ বলে সরকারি ভাষ্য প্রচার করে গ্রেপ্তারকে বৈধ ও যৌক্তিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এই পদ্ধতিই সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

কোনো মানুষকে আটক করার আগে তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, কী প্রমাণ এবং কোন আইনি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—সেটি নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয় সেই আইনি ভিত্তির বিকল্প হতে পারে না। অথচ জাসদ কার্যালয়ের ঘটনায় প্রথমে বলা হলো, সেখানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা জড়ো হয়েছেন; এরপর ২৮৯ জনকে আটক করা হলো; পরে বলা হলো, যাচাই-বাছাই করে জাসদের নেতা-কর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হবে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পুলিশের এই বক্তব্যগুলোই এসেছে।

এখানে প্রশ্নটি তাই খুব সরল: যদি আটক ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করার প্রয়োজনই থাকে, তাহলে তাদের আটকের আগে সেই যাচাই করা হলো না কেন? আর যদি পুলিশের হাতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ থাকে যে সেখানে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সদস্যরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জড়ো হয়েছেন, তাহলে সেই নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ প্রকাশ করা হোক। ‘আওয়ামী লীগের লোক’—এটি কোনো অপরাধের নাম নয়।

জাসদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে তাদের পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলছিল এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। দলটি আরও বলেছে, জাসদ নিষিদ্ধ নয় এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সুতরাং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আলাদা অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হতে পারে; কিন্তু একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সভায় উপস্থিত থাকার কারণে কাউকে আটক করার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ আলাদা।

ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, আটকের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ভাষ্যটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ‘আওয়ামী লীগের লোকজন জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছে’—এই বক্তব্য সংবাদে জায়গা পাওয়ার পর জনমনে একটি ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। পরে আটক ব্যক্তিদের ছবি, ভিডিও ও পরিচয় প্রকাশিত হলে সংবাদে সংশোধন বা পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু প্রথম সরকারি ভাষ্যটি যে রাজনৈতিক ধারণা তৈরি করেছে, তা শুধু পরবর্তী সংবাদ পরিবর্তনের মাধ্যমে মুছে যায় না। রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা যখন শত শত মানুষকে আটক করে, তখন তাদের সম্পর্কে প্রাথমিক বক্তব্যও অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও যাচাই করা হওয়া প্রয়োজন।

এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রশ্নও আছে। পুলিশের বক্তব্য সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা অবশ্যই সংবাদমাধ্যমের কাজ; কিন্তু পুলিশের অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠিত সত্য এক জিনিস নয়। বিশেষ করে যখন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়কে আটকের কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়, তখন সেই দাবিকে যাচাই না করে ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ বা ‘তথ্য’  হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়। পরে যদি দেখা যায় আটক ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ জাসদের নেতা-কর্মী, তাহলে প্রথম সরকারি ভাষ্যের রাজনৈতিক ক্ষতি একটি সংশোধিত সংবাদ দিয়ে পুরোপুরি দূর হয় না।

আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার: জাসদ নিষিদ্ধ নয়। দলটির রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, অতীত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কোনো নেতার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগও থাকতে পারে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রশ্নকে একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে উপস্থিত সব মানুষের বিরুদ্ধে গণহারে আটকের ভিত্তি বানানো যায় না।

রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই সীমারেখাটিই গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের অভিযোগ থাকলে ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে; রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সন্দেহভাজন বানানো যাবে না। আওয়ামী লীগ, জাসদ, বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দল বা এক রাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের নজির কম নেই। ক্ষমতার পালাবদলের পর যদি একই পদ্ধতি নতুন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বদলায় না; শুধু তার লক্ষ্য বদলায়। অতীতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে বর্তমানের একই ধরনের পদ্ধতিকে বৈধতা দেওয়া যায় না।

সরকার যদি দাবি করে যে জাসদ কার্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছিল, তাহলে সেই দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ প্রকাশ করা উচিত। কারা কী অপরাধ করেছে, কোন আইনে করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ রয়েছে—সরকারের জবাবদিহির জায়গা এখানেই। শুধু ‘ওরা আওয়ামী লীগের লোক’—এমন একটি রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে শত শত মানুষকে আটক করা এবং পরে তাদের পরিচয় যাচাই করা আইনের শাসনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না।

রাষ্ট্রের কাজ রাজনৈতিক পরিচয় বাছাই করা নয়; অপরাধ শনাক্ত করা। কে কোন দল করে, সেটি নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়। সে অপরাধ করেছে কি না, সেটিই রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের প্রশ্ন।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ২৮৯ জনের মধ্যে কে আওয়ামী লীগ আর কে জাসদ—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কী অপরাধের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয়েছিল এবং সেই অপরাধের প্রমাণ কোথায়? সরকারের কাছে সেই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাবদিহি প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক পরিচয়কে যদি আটকের কারণ বানানো হয়, তাহলে আজ জাসদ কার্যালয়, কাল অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়—শেষ পর্যন্ত এর শিকার হতে পারে যে কোনো নাগরিক। আইনের শাসনে আগে অপরাধ নির্ধারিত হয়, তারপর গ্রেপ্তার। আগে রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করে পরে অপরাধ খোঁজা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ খুলে দেয়।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!