সৌদি আরবে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অথচ সেই সৌদি আরবেই কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগ বারবার সামনে আসে। কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে, কেউ ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী অবস্থায় দেশে ফেরেন; নারী শ্রমিকের মৃত্যু ও হত্যার অভিযোগও ওঠে। মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় রাষ্ট্র এত কঠোর, কিন্তু গৃহকর্তার বাড়িতে নির্যাতিত নারীর শরীর ও জীবনের মর্যাদা রক্ষায় সেই তৎপরতা কোথায়? পাথরের স্থাপনার মর্যাদা মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠলে সেই নৈতিকতার হিসাব চাইতেই হবে।
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ ছিল, প্রকাশিত বিবৃতিতে তার বিস্তারিত নেই। বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তাঁরা আত্মপক্ষ সমর্থন ও আপিলের যথাযথ সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। বাংলাদেশের সরকার সৌদি আরবের কাছে কী ব্যাখ্যা চেয়েছে, কী কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, তা-ও স্পষ্ট হওয়া দরকার। ভারতের সঙ্গে বিরোধ হলেই যারা জাতীয় মর্যাদা ও চোখে চোখ রেখে কথা বলার বুলি আওড়ান, সৌদি আরবের ক্ষেত্রে তাঁদের কণ্ঠ নিচু হয়ে যায় কেন? রাষ্ট্রের মর্যাদা শুধু প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে গর্জন নয়; নিজের নাগরিকের অধিকার রক্ষায় প্রতিটি বিদেশি রাষ্ট্রের সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো।
নারী শ্রমিকেরা বিদেশে যান পরিবারের অভাব ঘোচাতে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে, নিজেদের জীবন বদলাতে। কিন্তু নিয়োগকর্তার বাড়িতে তাঁরা যদি যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, বেতন না পাওয়া কিংবা আটকে রাখার শিকার হন, তাহলে তাঁদের পাশে দাঁড়াবে কে? ব্যক্তিগত বাড়ি বলে কি সেখানে আইনের শাসন থাকবে না? দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক আর ধর্ষণ এক নয়। সম্মত যৌনতাকে ‘অনৈতিকতা’র তকমা দিয়ে শাস্তি দেওয়া সহজ; কিন্তু ক্ষমতাবান নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা একজন অসহায় নারীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করাই নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা।
নির্যাতিত নারীকে দেশে ফিরিয়ে আনলেই বাংলাদেশের দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর অভিযোগ নথিবদ্ধ করা, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেওয়া এবং অপরাধীর বিচার ও ক্ষতিপূরণের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নারী শ্রমিক পাঠানোর আগে নিয়োগকর্তা যাচাই, চুক্তি অনুযায়ী বেতন এবং বিপদে পড়লে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সাফল্যের দাবি অর্থহীন।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি বড় অংশের বক্তব্যে ভারতবিরোধিতা ও পশ্চিমবিরোধিতা নিয়মিত জায়গা দখল করে। ভারতের মুসলমানদের অধিকার কিংবা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করা অবশ্যই বৈধ। কিন্তু সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে একই কণ্ঠের প্রতিবাদ কোথায়? মানবাধিকারের প্রশ্নে কি সৌদি আরবকে ছাড় দেওয়া হবে, শুধু দেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে?
সৌদি সরকারের সমালোচনা ইসলামবিদ্বেষ নয়। একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, শ্রমনীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনা করা আর মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। পশ্চিমা দেশগুলোরও বর্ণবাদ, শ্রমিক শোষণ ও অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যের সমস্যা রয়েছে। তবে বহু পশ্চিমা দেশে আইনি সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিধান রয়েছে, যদিও বাস্তবে তার প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনার সুযোগ আছে। পশ্চিমের অন্যায় নিয়ে কথা বলা জরুরি, কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে নীরবতা কেন? মানবাধিকারের মাপকাঠি কি ওয়াশিংটন, দিল্লি ও রিয়াদের জন্য আলাদা?
বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি স্পষ্ট: দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিচারিক ভিত্তি ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে হবে; নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের অভিযোগ তদন্ত, আইনি সুরক্ষা, অপরাধীর বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। এসব বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ ও অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে। ভারতের ক্ষেত্রে যে জবাবদিহি দাবি করা হয়, সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
মসজিদের পবিত্রতা নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন: একজন জীবন্ত নারীর শরীর কি পবিত্র নয়? তাঁর সম্মতি, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার কি ধর্মীয় নৈতিকতার বাইরে? যে রাজনৈতিক শক্তি ভারত ও পশ্চিমের বিরুদ্ধে সোচ্চার, অথচ সৌদি আরবের অন্যায়ের অভিযোগে নীরব থাকে, তাদের মানবাধিকারের ভাষ্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের জীবন, শ্রম ও শরীরের মর্যাদা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের দয়া নয়—এটি তাঁর অধিকার। ধর্মীয় পবিত্রতার দাবি কোনো রাষ্ট্রকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।