শিরোনাম
ট্রাম্প শাসন : সংকটের বিহ্ববলতা ইউনুস শাসনামল ! ইউনুস নীতি ! পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো গরু ভোজের বিতর্ক: অধিকারের মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নেহা বোরা বাংলাদেশের আন্দোলনের পাঠ : ফিরে ফিরে আসে দুষ্ট ক্ষত রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’: যৌন কৌতূহলের আড়ালে দুর্বল কূটনীতি মসজিদের পবিত্রতা এবং নারী শ্রমিকের জীবনের মর্যাদা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় : খাদ্যের স্বাধীনতা, নাকি ধর্মীয় দাপট? সাতক্ষীরায় মব সন্ত্রাস: উসকানিদাতা প্রকাশ্যে, রাষ্ট্র নীরব কেন? যে ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না: চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ভূরাজনৈতিক পরিণতি চে গুয়েভারা: কিংবদন্তি, ও বাস্তবতা  চট্টগ্রাম বন্দর: বিদেশি পুঁজির স্বার্থ, অস্বচ্ছ চুক্তি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১০ পূর্বাহ্ন

পরপর দ্বিতীয় দিনের মতো গরু ভোজের বিতর্ক: অধিকারের মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

সমসমাজ প্রতিবেদন।
Update : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

দুর্গাপূজার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার স্থান নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর আপত্তি থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। ১২ অক্টোবরের এই ঘটনার পর ১৪ অক্টোবর প্রশাসন ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানায়। প্রতিবাদে ১৬ অক্টোবর জকসু এবং পরদিন বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গরুভোজের আয়োজন করে।

বিতর্কটি নতুন মাত্রা পায় যখন বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আবারও গরুভোজের আয়োজন করে। শনিবার সকালে উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে গরু জবাই এবং বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গরুর মাংসের তেহারি বিতরণ করা হয়। রাতে আয়োজন করা হয় কাওয়ালি অনুষ্ঠান।

এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট। গরুর মাংস খাওয়া ও পরিবেশন করা নাগরিকের অধিকার। ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাতে এই অধিকার খর্ব করা যায় না। কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে অন্য সম্প্রদায়কে উসকানি দেওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত সাম্প্রদায়িক চাপের ফল কি না, তা নির্ধারণে বিজ্ঞপ্তির কারণ ও ব্যাখ্যা যাচাই করা জরুরি। ক্যাম্পাসে পশু জবাই, খাবার বিতরণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা থাকতে হবে এবং তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতার দ্বিচারিতা

বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার দাবি প্রায়ই জোরালো হয়; কিন্তু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সমান নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ বলা হয়, অথচ সংখ্যালঘুর অধিকার খর্ব হলে একই রকম প্রতিবাদ দেখা যায় না। এই দ্বৈত মানদণ্ডই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তি।

কোনো ধর্মীয় পরিচয় বিশেষ অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না, আবার কারও বৈধ অধিকার কেড়ে নেওয়ার অজুহাতও হতে পারে না। গরুভোজের ক্ষেত্রে তাই খাদ্যস্বাধীনতার পাশাপাশি কর্মসূচির স্থান, পদ্ধতি ও সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুভূতির নামে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিবাদের নামে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করাও সমর্থনযোগ্য নয়।

ভারতের হিন্দুত্ববাদ, বাংলাদেশের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ

ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে মুসলমানদের ওপর বৈষম্য ও নিপীড়নের প্রতিবাদ জরুরি। তবে তা হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে—যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি বা রবীন্দ্রনাথের নামে মনগড়া উক্তি দিয়ে নয়।

একইভাবে, ভারতে হিন্দুত্ববাদের বিরোধিতা করে বাংলাদেশে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে সমর্থন করা রাজনৈতিক দ্বিচারিতা। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বললে বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রশ্নও তুলতে হবে। আবার প্রমাণ ছাড়া সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দায় কোনো বিদেশি রাজনৈতিক শক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক লাভের সম্ভাবনা অপরাধের প্রমাণ নয়।

সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা বেছে বেছে করা যায় না। অন্য দেশের সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করে নিজের দেশের সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিলে তা নীতিগত অবস্থান থাকে না; রাজনৈতিক সুবিধাবাদে পরিণত হয়।

প্রতিবাদের নামে প্রতিশোধ নয়

গরুভোজের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে মসজিদের সামনে শূকরের মাংস রান্নার প্রস্তাবও একই উসকানিমূলক যুক্তির প্রকাশ। এক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জবাব অন্য সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে দেওয়া যায় না। এতে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং অসহিষ্ণুতা বাড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ নীতিমালা ও সমানভাবে নিয়ম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্রসংগঠনগুলোরও উচিত ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে শক্তি প্রদর্শনের বদলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করা। বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তচিন্তা, যুক্তি ও সহাবস্থানের জায়গা—কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নয়।

অধিকার নাগরিকের, সংখ্যাগরিষ্ঠের একক সম্পত্তি নয়

গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা—দুটিই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটির পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা নয়; বরং তারই আরেকটি রূপকে প্রশ্রয় দেওয়া।

গণতন্ত্রের পরীক্ষা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষায় নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের সমাজে সংখ্যালঘুর অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তাতেও। ভারতের হিন্দুত্ববাদ হোক কিংবা বাংলাদেশের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ—ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদায় বিভাজন তৈরির রাজনীতির বিরোধিতা করতে হবে।

অধিকার নির্ধারিত হবে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে, ধর্মীয় পরিচয় বা সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তিতে নয়। নিজের জন্য যে অধিকার দাবি করি, অন্যের জন্যও সেই অধিকার মানতে পারলেই সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত বিরোধিতা সম্ভব। সাম্প্রদায়িকতা শুধু অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ নয়; নিজের গোষ্ঠীর জন্য এক নিয়ম, অন্যের জন্য আরেক নিয়ম দাবিও সাম্প্রদায়িকতা।


More News Of This Category
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!